সোমবার রাতে রাজধানীর রামপুরায় বাসচাপায় নিহত হওয়া ১৭ বছরের সন্তানকে নিয়ে কথা বলার সময় গর্বিত ওর মা রাশেদা বেগম। সন্তানের খেলা বা খাবারের অভ্যাস, ক্লাসের ফলাফল বা ঘরের হাসিমুখ নিয়ে কথা বলতে বলতে এক মুহূর্তের জন্য ভুলে গিয়েছিলেন, মাইনুদ্দিন আর নেই। মনে পড়তেই আবার ডুকরে উঠলেন ছেলের জন্য। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে ওদের বাসায় পৌঁছে দেখা গেল তালা ঝুলছে। সোমবার রাতে দুর্ঘটনার পরই মাইনুদ্দিনের মা-বাবা চলে যান বড় মেয়ের বাসায়।

সন্তানের কথা বলতে বলতে রাশেদা বেগম জানালেন, সম্প্রতি একটি বেসরকারি হাসপাতালে অভ্যর্থনা কক্ষে সাত হাজার টাকা বেতনে চাকরি হয়েছিল। এমনকি যোগদানের খবর নিতে যোগাযোগ করেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু মাইনুদ্দিন আরও বড় কিছু হতে চেয়েছিল। মাকে বলেছিল, এখন এই চাকরিতে গেলে ব্যাংকে বড় চাকরি করা হবে না কোনো দিন। ভালো কলেজে ভর্তি করে দিয়ো। সন্তানের কথা শুনে বাবা জানিয়েছিলেন, সবকিছু বিক্রি করে হলেও ছেলেকে পড়াবেন। সেই কথাই তিনি বলে চলেছেন ছেলের মৃত্যুর পর থেকে।

পূর্ব রামপুরায় মেয়ের বাড়ির দরজার সামনে সোমবার রাত থেকে বসে ছিলেন তিনি। গতকাল সকালে দেখা গেল, উপস্থিত এলাকার সব মানুষের চোখে পানি। ছেলেটা খুব হাসিখুশি ছিল, তাই তাদের সবার আপনজন হয়েছে। কেউ ওর মাকে দোয়া পড়তে বলছে, কেউ সন্তান হারানো পিতাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে।

মা একবার হাসেন ছেলের দুষ্টুমির কথা বলতে বলতে, পর মুহূর্তে চুপ করে তাকিয়ে থাকেন। বললেন, তাঁদের পাঁচজনের মধ্যে ছোট ছেলেটা সবচেয়ে লম্বা আর সুন্দর। বড় ভাইয়ের সঙ্গে প্রায়ই নিজের উচ্চতা মাপত কিশোর মাইনুদ্দিন। বলত দেখলি আমি তোদের সবার চেয়ে লম্বা। রাশেদা বেগমের এসব কথা বলার সময় অন্যরা টুকটাক কথা বললেও একজন একেবারে চুপ। নিহত কিশোরের বড় বোন ঝুমা। বাক্‌প্রতিবন্ধী এ মেয়ের কাছে ছিল ছোট ভাইয়ের সব আবদার। কয়েকবার দীর্ঘশ্বাস নিতে চেষ্টা করে বুকে হাত রেখে খুব কষ্টে গোঙানোর স্বরে যা উচ্চারণ করল তা শুনতে ‘আমার ভাই, আমার ভাই’-এর মতো শোনাল।

ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল দুপুরে মাইনুদ্দিনের মরদেহ হাসপাতাল থেকে বাড়িতে বয়ে নিয়েছেন বড় ভাই মনির হোসেন আর বড় বোনের স্বামী সাদ্দাম। এসএসসির ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছিল বাসের চাকায় পিষ্ট ছাত্রটি। বাসচাপায় ১৭ বছরের এক কিশোর শুধু নিহত হয়নি, বাসের চাকার তলায় পিষ্ট হয়ে গেছে একটি অভাবী পরিবারের সব প্রত্যাশা।

সরাইলে দাফন

প্রতিনিধি, সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জানান, গতকাল বাদ এশা সরাইল উপজেলা সদরের বৈকালবাজার হাটখোলা জামে মসজিদে জানাজা শেষে মসজিদসংলগ্ন কবরস্থানে নানা-নানির কবরের পাশে মাইনুদ্দিনকে দাফন করা হয়। জানাজা ও দাফনে ঢাকা থেকে যাওয়া মাইনুদ্দিনের বন্ধু-স্বজনসহ বিপুলসংখ্যক এলাকাবাসী অংশ নেন। এ সময় ঘটনাস্থলে পুলিশের একাধিক সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন