বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আল আমিন নয়ন প্রবাসে নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরত আসা ব্যক্তিদের কাছে ‘নয়ন ভাই’ নামে পরিচিত। রাজশাহীর ছেলে আল আমিন। ২০০৭ সালে তাঁর বাবা জমি বিক্রি করে তাঁকে মালয়েশিয়া পাঠিয়েছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৫ বছর। একটি কোম্পানিতে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা বেতনে কাজ করতে পাসপোর্ট ও সরকারি ছাড়পত্র নিয়েই তিনি মালয়েশিয়া যান। কিন্তু যাওয়ার পরই বুঝতে পারেন, তিনিসহ অন্যদের আসলে তামিল এক মালিকের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের জঙ্গল কাটতে হতো। সাপ, ব্যাঙ, কেঁচো-উপদ্রব সবই সহ্য করতে হতো। লাঠি দিয়ে পিটুনি ছাড়াও নানা কায়দায় নির্যাতন করা হতো।

default-image

অত্যাচারে একসময় আত্মহত্যা করারও হুমকি দিয়েছিলেন আল আমিন ও তাঁর সঙ্গীরা। বন্দিদশা থেকে পালানো, দূতাবাসের সামনে গিয়ে অনশন ও আন্দোলনেও নামতে হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে তানাগানিতা নামের একটি মানবাধিকার সংগঠনের সহায়তায় সাত মাসের মাথায় ৮০ জন খালি হাতে শুধু প্রাণ নিয়ে দেশে ফিরতে পেরেছিলেন।

মঙ্গলবার প্রথম আলো কার্যালয়ে বসে আল আমিন বলছিলেন, ‘বিমানবন্দরে নেমে দেখি কেউ ফিরেছেন বড় লাগেজ নিয়ে। বিমানবন্দরে কারও স্বজন এসেছেন ফুল নিয়ে। আর আমি দুই দিন বিমানবন্দরে বসে ছিলাম, পকেটে টাকা নেই বলে বাড়ি ফিরতে পারছিলাম না।’

আল আমিন নয়ন জানালেন, তাঁদের প্রবাসীর ট্যাক্সি উদ্যোগে নির্যাতনের শিকার বা কোনো কারণে খালি হাতে ফেরা শ্রমিকদের কল্যাণে একটি তহবিল গঠন করা হবে। ট্যাক্সি সার্ভিসের প্রতি ট্রিপের ভাড়া থেকে ২ শতাংশ জমা রাখা হবে তহবিল গঠনের জন্য আর ৩ শতাংশ সার্ভিসের ব্যবস্থাপনা বাবদ ব্যয় করা হবে।

আল আমিন বলেন, করোনার এই সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে সাড়ে ৫ লাখ প্রবাসী দেশে ফিরেছেন। বিমানবন্দরে নেমে যাঁদের নিজস্ব গাড়ির ব্যবস্থা নেই, তাঁরা বিভিন্ন হয়রানির শিকার হন। বিমানবন্দরের সিন্ডিকেট গাড়ি ব্যবসায়ীরা যাতায়াতে বেশি ভাড়া নেওয়ার পাশাপাশি প্রবাসীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করেন। বেশির ভাগেরই ধারণা, বিদেশ থেকে ফিরেছেন, তার মানেই অনেক টাকা নিয়ে ফিরেছেন। তাই যেভাবেই হোক প্রবাসীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করার পাঁয়তারা চলতে থাকে। প্রবাসীর ট্যাক্সি উদ্যোগে স্বল্প ভাড়ায় তাঁদের গন্তব্যে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হবে।

দীর্ঘদিন ধরে বিদেশফেরত শ্রমিকদের নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতায় আল আমিন বলেন, ফেরত আসা ব্যক্তিদের অনেকেই জানিয়েছেন তাঁরা বিদেশে গাড়ি চালাতেন। কিন্তু দেশে ফিরে কেউ মুরগির খামার দিচ্ছেন বা বেকার বসে থাকছেন। তাঁদের দক্ষতাটাকে কাজে লাগানো হচ্ছে না বা কাজে লাগানোর কোনো জায়গা নেই। তাই তাঁরা বিদেশফেরত দক্ষ চালকদের একটি ডেটাবেইস করে সংগঠিত করতে চাচ্ছেন।

উদ্যোক্তারা জানালেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি হটলাইন নম্বরের মাধ্যমে আটটি গাড়ি নিয়ে এ উদ্যোগ যাত্রা শুরু করেছে। প্রায় ৫০ জনের মতো চালক তাঁদের নাম যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। আপাতত ঢাকায় বিমানবন্দর থেকে যাত্রী পরিবহন শুরু করলেও দেশব্যাপী এ সেবা চালুর ইচ্ছার কথা জানালেন উদ্যোক্তারা। একটি অ্যাপ তৈরির প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ট্রেড লাইসেন্সসহ সরকারের অন্যান্য অনুমোদনের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন।

প্রবাসীর ট্যাক্সির আরেক উদ্যোক্তা রায়হান কবিরও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচিত নাম। করোনা মহামারি চলাকালে গত বছরের ৩ জুলাই আল-জাজিরার ইংরেজি অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিবাসীদের আটক করা ও জেলে পাঠানোর মাধ্যমে মালয়েশিয়া সরকার বৈষম্যমূলক আচরণ করছে বলে বক্তব্য দেন রায়হান কবির। গণমাধ্যমে কথা বলায় মালয়েশিয়ায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত রায়হানের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়া পুলিশ কোনো অভিযোগ দেখাতে পারেনি। আন্দোলনের মুখে রায়হান কবিরকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় দেশটির পুলিশ। মুক্ত হওয়ার পর রায়হানের দেশে ফেরার এক বছর পূর্তি হয়েছে গত ২২ আগস্ট।

রায়হান কবির প্রথম আলোকে বলেন, দক্ষ চালকদের যাঁরা ট্যাক্সি উদ্যোগে যুক্ত হবেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রবাসফেরতদের জন্য সরকারের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও নানা কার্যক্রম জানানো হবে এই চালকদের। এই চালকেরা যখন কোনো প্রবাসীকে বাড়িতে পৌঁছে দেবেন, তখন তাঁরা ওই যাত্রীকে সরকারের বিভিন্ন তথ্যের কথা জানাবেন। এতে ওই যাত্রী খুব সহজেই তথ্যগুলো জানতে পারবেন এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

উদ্যোক্তারা জানালেন, এখনো পরিবহনের ভাড়ার বিষয়টি গাড়ির মালিক-চালক আর যাত্রীর মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে চলছে। তবে অ্যাপ তৈরি হয়ে গেলে তখন কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। এতে জ্যামের জন্য আলাদা কোনো চার্জ রাখা হবে না। এখন যিনি দেশে ফিরবেন, তিনি তাঁর সময়সূচি জানিয়ে গাড়ি বুকিং দিচ্ছেন। তাঁকে চালকের মুঠোফোন নম্বর, চালককে ওই প্রবাসীর মুঠোফোন নম্বর ও অন্যান্য তথ্য জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। চালক গাড়ি নিয়ে গন্তব্যে চলে যান। কোনো ঝামেলা ছাড়াই ওই প্রবাসী বাড়ি ফিরছেন।

প্রথম আলো কার্যালয়ে বসেই কথা হলো মালয়েশিয়াফেরত মো. সোহাগ আকন্দের সঙ্গে। মালয়েশিয়ায় তিন বছর থেকে ২০১৯ সালে দেশে ফেরেন। তিনি নিজে একটি গাড়ি কিনেছেন। নিজেই গাড়ি চালান। মায়ের দোয়া নামের রেন্ট এ কারের ব্যবসা করছেন। বর্তমানে যুক্ত হয়েছেন ট্যাক্সি সার্ভিসের সঙ্গে। তাঁকে মালয়েশিয়ায় গাড়ি চালানোর কথা বলেই এজেন্সি পাঠিয়েছিল। তবে তাঁকে একটি কোম্পানির স্প্রে বিভাগে কাজ করতে হয়। বর্তমানে তিনি টঙ্গীতে থাকেন।

উদ্যোক্তারা জানালেন, বর্তমানে বিমানবন্দরের ভাড়া করা পার্কিংয়ে দুটি গাড়ি রাখা হয়। প্রবাসফেরত কোনো যাত্রী পাওয়া না গেলে অন্য যাত্রী পরিবহন করেন ওই চালক। ভবিষ্যতে ট্যাক্সি সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত চালকদের আলাদা পোশাক দেওয়া হবে। থাকবে নীতিমালা। ‘আমরা প্রবাসী’ এই শক্তিতেই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চান উদ্যোক্তারা। তাঁদের মতে, এই উদ্যোগের ফলে যদি ১০ জন প্রবাসফেরত মানুষেরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়, তাই–বা কম কি।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন