গণপরিবহন

বাসে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই

‘যত আসন তত যাত্রী’ নিয়মের প্রথম দিনই শর্ত না মানার প্রবণতা। তবে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ কম।

করোনার সংক্রমণ রোধে বাসে পাশাপাশি আসনে যাত্রী পরিবহন বন্ধ ছিল। এখন সব আসন পূর্ণ করে গতকাল থেকে বাসে যাত্রী পরিবহন চালু হয়েছে। প্রথম দিনেই যাত্রীরা গাদাগাদি করে গন্তব্যে যাচ্ছেন। এতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। ফার্মগেট, ঢাকা, ১ সেপ্টেম্বর
করোনার সংক্রমণ রোধে বাসে পাশাপাশি আসনে যাত্রী পরিবহন বন্ধ ছিল। এখন সব আসন পূর্ণ করে গতকাল থেকে বাসে যাত্রী পরিবহন চালু হয়েছে। প্রথম দিনেই যাত্রীরা গাদাগাদি করে গন্তব্যে যাচ্ছেন। এতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। ফার্মগেট, ঢাকা, ১ সেপ্টেম্বর ছবি: সাজিদ হোসেন
বিজ্ঞাপন

বাসে সব আসনে যাত্রী তোলার সুযোগের প্রথম দিনই স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই দেখা গেল না। এ চিত্র যেমন রাজধানী ঢাকার, তেমনি ঢাকার বাইরের বড় শহরেরও। পরিবহনশ্রমিকদের বেশির ভাগের মুখে মাস্ক ছিল না। সচেতনতা ছিল না যাত্রীদের মধ্যেও। জীবাণুনাশকের ব্যবহারও দেখা যায়নি বললেই চলে।

বাসে গাদাগাদি ছিল না। অবশ্য সাধারণ সময়ের চেয়ে যাত্রীর চাপও অনেক কম ছিল। ফলে কিছু কিছু বাসে আসন খালিও দেখা গেছে। কিন্তু হুড়োহুড়ি করে বাসে উঠতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানা যায়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সময়ের সমান ভাড়াই নিতে দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগও ছিল।


সব মিলিয়ে বাসে প্রতি আসনে যাত্রী তোলার ক্ষেত্রে যেসব শর্ত সরকার দিয়েছিল, তা অনেকাংশে পালিত হয়নি। দেশে গত ২৬ মার্চ থেকে গণপরিবহন বন্ধ ছিল। ১ জুন থেকে অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখার শর্তে বাস চলাচলের সুযোগ দেয় সরকার। বাস মালিকদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ভাড়া বাড়ানো হয় ৬০ শতাংশ। ফলে যাত্রীর ওপর চাপ পড়ে। এখন ভাড়া আগের জায়গায় গেল। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধির বালাই না থাকায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ল।

ওদিকে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যু সংখ্যা খুব কমে গেছে, তা নয়। গতকাল
মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৯৫০ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছেন ৩৫ জন।

এরই মধ্যে সরকার গতকাল থেকে ‘যত আসন তত যাত্রী’ নিয়মে বাস চলাচলের সুযোগ দেয়। এ ক্ষেত্রে রাজধানী ঢাকা, দূরপাল্লার বাস ও সারা দেশের কোথাও বাস-মিনিবাসে আসনের অতিরিক্ত যাত্রী না তোলা, যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকদের মাস্ক ব্যবহার এবং তাঁদের হাত ধোয়ার জন্য পর্যাপ্ত সাবান-পানি ও জীবাণুনাশকের ব্যবস্থা রাখার শর্ত দেওয়া হয়। যাত্রা শুরু ও শেষে যানবাহন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা ও জীবাণুনাশক দিয়ে জীবাণুমুক্ত করা এবং যাত্রীদের হাত ব্যাগ ও মালপত্র জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা রাখার কথাও বলা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
মানুষের নিজের স্বার্থেই স্বাস্থ্যবিধি মানা উচিত। সরকার সারা দেশেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবে
ওবায়দুল কাদের, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, সারা দেশে খোঁজ নিয়ে তিনি যে তথ্য পেয়েছেন, তাতে পরিস্থিতি সন্তোষজনক। সরকার কঠোর নজরদারি করছে। স্বাস্থ্যবিধি না মানার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, মানুষের নিজের স্বার্থেই স্বাস্থ্যবিধি মানা উচিত। সরকার সারা দেশেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবে।

ঢাকার চিত্র

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে যাত্রীর চাপ কম দেখা যায়। বিশেষ করে দূরপাল্লার বাসগুলো অনেক আসন ফাঁকা রেখে চলেছে। গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদসহ বড় টার্মিনাল এবং কলাবাগান ও কল্যাণপুরের কাউন্টারগুলো বলতে গেলে ফাঁকাই ছিল। তবে যানবাহন ও যাত্রী ধীরে ধীরে বাড়বে বলে পরিবহনমালিক-শ্রমিকেরা জানিয়েছেন। সপ্তাহখানেক পর প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে বলে তাঁরা মনে করেন।

রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি, আসাদ গেট, শ্যামলী, কলেজ গেট, কল্যাণপুর, গাবতলী, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকায় গতকাল দুপুর ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, বাসগুলোতে স্বাভাবিক সময়ের ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে। বিকেলে অফিস ছুটি হওয়ার পর দু-একটি বাসে আসনের অতিরিক্ত যাত্রী বহন করতে দেখা গেছে। এর একটি গুলিস্তান-ধামরাই পথের ডি-লিংক পরিবহন। বিকেল চারটার দিকে কল্যাণপুর এলাকায় দেখা যায়, এই কোম্পানির একটি বাসে তিনজন যাত্রী দাঁড়িয়ে আছেন। বাসের শ্রমিক মিনার হোসেন দাবি করেন, বাসের কয়েকটি আসনে পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে। এ জন্যই তিনজন দাঁড়িয়ে।

ঢাকা ও এর আশপাশের বাসে করোনার আগে থেকেই কিছু বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছিল। সেটা অব্যাহত আছে। বিশেষ করে সর্বনিম্ন ভাড়ার হার আগে থেকেই মানছিলেন না পরিবহনমালিকেরা। যেমন ট্রান্স সিলভা পরিবহনের বাসে যেকোনো গন্তব্যে ১০ টাকা ভাড়া নিতে দেখা গেছে, যা ৭ টাকা হওয়ার কথা।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
খামারবাড়ি মোড়ে স্বাধীন পরিবহনের একটি বাসের যাত্রী আবুল খায়ের বলেন, মাস্ক মুখে দিলে হাঁসফাঁস লাগে। এ জন্য পকেটে রেখে দিয়েছেন। একই বাসের চালকের সহকারী আতাউর রহমানের মুখেও মাস্ক ছিল না।

‘মাস্কে হাঁসফাঁস লাগে’

রাজধানীর উত্তরা, আবদুল্লাহপুর, যাত্রাবাড়ী, সদরঘাটসহ বেশ কিছু পথের বাসের শেষ গন্তব্য গাবতলী টার্মিনাল। যাত্রী নামিয়ে ফিরতি যাত্রা শুরুর আগে বাস-মিনিবাস জীবাণুমুক্ত করার কথা। কিন্তু যাত্রাবাড়ী-গাবতলী পথের তিনটি বাস জীবাণুনাশক না ছিটিয়েই যাত্রী নিয়ে ফিরতি যাত্রা শুরু করে। একই চিত্র দেখা গেছে প্রজাপতি, বসুমতী, রব রব ও জাবালে নূর পরিবহনেও। বাসের ভেতর জীবাণুনাশক হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা হাত ধোয়ার ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু কোনো বাসেই এ ধরনের কিছু পাওয়া যায়নি। তবে কোনো কোনো বাসের দরজার সামনে ব্লিচিং পাউডারমিশ্রিত ভেজা চট বিছিয়ে রাখতে দেখা গেছে।

বিকেলে খামারবাড়ি মোড়ে স্বাধীন পরিবহনের একটি বাসের যাত্রী আবুল খায়ের বলেন, মাস্ক মুখে দিলে হাঁসফাঁস লাগে। এ জন্য পকেটে রেখে দিয়েছেন। একই বাসের চালকের সহকারী আতাউর রহমানের মুখেও মাস্ক ছিল না। তাঁর অজুহাত, যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলতে হয়, হাঁকডাক দেওয়া লাগে। তাই মাস্ক পরে থাকা সম্ভব নয়। বললেন, ‘ঝুঁকি বুঝি। কিন্তু কী করব?’

পরিবহনমালিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের চালক-সহকারী সবাইকে মাস্ক সরবরাহ করা হয়েছে। যাত্রীদের তো শ্রমিকেরা বাধ্য করতে পারবেন না। তিনি দাবি করেন, জীবাণুমুক্ত করার বিষয়েও কড়া নির্দেশনা দেওয়া আছে।

স্বাস্থ্যবিধি সমস্যা ঢাকার বাইরেও

ঢাকার বাইরে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ শহরের বাসগুলোয় ভাড়া ঠিক থাকলেও স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি। এর মধ্যে রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও রংপুর উল্লেখযোগ্য। প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা জানান, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় যাত্রী অনেক কম ছিল। চালক-সহকারী ও পরিবহনশ্রমিকদের মুখে মাস্ক দেখা যায়নি। যাত্রীদেরও অনেকে মাস্ক ছাড়া যাতায়াত করছেন।

নীলফামারীতে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন করে যাত্রী বহনের দায়ে ১৪টি বাসের বিরুদ্ধে মামলা করে জেলা পুলিশ ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। বিশেষ অভিযান চালিয়ে মাস্কবিহীন যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে মাস্ক পরিয়ে দেওয়া হয়।
সারা দেশের মধ্যে চট্টগ্রামে ব্যতিক্রম ছিল। সেখানে গণপরিবহন কম ছিল। ফলে মোড়ে মোড়ে যাত্রীদের ভিড় দেখা যায়। দাঁড়িয়ে-গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহন করা হয়। বাড়তি ভাড়া আদায়েরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রেও ছিল উদাসীনতা। গতকাল বিকেলে নগরের ইপিজেড মোড়ে কারখানা ছুটির পর বাসের সংকট তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) গতকাল ঢাকায় সাতটি এবং চট্টগ্রামে চারটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। এসব আদালতে ১২৩টি মামলা ও ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয় । বিআরটিএর কর্মকর্তারা বলছেন, অন্য সময় তাঁরা ঢাকা ও চট্টগ্রামে মোট আটটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। গতকাল আরও চারটি বাড়ানো হয়েছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এখন এমনিতে যাত্রী কম, সামনে যাত্রী বাড়লে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যেতে পারে। তাই এখন থেকে সতর্ক হতে হবে। স্বাস্থ্যবিধিটা কেবল কাগজপত্রে, বাস্তবে এর প্রয়োগ দেখা যায় না। যাত্রার শুরুর আগে ও শেষে গণপরিবহনে জীবাণুনাশক ছিটানোর দায়িত্ব সরকার নিতে পারে। একই সঙ্গে মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পারে।

[প্রতিবেদন তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও রংপুর; প্রতিবেদক, রাজধানী, সিলেট ও ময়মনসিংহ অফিস]

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন