পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের বিষয় জানতে গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ডিবি। এতে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, নাহিদকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর মাথার বাঁ পাশে চারটি, পিঠে তিনটি এবং পায়ে একটি ধারালো আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তদন্তের এই পর্যায়ে নাহিদ হত্যায় যাঁরা সরাসরি অংশ নিয়েছেন বা হত্যায় সম্পৃক্ত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা সবাই সংঘর্ষের সময় সামনের সারিতে ছিলেন। তবে ঘটনার সময় কার কী ভূমিকা ছিল, সেটি জিজ্ঞাসাবাদের পর জানা যাবে।

ডিবির প্রধান হাফিজ আক্তার বলেন, নিউমার্কেট এলাকায় ১৯ এপ্রিলের সংঘর্ষের সময় ব্যবসায়ী, হকার ও দোকানকর্মীদের সঙ্গে নাহিদও রাস্তায় নেমেছিলেন। হকারদের সঙ্গে নাহিদ বড় একটি ছাতা নিয়ে ঢাকা কলেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন ছাত্ররা তাঁদের ধাওয়া দেয়। ছাতার কারণে নাহিদ হয়তো বুঝতে পারেননি যে পেছন থেকে হকাররা চলে গেছেন। তখন ধারালো অস্ত্র দিয়ে নাহিদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ ছাত্রের রাজনৈতিক পরিচয় আছে কি না, জানতে চাইলে হাফিজ আক্তার বলেন, ঢাকা কলেজে তাঁদের (ছাত্রলীগ) কোনো কমিটি নেই। তাই তাঁরা রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী কি না, সেটি ঢালাওভাবে বলা যাবে না।

ওই দিনের সংঘর্ষে মোহাম্মদ মোরসালিন নামে ঢাকার নিউমার্কেটের একজন দোকানকর্মীও নিহত হন। তবে ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ডিবির প্রধান হাফিজ আক্তার বলেন, হত্যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী পাওয়া যায়নি। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সময় লাগবে। ধারণা করা হচ্ছে, মোরসালিন ইটের আঘাতে মারা গেছেন।

১৮ এপ্রিল রাতে নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী-কর্মচারীদের সঙ্গে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের সংঘর্ষ হয়। নিউমার্কেটের দুটি খাবারের দোকানের দুই কর্মীর বিতণ্ডা থেকে ওই ঘটনার সূত্রপাত। এর জের ধরে ১৯ এপ্রিল দিনভর নিউমার্কেট এলাকায় ঢাকা কলেজের ছাত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন বিপণিবিতানের দোকানমালিক-কর্মচারী ও হকারদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে দুজন মারা যান। আহত হন অর্ধশত ব্যক্তি। এ ঘটনায় মোট পাঁচটি মামলা হয়েছে। মোট আসামির সংখ্যা ১ হাজার ৭২৪। এর মধ্যে হত্যা মামলা দুটি তদন্ত করছে ডিবি। অন্য তিনটি মামলা তদন্ত করছে নিউমার্কেট থানা–পুলিশ।

মামলাগুলোর মধ্যে একমাত্র পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় আসামি হিসেবে ২৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি সব আসামি অজ্ঞাতনামা। এই ২৪ জনের সবাই বিএনপি ও এর অঙ্গ–সহযোগী সংগঠনের নিউমার্কেট থানা কমিটির নেতা–কর্মী বলে দলটি দাবি করেছে। এর মধ্যে একজন কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। আরেকজন বিদেশে। মামলার ১ নম্বর আসামি নিউমার্কেট থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি মকবুল হোসনকে ঘটনার দুদিন পর গ্রেপ্তার করা হয়। এ নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা–সমালোচনার মধ্যে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলায় অংশ নেওয়া অনেকের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ পায়, যাঁদের অনেকে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের নেতা–কর্মী বলে পরিচয় প্রকাশ পায়।

গতকালের সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, সংঘর্ষের সময় যাঁরা ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করেছেন, আশপাশের ভিডিও ফুটেজ দেখে তাঁদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তিনি জানান, গণমাধ্যমে আসা একটি ছবিতে ধারালো অস্ত্র হাতে সংঘর্ষে অংশ নেওয়া একজনের পরিচয় দেওয়া হয়েছে ঢাকা কলেজের ছাত্র শাহীন সাদেক মির্জা। বাস্তবে ওই ছবি পলাশ মিয়ার, যিনি গ্রেপ্তার পাঁচজনের একজন।

নাহিদকে কোপাচ্ছেন হেলমেটধারী এমন এক তরুণের ছবি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তবে পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, ওই হেলমেটধারীর নাম বাশার ইমন, তিনি ঢাকা কলেজের ছাত্র। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ডিবি কর্মকর্তা হাফিজ আক্তার বলেন, ‘গ্রেপ্তারের আগে ওই তরুণের পরিচয় আমরা নিশ্চিত করব না।’

পাঁচজনের বিষয়ে যা জানা গেল

নাহিদ হত্যায় গ্রেপ্তার পাঁচজনের বিস্তারিত পরিচয় জানায়নি ডিবি। তাঁদের বিষয়ে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় নেতা–কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাহমুদ ইরফান সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তাঁর বাড়ি নেত্রকোনায়। পলাশ মিয়া সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তরের ছাত্র। তাঁর বাড়িও নেত্রকোনায়। আবদুল কাইয়ুম ব্যবস্থাপনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। থাকেন কলেজের উত্তর ছাত্রাবাসে। জুনাইদ বোগদাদী ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। তিনি উত্তর ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্র, তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরবে। ফয়সাল ইসলাম বাংলা বিভাগের স্নাতকোত্তরের ছাত্র। তাঁর বাড়ি লক্ষ্মীপুরে।

তাঁদের মধ্যে ইরফান, পলাশ ও কাইয়ুম ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতা জসীম উদ্দিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের ‘বিলুপ্ত’ আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জসীম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকা কলেজে গ্রুপ তো শুধু আমি একা চালাই না। এখানে বহু গ্রুপ আছে। সব আমার ওপর চাপিয়ে দিলে তো হবে না। গ্রেপ্তার পাঁচজনের মধ্যে শুধু ইরফানকে চিনি। তবে তারা কেউই আমার অনুসারী না।’

ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগের সর্বশেষ আহ্বায়ক কমিটি হয় ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর। এর দুই মাসের মাথায় ২০১৭ সালের ২২ জানুয়ারি ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংগঠনের দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়। ওই দিনই আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়কসহ কমিটির ১৯ নেতাকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। তবে ওই কমিটি বিলুপ্ত বা স্থগিত করা না হলেও ক্যাম্পাসে ‘বিলুপ্ত কমিটি’ হিসেবে পরিচিতি পায়।

সংঘর্ষে ‘গুজব’ ও ‘উসকানি’ ছিল

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নিউমার্কেটে সংঘর্ষের ঘটনার পেছনে ছিল গুজব এবং উসকানি। তবে কারা এই গুজব ছড়িয়েছেন, উসকানি দিয়েছেন—এ বিষয়ে কিছু বলেননি তিনি। হাফিজ আক্তার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সাইবার স্পেসের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে গুজব ছড়িয়ে পুলিশকে ছাত্রদের প্রতিপক্ষ বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল। তাঁদের নানাভাবে উসকানি দেওয়া হচ্ছিল। হকার ও দোকানমালিকদের উসকানি দেওয়া হয়েছিল। তাঁরাও ঢাকা কলেজের গেটে এসে মারামারি করেছেন।

ঘটনার সময় বিভিন্ন ভবন থেকে ছাত্ররা ইটপাটকেল ছুড়েছেন। পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার সময়ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ হয়েছে। এ বিষয়ে হাফিজ আক্তার বলেন, এত ইটপাটকেল কোথা থেকে এসেছে, সেটি ছাত্রদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তাঁরা বলেছেন, কলেজে অনেক নির্মাণকাজ চলছে। সেখান থেকেই ইটপাটকেল সংগ্রহ করা হয়েছে।

সংঘর্ষের ঘটনায় গ্রেপ্তার ও অভিযানের কারণে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ বিষয়ে ডিবির প্রধান হাফিজ আক্তার বলেন, ‘ছাত্রদের অস্থির হওয়ার কারণ নেই। শুধুমাত্র যারা সামনের সারিতে থেকে ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার করেছে, ধরে নিব তারা এই মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। কোনো নিরপরাধ ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হবে না। সবাই মিলে শিক্ষার একটি সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে।’

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন