বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাসে নির্ধারিত ভাড়া কার্যকরের ক্ষেত্রের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল রোববার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করণীয় কিছু নেই। এটা সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিষয়, তারা দেখবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের তৈরি করা পরিবহন খাতে ভাড়া বৃদ্ধিজনিত সৃষ্ট বিশৃঙ্খলাসংক্রান্ত এই বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার ভেতরে চলাচলকারী সিএনজিচালিত বাসগুলোতে ক্ষেত্রবিশেষে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার দ্বিগুণের বেশি নেওয়া হচ্ছে। যেমন গুলিস্তান থেকে বাড্ডার দূরত্ব সাত কিলোমিটার। সরকার নির্ধারিত ভাড়া দাঁড়ায় ১২ টাকা। অথচ এই পথে চলাচলকারী ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২৫ টাকা। মিরপুর ১২ নম্বর সেকশন থেকে গুলশান ১ নম্বর পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত ভাড়া ২৩ টাকা। সিএনজিচালিত বাসে আদায় করা হচ্ছে ৪০ টাকা।

সিএনজিচালিত বাসে বেশি ভাড়া নেওয়ার এমন আরও কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে।

ডিজেলচালিত বাসেও নির্ধারিত হারের চেয়ে বাড়তি নেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে। এতে উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, মালিবাগ থেকে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত সাড়ে ১৭ কিলোমিটার দূরত্বে ভাড়া হওয়ার কথা ৩৮ টাকা। কিন্তু এই পথে চলাচলকারী বলাকা পরিবহন যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করছে ৪৫ টাকা। প্রতিবেদনে এমন আরও কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।

দূরপাল্লার ৬টি রুটে নির্ধারিত ও বর্তমান ভাড়ার হার উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব রুটে যাত্রীপ্রতি ৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে।

ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৮০ টাকা নির্ধারণের পর সরকার গত ৭ নভেম্বর থেকে বাসভাড়া ২৬-২৮ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। এরপর থেকেই বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করে আসছেন যাত্রীরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনেও সেটাই উঠে এল।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, যারা অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে, তাদের সংখ্যা কম। সিএনজিচালিত বাসে বর্ধিত ভাড়া আদায় করার বিষয়টিও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে বিআরটিএ ও মালিক সমিতির একাধিক দল মাঠে কাজ করছে।

অবশ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ভাড়া বৃদ্ধির নতুন তালিকা প্রতিটি বাস ও মিনিবাসের প্রকাশ্য জায়গায় টানানো বাধ্যতামূলক। অথচ তালিকাটি এত ছোট অক্ষরে লিখে এমন জায়গায় টানানো হচ্ছে, যা সচরাচর যাত্রীদের দৃষ্টিগোচর হয় না।

সিএনজিচালিত বাস কত

সরকার এ দফায় সিএনজিচালিত বাসের ভাড়া বাড়ায়নি। তবে বাসগুলো নিজেদের ডিজেলচালিত বলে দাবি করে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর গত ১০ নভেম্বর খন্দকার এনায়েত উল্যাহ দাবি করেন, তাঁদের প্রাথমিক হিসাবে ঢাকায় চলাচল করা ৬ হাজার বাসের মধ্যে ১৯৬টি সিএনজিচালিত।

সিএনজিচালিত বাসে আগের ভাড়া নেওয়া নিশ্চিত করতে বাস কোন জ্বালানিতে চলে তা স্টিকার লাগিয়ে উল্লেখ করার ব্যবস্থা হয়। তবে কত বাস সিএনজিতে চলে, সে হিসাব দিতে পারেনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সারা দেশে মোট ৭৮ হাজার বাসের মধ্যে ৪৬ হাজার ৮০০টি গ্যাসচালিত, যা মোট বাসের ৬০ শতাংশ। বাকি ৪০ শতাংশ ডিজেলচালিত। ঢাকার ভেতরে চলাচলকারী ১২ হাজার ৫২৬টি বাসের মধ্যে ৯৫ শতাংশ, অর্থাৎ ১১ হাজার ৯০০ বাস সিএনজিচালিত। ঢাকার ভেতরে চলাচলকারী মাত্র ৬২৬টি বাস ডিজেলচালিত।

মালিককে মাসোহারা দিতে হয়

বাস থেকে চাঁদা ও মালিকদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। তবে এবার তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে উঠে এল। এতে বলা হয়েছে, মালিক সমিতি, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থাকে নিয়মিত মাসোহারা দিতে গিয়ে মালিকপক্ষকেও তার আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করতে হয়। পরিবহন খাতের এই দুরবস্থা শুধু ঢাকা মহানগরেই নয়, দেশের প্রায় সব মহানগর ও জেলায় রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মালিকদের দৈনিক জমার টাকা, রাস্তায় বিভিন্ন পয়েন্টে দেওয়া চাঁদা এবং চালক, কন্ট্রাক্টর ও সহকারীদের দৈনিক আয় তুলতে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতা দেখা যায়।

সুপারিশ কী কী

প্রতিবেদনে সড়ক খাতের বিশৃঙ্খলা বন্ধে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন পথে চলাচলকারী ডিজেল ও গ্যাসচালিত বাসগুলোকে পৃথক করে শনাক্ত করা এবং বাসের সামনে, পেছনে ও দুই পাশে বড় করে তা সাঁটিয়ে দেওয়া। ডিজেলচালিত প্রতিটি বাসে বর্ধিত ভাড়ার তালিকা বড় ও স্পষ্ট অক্ষরে প্রকাশ্য স্থানে টানানো। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে কি না, সেটি নজরদারির জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয় করে পণ্য পরিবহনকারী যানবাহনের ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা অন্যতম।

ঢাকার বাসসেবাকে ৩ থেকে ৪টি কোম্পানির অধীনে নিয়ে আসা, দৈনিক জমার বদলে শ্রমিককে মজুরি দিয়ে বাস চালানো, চাঁদা আদায় বন্ধ করার সুপারিশও করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। আমরা বিষয়টি বিভিন্ন সময় তুলে ধরেছি। তবে সরকার ও বাসমালিকপক্ষ এটা স্বীকার করেনি। এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া নেওয়া বন্ধে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন