ঠান্ডা কফি খেতে গিয়ে জামায় লেগে গেছে। এখন কী হবে? এই জামা পরে সারা দিন থাকবে কীভাবে তূর্য? ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে সে। বর্ণমেলায় এসেছে মা-বাবার সঙ্গে। তাঁদের উদ্দেশে খাবারের স্টলে দাঁড়ানো একজন বললেন, সার্ফ এক্সেলের স্টলে চলে যান। সেখানে গেলেই পেয়ে যাবেন একটা সাদা টি–শার্ট। পছন্দের বাংলা বাক্য লিখে দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবীরা।

আজ বুধবার সকালে রাজধানীর সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে দশমবারের মতো শুরু হয় বর্ণমেলা। নানা আনন্দ–আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিশুরা এখানে পরিচিত হতে পারছে বাংলা বর্ণের সঙ্গে। পাশাপাশি থাকে নাচ, গান, গল্প, ছবি আঁকা, পুতুল নাচ, বায়োস্কোপসহ অনেক কিছু। এমনকি নৌকার মতো একটা চরকিও সেখানে আনা হয়েছে। যাত্রী নিয়ে অনেক ওপরে উঠছে আর নামছে সেটা। চরকি-নৌকায় চড়লে উত্তাল ঢেউয়ের সাগরে নৌকায় চড়ার অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে।

বর্ণমেলায় এসে ছবি এঁকেছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী তাজবি। অংশ নিয়েছে সুন্দর হাতের লেখার প্রতিযোগিতাতেও। গত বছর সে যোগ দিয়েছিল রাজশাহীর বর্ণমেলায়। সেখানেই থাকত সে, পড়ত সেখানকার এক স্কুলে। এখন থেকে নিয়মিত ঢাকার বর্ণমেলায় আসতে পারবে বলে খুব খুশি। ছবি আঁকা শেষে মা ও ভাইকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখছিল বর্ণমেলার স্টলগুলো। বর্ণমেলায় মজার সব কাণ্ড হচ্ছে। শিশুদের নিয়ে মা-বাবারা প্রতিবছর এখানে আসেন সেসব উপভোগ করতে। যাঁরা কখনো আসেননি, এবার গিয়ে বিস্ময়ে হতবাক তাঁরাও।

default-image

মোহাম্মদপুরের শরীফা ইসলাম ছেলেমেয়েকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন হাতেখড়ির স্টলে। সেখানে শিশুদের হাতে ধরে এঁকে বাংলা বর্ণের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন প্রখ্যাত তিনজন শিল্পী। তাঁরা হলেন সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আবদুল মান্নান ও অশোক কর্মকার। শিশুদের ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা, হাতের সুন্দর লেখার বিচারক হিসেবে ছিলেন আবুল বারক আলভী এবং ওয়াকিলুর রহমান।

স্টলগুলোতে ছিল মজার সব আয়োজন। দুই হাতে রং লাগিয়ে ধবধবে সাদা বর্ণকে রঙিন করেছে শিশুরা। মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারকেও দেখা গেল শিশুদের সঙ্গে রং মাখানোয় যোগ দিয়েছেন। রঙিন হাত ধুয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল লাইফবয়। পেপসোডেন্ট টুথপেস্টের স্টলে মাত্র ৩০ টাকায় একটি পেপসোডেন্ট কিনে ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি গেম জার্মিনেটর খেলছিল শিশুরা।

বর্ণমেলায় স্টল সাজিয়ে বসেছে কিশোর আলো, বিজ্ঞান চিন্তা, কমিকস কর্নার, বর্ণ রোবট, বর্ণে পোশাক, জল পড়ে পাতা নড়ে, বর্ণপ্রযুক্তি, বই বর্ণালি, বর্ণমুখোশ, বর্ণোপহার। এ ছাড়া বর্ণিল সব বই নিয়ে এসেছিল সিসিমপুর, পুতুল এনেছিল জলপুতুল, শুদ্ধ বাংলা বানান লেখার প্রতিযোগিতা করছিল আকিজ প্লাস্টিক আর প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছে ইউনিলিভার মেডিকেল কলেজ। ছিল ব্রিটিশ কাউন্সিল, ইএমকে সেন্টার, এবিসি রেডিও এবং ইউসিইপির স্টল।

default-image

জাহীদ রেজা নূরের সংকলন ও সম্পাদনায় সকালে আবৃত্তি প্রযোজনা ‘একুশের প্রথম সংকলন’ নিয়ে মঞ্চে আসে কণ্ঠশীলন। গান শোনায় সুরের ধারা, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, স্যার জন উইলসন স্কুল, সাউথব্রিজ স্কুল, সানবিমস স্কুল, সানিডেল স্কুল, স্কলাসটিকা স্কুল ও ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর ভাবনা ও পরিকল্পনায় ১৩টি দেশের গানে নাচ পরিবেশন করে ভঙ্গিমা নৃত্য একাডেমি। নৃত্য পরিচালনা করেন সৈয়দা শায়লা আহমেদ লিমা। গল্প শোনান মাহমুদা আক্তার।

কোনো কিছুই যে ফেলনা নয়, বর্ণমেলায় গেলে সেটা আরও একবার টের পাওয়া যাবে। ফেলে দেওয়া নানা জিনিস দিয়ে বাংলা বর্ণ তৈরি করে এনেছে শিশুরা। যেমন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র তামিম চেঁছে ফেলা কাঠ দিয়ে তৈরি করেছে ‘ক’। ডিমের খোসা দিয়ে ‘ড’ তৈরি করেছে অগ্রগামী শিশু নিকেতনের আরাফাত, আবার ফুল দিয়ে ’ফ’ বানিয়েছে ফারিয়া নামের এক শিশু। ক্রীড়া কমপ্লেক্সের শহীদ মিনারের পাশে সেগুলো সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

বর্ণমেলায় আজ গান শোনাবে জলের গান। থাকবে জাদু। একুশের প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলবেন ফাগুন হাওয়ায় সিনেমার পরিচালক তৌকীর আহমেদ, অভিনয়শিল্পী ফজলুর রহমান বাবু, রওনক হাসান, নুসরাত ইমরোজ তিশা, সিয়াম আহমেদ, সংগীতশিল্পী পিন্টু ঘোষ ও নন্দিতা ইয়াসমীন।

বর্ণমেলা চলবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ভাষা দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে বর্ণমেলা উদ্বোধন করেন শিল্পোদ্যোক্তা রুবানা হক, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক, অভিনয়শিল্পী মেহজাবীন চৌধুরী, টেন মিনিটস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আয়মান সাদিক। দশমবারের মতো বর্ণমেলার আয়োজন করেছে প্রথম আলো।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0