স্থানটির ইজারার মেয়াদ এক বছর করে। ইজারার নথিতে দেখা যায়, চলতি বছরের ২৩ আগস্ট ইজারা পায় আয়ান এন্টারপ্রাইজ, যার মালিক মো. সানি। ৭৯ লাখ ৫০ হাজার টাকায় এক বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। এর আগের বছর ৪২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছিলেন রিয়াজ উদ্দিন নামের অন্যজন।

এক বছরে ইজারাদার পাল্টেছে। শুধু পাল্টেনি পরিবেশ, উদ্ধার হয়নি পার্কিংয়ের স্থান। অথচ কাগজ, কাচ, কেমিক্যাল, কাপড়, চালসহ বিভিন্ন পণ্যের গুদাম ও দোকানে ভরা এ এলাকায় পণ্যবাহী পরিবহনের চাহিদাও বেশ। নেই শুধু পার্কিংয়ের জায়গা।

সম্প্রতি সেখানে দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত অবস্থান করে বেশ যানজট দেখা যায়। বাবুবাজার ও বাদামতলী চাল আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, রাস্তার দুই পাশে নয়াবাজার থেকে বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত সারাক্ষণ পিকআপ ভ্যান পার্কিং করা থাকে। কেউ দেখার নেই, বলার নেই, শোনার নেই।

নিজাম উদ্দীন বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষ যানজটে অতিষ্ঠ। পার্কিংয়ের জায়গায় পিকআপ ভ্যানগুলো রাখলে যানজট কমত।’

সিটি করপোরেশনের ইজারার ৮ নম্বর শর্তে বলা হয়েছে, পার্কিং স্থানের দুই পাশে পার্কিং রেট দৃশ্যমান বোর্ডে টাঙিয়ে রাখতে হবে। অন্যথায় জামানতসহ প্রদত্ত ইজারার টাকা বাজেয়াপ্ত করে ইজারা বাতিল করা হবে।

তবে সরেজিমন এমন কোনো সাইনবোর্ড দেখা যায়নি এবং এখন পর্যন্ত কোনো ইজারা বাতিলের ঘটনা ঘটেনি বলেও স্থানীয় ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

হরেক রকম দোকান

ইজারা দেওয়া পার্কিংয়ের জায়গার নকশা অনুসারে, চারটি ব্লকের মধ্যে ৩ হাজার ৮২২ বর্গফুট স্থান নিয়ে এ ব্লক, দুটি পিলারের মধ্যবর্তী স্থান। আর পরবর্তী তিনটি পিলারের মাঝামাঝি ২টি ফাঁকা জায়গা নিয়ে বি ব্লক ৪ হাজার ২৮২ বর্গফুটের। পরবর্তী তিনটি পিলারের মধ্যের ফাঁকা দুই অংশ নিয়ে ১০ হাজার ৬৯২ বর্গফুটের সি ব্লক এবং একটিমাত্র অংশ নিয়ে ৯ হাজার ৬৫৮ বর্গফুটের ডি ব্লক।

সরেজমিন দেখা গেছে, অল্প কিছু জায়গায় গাড়ি পার্কিং করতে দেওয়া হলেও, বেশির ভাগ জায়গা ভাড়া দিয়ে বসানো হয়েছে ভাত ও চায়ের দোকান। হাতে গোনা কয়েকটি বড় ট্রাক রাখা হয়েছে, সারা দিনের জন্য ৪০০ টাকা করে দিতে হয় প্রতিটিকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চা-বিক্রেতা বলেন, চায়ের দোকানের জন্য দৈনিক ২০০ টাকা দিতে হয়। আর ভাতের দোকানের জন্য দিনে ৪০০ টাকা।

সবচেয়ে বেশি বসেছে মাস্কের দোকান, শ দুয়েকের মতো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মাস্ক বিক্রেতা বলেন, ২৫ বর্গফুট আয়তনের দোকানের জন্য নেওয়া হয় ৬০ টাকা করে। কেউ বেশি পরিমাণ স্থান নিলে ভাড়া সে হিসাবেই দিতে হয়।

সেদিন বেলা তিনটার দিকে চারটির মতো সিএনজিচালিত অটোরিকশা দেখা যায় পার্ক করা। শাহ আলম সেখানে সিএনজিচালিত অটোরিকশার কাছ থেকে পার্কিংয়ের ভাড়া নিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, প্রতিটি অটোরিকশার জন্য ১০ বা ২০ টাকা করে রাখা হয়।

স্থানীয় ব্যক্তিরা বলছেন, সেখানে অনায়াসে শতাধিক পিকআপ ভ্যান রাখা সম্ভব।

বিরক্ত ট্রাফিক পুলিশও

বাবুবাজার এলাকায় তীব্র যানজট নিরসনে ব্রিজের নিচের অংশকে গাড়ি পার্কিংয়ে ব্যবহারের জন্য দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ‘বিশেষ প্রতিবেদন’ দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কোতোয়ালি থানা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অবৈধ দোকান করার ফলে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, মিটফোর্ড হাসপাতালে আসা চিকিৎসাপ্রার্থী ও চিকিৎসকদের চলাচলের ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া সে স্থানে লোকসমাগম বেশি হওয়ায় মাদকসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

প্রতিবেদনে ইজারার শর্ত অনুযায়ী জায়গাটি গাড়ি পার্কিংয়ে ব্যবহার নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশনের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। বাবুবাজার ট্রাফিক পুলিশের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, পার্কিং স্থান পুনরুদ্ধারে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষে একা কিছুই করা সম্ভব নয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্রাফিক পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, নয়াবাজার থেকে তাঁতীবাজার যাওয়ার পথের উত্তর পাশে প্রতিদিন অন্তত ৪০টির মতো পিকআপ ভ্যান ও ট্রাক দাঁড় করানো থাকে। এমনকি বাবুবাজার থেকে বাদামতলীর পথেও এমন দৃশ্য দেখা যায়। স্থানীয় দোকানগুলো থেকে পণ্য পরিবহনের ডাকের জন্য অপেক্ষা করে পণ্যবাহী পরিবহনগুলো।

এ কর্মকর্তার দাবি, এসব সরাতে পারলে যানজট কমানো সম্ভব হবে। অন্তত রাস্তায় গাড়ি গতিশীল রাখা যাবে, একই জায়গায় আটকে থাকতে হবে না।

কী বলছে সিটি করপোরেশন, ইজারাদার?

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগকে বিষয়টি ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে বলে দাবি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মেদের। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উচ্ছেদ করতে ম্যাজিস্ট্রেটকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু কেন স্থায়ীভাবে পার্কিংয়ের জায়গা উদ্ধার করা হচ্ছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে ফরিদ আহাম্মেদ বলেন, এটা দীর্ঘদিনের অপসংস্কৃতি। এ থেকে হুট করে বের হওয়া সম্ভব না। পুলিশ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সহযোগিতা না পেলে এখান থেকে বের হওয়া কঠিন।

বিষয়টি নিয়ে বর্তমান ইজারাদার মো. সানির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।

তবে আগের ইজারাদার রিয়াজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, সেতুর ইতিহাসের শুরু থেকেই স্থানটিতে দোকান ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীদের কারণে উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। সবার স্বার্থই দেখতে হয়।

রাজনৈতিক প্রভাবশালী কারা, জানতে চাইলে তাঁদের নাম বলতে রাজি হননি রিয়াজ উদ্দিন।

তাঁর দাবি, পিকআপ ভ্যানের চালকেরাও সেতুর নিচে গাড়ি রাখতে চান না। কারণ, নির্দিষ্ট পরিমাণে ভাড়া দিতে হবে।