রাস্তায় মানুষের আনাগোনা ছিল একেবারে কম। একটা বাসের পর আরেকটি বাস গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল না। মাঝেমধ্যে দু–একটা সিএনজিচালিত অটোরিকশা সশব্দে চলছিল গন্তব্যের দিকে। যে ফুটপাত দিনভর মানুষের পদচারণে মুখর থাকত, সেই ফুটপাত ছিল একেবারে ফাঁকা। যে আদালত চত্বরে মানুষের ভিড় লেগেই থাকত, সেই আদালত চত্বরে মানুষের আনাগোনা নেই।

করোনায় সরকারি কঠোর বিধিনিষেধে বদলে যাওয়া ঢাকার জজকোর্ট চত্বর ও এর সামনের সড়ক এমন মানুষ শূন্য দেখে কিশোরগঞ্জের নিখিল চন্দ্র দাসের বুকটা খাঁ খাঁ করে ওঠে। তাঁর মাথায় রাজ্যের দুশ্চিন্তা ভর করেছে। কারণ, গত বছরে করোনার লকডাউনে জুতা সেলাইয়ের কাজ না থাকায় বাধ্য হয়ে ঢাকা ছেড়ে কিশোরগঞ্জ চলে যেতে হয়েছিল। চার সন্তান আর স্ত্রীর মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে গিয়ে তিনি সুদে ৪০ হাজার টাকা নেন। সেই ঋণ এখনো শোধ করতে পারেননি। এর মধ্যে আবার এসেছে লকডাউন।

৩৫ বছর আগে নিখিল চন্দ্র দাস ঢাকায় এসে পুরান ঢাকার জজকোর্ট চত্বর এলাকায় জুতা সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। সেই থেকে আজ অবধি জুতা সেলাইয়ের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। নিখিল চন্দ্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুতা সেলাইয়ের কাজ করে নিখিল প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করেন। গড়ে প্রতি মাসে তাঁর ১৫ হাজার টাকা আয়। সেই টাকায় তাঁর সংসার চলে। তাঁর তিন সন্তান আর স্ত্রী থাকেন কিশোরগঞ্জে। তিনি থাকেন গোপীবাগে। মাসে ভাড়া দিতে হয় দুই হাজার টাকা। খাওয়া খরচ বাবদ তাঁর খরচ হয় সাড়ে চার হাজার টাকা। বাকি টাকা তিনি পাঠিয়ে দেন গ্রামের বাড়িতে। নিখিলের তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে দিপ্তী রানীকে বিয়ে দিয়েছেন। অপর দুই মেয়ে প্রীতি আর স্মৃতি রানী পড়াশোনা করছে। ছেলে শিপুন বাবুও পড়ছে।

default-image

৩৫ বছর ধরে ঢাকায় থাকা নিখিল অন্য দিনের মতো আজও ঢাকার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের ফুটপাতে আসেন সকাল নয়টার দিকে। জুতা সেলাইয়ের যন্ত্রপাতি সাজিয়ে বসে পড়েন নিখিল। আগেই জেনেছিলেন, আদালতের বিচার কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। আসবেন না উকিল, বিচারপ্রার্থীরা। তবুও নিখিলের আশা ছিল, যেহেতু তিনি ফুটপাতে বসেন। নিশ্চয় তিনি জুতা সেলাইয়ের কাজ পাবেন। তবে আজ জুতা সেলাইয়ের প্রথম কাজ পেতে তাঁকে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করতে হয়। বিকেল চারটা নাগাদ জুতা সেলাই করে তাঁর পকেটে ঢোকে মাত্র ১৩০ টাকা। অথচ ওই সময়ে অন্য দিনে তাঁর আয় হয়ে যেত ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। সন্ধ্যার আগে জুতা সেলাইয়ের যন্ত্রপাতি গুছিয়ে চলে যেতেন বাসায়।

বিজ্ঞাপন

করোনায় আয় কমে যাওয়া নিয়ে নিখিল চন্দ্র প্রথম আলোকে বলেন, ‘লকডাউনে আজ কাজ নেই। সারা দিন কাজ করে আয় হয়েছে মাত্র ১৩০ টাকা। আগের লকডাউনেও কাজ ছিল না। তখন ৪০ হাজার টাকা সুদে আনছি। ৪০ হাজার টাকা আমার ঋণা (ঋণ) আছে । সেই ঋণা (ঋণ) আজও শোধ করতে পারিনি। এখন আমি বড় অভাবে আছি। অনেক কষ্টে আমার দিন কাটতেছে।’

নিখিলের ভয়, আবার যদি গেল বছরের মতো দিনের পর দিন কাজ না থাকে, আবার যদি তাঁকে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে ফিরে যেতে হয়, তাহলে তাঁর কষ্টের শেষ থাকবে না। আগের ঋণের টাকা শোধ দিতে পারেননি, আবার কীভাবে সংসার চালাবেন।
নিখিল বললেন, ‘বড় কষ্টে আছি।’

default-image

রুস্তমের কষ্টের দিনরাত্রি

রুস্তম আলীর বয়স এখন ৭০ বছর। ১৫ বছর ধরে পুরান ঢাকার ইসলামপুরের ফুটপাতে তিনি কলা বিক্রি করে সংসার চালিয়ে আসছেন। স্ত্রী আর দুই সন্তান থাকেন পিরোজপুরে। তিনি ঢাকায় একা থাকেন। প্রতি মাসে তাঁর আয় ১০ হাজার টাকা। গত বছরের লকডাউনে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছিলেন রুস্তম আলী। পরে আবার তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ফুটপাতে কলা বিক্রি করে যে টাকা আয় হচ্ছিল, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে আবার করোনার লকডাউনের খবর শুনে বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন বৃদ্ধ রুস্তম। তবু আজও তিনি পাকা কলা নিয়ে সকালে ইসলামপুরের সড়কে বসেন। তবে ক্রেতা নেই। সারা দিন মাত্র ৬০ টাকার কলা বিক্রি করেছেন। এভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে কীভাবে সংসার চালাবেন, সেই চিন্তা তাঁকে অস্থির করে তুলেছে।
বৃদ্ধ রুস্তম আলী হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনায় আবার লকডাউন। রাস্তায় লোকজন নেই। আজও কলা বেচতে (বিক্রি) পারলাম না। কালও বেচতে (বিক্রি) পারব না। কত দিন এভাবে চলব। এভাবে চললে তো না খেয়ে থাকতে হবে।’

দোলেনা খাতুনের মনে ভয়

দোলেনা খাতুনের স্বামী আবদুল হান্নান প্রতিবন্ধী। এই দম্পতি ৯ বছর বয়সী ছেলে বায়েজিদকে নিয়ে থাকেন রাজধানীর শাহজাহানপুর বস্তিতে। দোলেনা গৃহকর্মীর কাজ করে সংসার চালান। গত বছরের লকডাউনে কাজ হারিয়ে স্বামী আর সন্তানকে নিয়ে চলে যান নেত্রকোনায় গ্রামের বাড়িতে। টানা তিন মাস গ্রামে থাকার পর আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। প্রতিবন্ধী স্বামীর চিকিৎসা খরচ আর সংসার চালাতে গিয়ে হাজার দশেক টাকা ঋণ নেন দোলেনা খাতুন। সেই ঋণের কিছু টাকা শোধ দিলেও পুরো টাকা শোধ করতে পারেননি। তবু বাসায় বাসায় কাজ করে অনেক কষ্টে সংসার চালাচ্ছিলেন দোলেনা। করোনায় আবার লকডাউনের খবর শুনে হতাশ হয়ে পড়েছেন তিনি।

default-image

গতবার করোনায় বাসায় ঢুকতে দেয়নি। এবারও যদি তাই হয়, তাহলে স্বামী আর সন্তান নিয়ে গ্রামে ফিরে যাওয়া ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় থাকবে না।

দোলেনা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আবার লকডাউন। অনেক দুশ্চিন্তায় আছি। বাসাবাড়িতে কাজ থাকে কি না ঠিক নেই। আমার স্বামী প্রতিবন্ধী। একলা আমি কাজ করে সংসার চালাই। আগে যখন লকডাউন হলো, তখন রাস্তা থেকে লোকজন খাবার দিছে, রাস্তা থেকে আনছি, খাইছি। পরে দেশে (গ্রামে) চলে গিয়েছিলাম।’

বিজ্ঞাপন
রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন