হাসপাতালের পরিচয়পত্রে নাম লেখা ‘ডটার অব সজনী’। মা সজনী এই ডটার তথা মেয়েকে হাসপাতালের চিকিৎসার টাকা দিতে পারবেন না বলে ফেলে চলে গেছেন। শিশুটির বয়স এখন এক মাস। হাসপাতালে অন্য মায়ের বুকের দুধ খেয়ে বেঁচে আছে সে। এখন তার ওজন হয়েছে ২ কেজি ১০০ গ্রাম। হাসে। খিদে লাগলে কাঁদে। হয়তো সে মাকেও খোঁজে।

default-image

পুলিশ বলছে, মেয়েকে ফেলে যাওয়া এই মা বা পরিবারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে গতকাল সোমবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টা ৫৮ মিনিটে টেলিফোনে (মেয়েকে ভর্তির সময় দেওয়া মুঠোফোন নম্বর) কথা হয় সজনীর সঙ্গে। তিনি জানান, মেয়ের চিকিৎসার জন্য যে বিল হয়েছে, তা দেওয়ার সামর্থ্য নেই। কৃষিকাজ করা স্বামী প্রথমে তাঁকে হাসপাতালে ফেলে চলে যান। পরে তিনিও হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান। এখন তিনি স্বামীর সঙ্গে সিলেটে আছেন। স্বামীকে বুঝিয়ে মেয়েকে হাসপাতাল থেকে আনতে চান এই মা। এই মায়ের বয়স বর্তমানে ১৮ বছর। পড়াশোনা করেননি। মা–বাবা নেই। সজনীর সাড়ে তিন বছর বয়সী আরেক ছেলে আছে। সজনীর বিয়ে হয়েছে প্রায় পাঁচ বছর আগে।

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার শ্যামপুর থানাধীন ডেলটা হেলথ কেয়ারে সজনীর মেয়ে বড় হচ্ছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, এভাবে মা বা পরিজন ছাড়া তাদের পক্ষে খুব বেশি দিন এই মেয়েকে হাসপাতালে রাখা সম্ভব না। গত ২০ জানুয়ারি ‘ডটার অব সজনী’কে হাসপাতালটিতে ভর্তি করা হয়েছিল। তখন তার বয়স ছিল পাঁচ দিন।

শ্বাসকষ্ট ও খিঁচুনি ছিল। ভর্তির পর পাঁচ দিন লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। তারপর থেকে তাকে হাসপাতালে নবজাতকদের রাখার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে বা এনআইসিইউতে রাখা হয়েছে। এখন শারীরিক অবস্থা ভালো হওয়ার পরও কেউ দেখার নেই বলে তাকে ওয়ার্ডে রাখা যাচ্ছে না। তার পেছনে ওষুধসহ অন্যান্য খরচ দিন দিন বেড়েই চলছে। এ পর্যন্ত হাসপাতালে এক লাখ টাকার বেশি বিল উঠেছে।

হাসপাতালটিতে ভর্তির পর বাবা রুবেল ও মা সজনী মেয়ের সঙ্গেই ছিলেন। প্রথমে বাবা, পরে ৩ ফেব্রুয়ারি মা বাইরে যাচ্ছেন বলে সেই যে চলে গেছেন আর ফেরেন নাই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যাত্রাবাড়ী এলাকার শ্যামপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। শ্যামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মফিজুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় থানায় একটি জিডি হয়েছে। তদন্ত চলছে।

প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলার পরই সজনী মুঠোফোনটি আবার বন্ধ করে দিয়েছেন। হাসপাতালটির নবজাতক বিভাগের প্রধান চিকিৎসক মজিবুর রহমান বললেন, এই মায়ের সঙ্গে আগেও দু–একবার ফোনে কথা বলা সম্ভব হয়েছে। মেয়েকে নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। তবে তারপরই ফোন বন্ধ করে দেন। ফলে কথা আর এগোতে পারছে না। এই দম্পতি মেয়েকে না নিলে দত্তক নিতে ইচ্ছুকেরা যাতে নিতে পারেন তার প্রশাসনিক ও আইনি উদ্যোগ নিতে হবে। এভাবে কত দিন বাচ্চাটিকে হাসপাতালে রাখা সম্ভব?


চিকিৎসক মজিবুর রহমান বললেন, ‘শুধু টাকার অভাবে কোনো মা নিজের সন্তানকে হাসপাতালে ফেলে চলে যাবেন? বর্তমান হাসপাতালে আনার আগেও রাজধানীর অন্য একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারে জন্ম এবং পরে আরেকটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে বেশ ভালোই খরচ হয়। আর্থিক অবস্থা খারাপ হলে তাঁরা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। গণমাধ্যমে কথা বলতে পারতেন। টাকা দিতে না পারায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাচ্চা দিচ্ছে না—এ অভিযোগ করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারতেন। সেসব কিছুই না করে মা–বাবা হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গেলেন। ফোনে মায়ের সঙ্গে যেটুকু কথা বলা সম্ভব হয়েছে, তখন তাঁকে হাসপাতালে আসতে বলা হয়েছে। হাসপাতালের বিভিন্ন তহবিল থেকে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না।’

কন্যাসন্তান, তা–ও আবার অসুস্থ—এসব বিবেচনায় এই দম্পতি মেয়েকে ফেলে চলে গেছেন বলে মনে করছেন হাসপাতালটির এনআইসিইউর প্রধান পরামর্শক চিকিৎসক মজিবুর রহমান। তিনি এ ধরনের প্রবণতাকে সামাজিক অবক্ষয় হিসেবে উল্লেখ করে নিজের অভিজ্ঞতায় বলেন, ছেলে নবজাতকদের ফেলে যাওয়ার ঘটনা খুব কম ঘটে। ফেলে যাওয়াদের বেশির ভাগই থাকে মেয়ে।

সজনী টেলিফোনে প্রথম আলোর প্রতিবেদকের কাছে জানতে চান তাঁর মেয়ে কেমন আছে? বললেন, ‘আমি তো মা। মেয়েকে ফালায় আসার পর রাতে ঘুমাইতে পারি না। হাসপাতালে স্বামী আমারেই ফালায় থুইয়্যা পলাইছিল। এর আগে মেয়ের জন্মের সময় ও পরে আমার বড় আপু হাসপাতালে ভর্তি করাইছে, টাকাপয়সা দিছে। ওরা আর কত দিব? স্বামীরও সামর্থ্য নাই।’

বিজ্ঞাপন
রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন