সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিটি প্রাথমিক এই ভাড়ার হার ঠিক করেছে। সর্বশেষ ১৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রস্তাবিত ভাড়ার হার চূড়ান্ত হয়। কমিটি শিগগিরই এ প্রস্তাব সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো হবে। মেট্রোরেল চালুর অন্তত তিন–চার মাস আগে ভাড়ার হার অনুমোদন করতে চাইছে সরকার। কারণ, ভাড়ার হার অনুযায়ী সফটওয়্যারে ইনপুট দিয়ে টিকিট চূড়ান্ত করতে হবে। মেট্রোরেলের যাত্রীদের জন্য আধুনিক এবং অনলাইনভিত্তিক ভাড়া পরিশোধের ব্যবস্থা থাকবে।

সরকারের শীর্ষ মহলের যে লক্ষ্য, তাতে বিদ্যমান অন্যান্য গণপরিবহনের চেয়ে মেট্রোরেলের ভাড়া বেশি হবে না। যাত্রীদের সামর্থ্যের মধ্যেই ভাড়া রাখা হবে।
এম এ এন সিদ্দিক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডিএমটিসিএল

দেশে মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে সরকারি মালিকানাধীন ঢাকা ম্যাস ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। তাদের অধীনে ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকায় পাঁচটি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা আছে সরকারের। এর মধ্যে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রথম মেট্রোরেলের নাম দেওয়া হয়েছে লাইন-৬।

উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের দূরত্ব ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার। এই পথে ১৬টি স্টেশন রয়েছে। ট্রেন চালু হলে যাত্রীদের সুবিধার্থে উত্তরা ও আগারগাঁও স্টেশনের সঙ্গে বিআরটিসির বাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ যাত্রীরা সহজে যাতে স্টেশনে যেতে পারেন এবং নেমে বাস পান—এ জন্য বিআরটিসির সঙ্গে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের।

সূত্র জানায়, ভাড়া নির্ধারণে যুক্ত ছিল জাপানের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিপ্পন কোই (এনকেডিএম)। ভাড়া নির্ধারণে মেট্রোরেল নির্মাণ ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। শুধু দৈনন্দিন পরিচালনার ব্যয় ধরে সম্ভাব্য ভাড়ার হার নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ।

ভাড়া নির্ধারণ কমিটির প্রধান এবং সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নীলিমা আখতার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা প্রস্তাবিত ভাড়ার হার তৈরি করার চূড়ান্ত পর্যায়ে আছেন। মেট্রোরেলের পরিচালন ব্যয় ও জনগণের সামর্থ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে ভাড়ার হার প্রস্তাব করা হচ্ছে। ঢাকার বিদ্যমান গণপরিবহনের খরচ ও বিভিন্ন দেশের মেট্রোরেলের ভাড়ার হারও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের সামর্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ভাড়ার হার প্রস্তাব করা হবে।

এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনের ভাড়া

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে মেট্রোরেলের জন্য প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৪ টাকা ভাড়ার প্রস্তাব এসেছিল। পরে কিলোমিটার এবং স্টেশনভিত্তিক ভাড়ার হার ঠিক করা হয়। এ ক্ষেত্রে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রতি কিলোমিটারে ভাড়ার হার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এতে এই পথের ভাড়া আসে ৯০ টাকা এবং সেটাই প্রস্তাব করা হয়েছে।

একজন যাত্রী মেট্রোরেলে ওঠার পর সর্বনিম্ন ২০ টাকা ভাড়া দিয়ে দুই স্টেশন পর্যন্ত যেতে পারবেন। পরবর্তী প্রতি স্টেশনে যেতে বাড়তি ১০ টাকা করে ভাড়া দিতে হবে। উত্তরার তিনটি স্টেশন বাদ দিলে অন্য সব স্টেশনের প্রতিটির মধ্যে দূরত্ব এক কিলোমিটার বা তার কম। ফলে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া হবে প্রায় ১০ টাকা।

বর্তমানে রাজধানীতে বড় বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ১৫ পয়সা। মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ৫ পয়সা। সর্বনিম্ন ভাড়া বড় বাসে ১০ টাকা এবং মিনিবাসে ৮ টাকা। উত্তরা আজমপুর থেকে মহাখালী, ফার্মগেট ও শাহবাগ হয়ে মতিঝিল বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত সড়কপথে দূরত্ব ১৯ দশমিক ৮ কিলোমিটার।

ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে মোটাদাগে তিনটি বড় ব্যয়ের খাত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে বিদ্যুৎ খরচ, জনবলের বেতন-ভাতা এবং কোচ ও অন্যান্য স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ।

বর্তমানে রাজধানীতে বড় বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ১৫ পয়সা। মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ৫ পয়সা। সর্বনিম্ন ভাড়া বড় বাসে ১০ টাকা এবং মিনিবাসে ৮ টাকা। উত্তরা আজমপুর থেকে মহাখালী, ফার্মগেট ও শাহবাগ হয়ে মতিঝিল বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত সড়কপথে দূরত্ব ১৯ দশমিক ৮ কিলোমিটার। সরকারি হিসাবে, এ পথে বড় বাসে ভাড়া আসে সাড়ে ৪২ টাকা। অবশ্য পরিবহনমালিক-শ্রমিকেরা এর চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করে থাকেন। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসের ভাড়া সরকার ঠিক করে দেয় না। এ পথে কিছু এসি বাসে সর্বনিম্ন ৬০ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন শহরে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার মেট্রোরেল লাইন আছে। এসব মেট্র্রোরেলে সর্বনিম্ন ৫ রুপি থেকে সর্বোচ্চ ৬০ রুপি পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হয়। এর মধ্যে দিল্লিতে মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ এবং সর্বোচ্চ ৬০ রুপি। কলকাতায় সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ রুপি এবং সর্বোচ্চ ২৫ রুপি।

যেভাবে ভাড়া পরিশোধ হবে

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুসারে, মেট্রোরেলে দুই ধরনের টিকিটের ব্যবস্থা থাকবে। একটা হচ্ছে স্থায়ী কার্ড। অর্থাৎ এ কার্ড রিচার্জ করে পুরো বছর বা মাসে যাতায়াত করা যাবে। এ কার্ড কিনতে ২০০ টাকা দিতে হবে। এরপর ২০০ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত রিচার্জ করা যাবে। অনলাইন লেনদেনের মাধ্যমে কার্ড রিচার্জ করা যাবে।

মেট্রোরেলের প্রতিটি স্টেশনে থাকা মেশিনেও কার্ড রিচার্জ করা যাবে। প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের সময় যাত্রীদের কার্ড পাঞ্চ করতে হবে। নতুবা দরজা খুলবে না। এরপর নেমে যাওয়ার সময় আবার কার্ড পাঞ্চ করতে হবে। নতুবা যাত্রী বের হতে পারবেন না।

আরেকটি কার্ড সাময়িক, যা প্রতি যাত্রায় দেওয়া হবে। স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট গন্তব্যের ভাড়া দিয়ে এ কার্ড সংগ্রহ করতে হবে। এটিও স্মার্ট কার্ডের মতো। ভাড়ার অতিরিক্ত যাতায়াত করলে ওই কার্ড দিয়ে দরজা খুলতে পারবেন না। সে ক্ষেত্রে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কাছে বাড়তি ভাড়া পরিশোধ করেই বের হতে হবে।

বিভিন্ন দেশে মেট্রোরেল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা হয়। তবে বাংলাদেশে ডিএমটিসিএল নিজেই পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে পরিচালনার কাজে যুক্তদের নিয়োগ দেবে ডিএমটিসিএল।

ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম এ এন সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, ভাড়া হার প্রস্তাব করবে সাত সদস্যের কমিটি। ডিএমটিসিএল কমিটিকে নানা তথ্য–উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করেছে। তিনি বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারের শীর্ষ মহলের যে লক্ষ্য, তাতে বিদ্যমান অন্যান্য গণপরিবহনের চেয়ে মেট্রোরেলের ভাড়া বেশি হবে না। যাত্রীদের সামর্থ্যের মধ্যেই ভাড়া রাখা হবে।

মেট্রোরেলে যাত্রীরা যেভাবে চড়বেন

মেট্রোরেলের স্টেশনে লিফট, এস্কেলেটর ও সিঁড়ি দিয়ে ওঠা যাবে। তিনতলা স্টেশন ভবনের দ্বিতীয় তলায় কনকোর্স হল। এখানে টিকিট কাটার ব্যবস্থা, অফিস ও নানা যন্ত্রপাতি থাকবে। তিনতলায় রেললাইন ও প্ল্যাটফর্ম। একমাত্র টিকিটধারীরাই ওই তলায় যেতে পারবেন। দুর্ঘটনা এড়াতে রেললাইনের পাশে বেড়া থাকবে। স্টেশনে ট্রেন থামার পর বেড়া ও ট্রেনের দরজা একসঙ্গে খুলে যাবে। আবার নির্দিষ্ট সময় পর তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হবে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যাত্রী নিয়ে চলাচল শুরু হলে মেট্রোরেল ভোর থেকে দুদিক থেকে যাত্রা করবে। প্রাথমিকভাবে রাত সাড়ে ১১টায় সর্বশেষ ট্রেন ছাড়বে। শুরুতে দৈনিক ৪ লাখ ৮৩ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন।

প্রকল্প সূত্র বলছে, একটি ট্রেনের ছয়টি কোচের মধ্যে দুই প্রান্তের দুটি কোচকে বলা হচ্ছে ট্রেইলর কার। এতে চালক থাকবেন। এসব কোচে ৪৮ জন করে যাত্রী বসতে পারবেন। মাঝখানের চারটি কোচ হচ্ছে মোটরকার। এতে বসার ব্যবস্থা আছে ৫৪ জনের। সব মিলিয়ে একটি ট্রেনে বসে যেতে পারবেন ৩০৬ জন। প্রতিটি কোচ সাড়ে ৯ ফুট চওড়া। মাঝখানের প্রশস্ত জায়গায় যাত্রীরা দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করবেন।

প্রকল্পের অগ্রগতি ও ব্যয়

মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। তবে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারণ, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি, বাড়তি জমি অধিগ্রহণসহ কিছু নতুন বিষয় যোগ হওয়ায় ব্যয় বাড়বে আরও প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। তবে ২০২৩ সালের মধ্যেই কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে কর্তৃপক্ষ। এ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা।

মার্চ পর্যন্ত মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৭৭ দশমিক ৮২ শতাংশ। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশে ভৌত কাজের অগ্রগতি ৯১ দশমিক ৪১ শতাংশ। আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অগ্রগতি ৭৭ শতাংশ। ইতিমধ্যে মেট্রোরেলের ১২ সেট ট্রেন বাংলাদেশে এসেছে। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার অংশে আগামী ১৬ ডিসেম্বর যাত্রী নিয়ে চলাচল শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বর্তমানে এ পথে পরীক্ষামূলকভাবে মেট্রোরেল চলাচল করছে।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন