default-image

কামরাঙ্গীরচর লোহার ব্রিজ পেরিয়ে একটু এগোলেই ভবনটা। ঢোকার মুখ থেকে শুরু করে ভেতরঘর অবধি রঙিন বেলুন আর ফিতায় সাজানো। স্বেচ্ছাসেবকদের কারও হাতে মাস্ক, স্যানিটাইজার, কেউ কেউ অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত। এমন আনন্দমুখর পরিবেশে শুক্রবার উদ্বোধন করা হলো ‘দাওয়াতুল কুরআন তৃতীয় লিঙ্গের মাদরাসা’।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন ৩০–৩৫ জন হিজড়া। পরে সাংবাদিকদের বলেন তাঁদের যাপিত জীবনের কষ্টের কথাও। আয়োজকেরা বলেন, বাংলাদেশে হিজড়াদের জন্য এই মাদ্রাসা প্রথম কোনো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কেন এই মাদ্রাসা, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাঁরা।

বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে, হিজড়ার সংখ্যা ১০ হাজার। যদিও হিজড়াদের সংগঠনগুলো বলছে, তাঁদের সংখ্যা লাখ দেড়েক। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হিজড়াদের সমাজের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করার দু-একটি উদ্যোগ চোখে পড়ে। কিন্তু মোটের ওপর হিজড়াদের বড় অংশের শিক্ষণ–প্রশিক্ষণের দিকে নজর নেই রাষ্ট্রের—এমন অভিযোগ রয়েছে।

কথা হচ্ছিল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি মুহাম্মাদ আবদুর রহমান আজাদের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘‌হিজড়ারা স্কুলে যেতে পারে না, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় তো অনেক দূরের কথা। তাদের কেউ কোনো কাজও দেয় না। অনন্যোপায় হয়ে যখন তারা ‌বিশৃঙ্খলা করে, তখন সবাই তাদের উৎপাত মনে করে। এই দোষ আমার নিজের, সমাজের, রাষ্ট্রের।’ মূলত এই চিন্তা থেকেই হিজড়াদের জন্য তিনি মাদ্রাসা চালুর উদ্যোগ নেন।

বিজ্ঞাপন

মুফতি আজাদের বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। এরই মধ্যে বাজারে তাঁর ২৭টি বই আছে। লেখাপড়া শেষ করে অনেক দিন পথশিশুদের পড়িয়েছেন। এখনো তিনি ও তাঁর দল কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে পথশিশুদের পবিত্র কোরআন পড়ান।

বেলা সাড়ে ১০টা নাগাদ হিজড়ারা আসতে শুরু করেন। ঝলমলে পোশাক পরে জনা পঁয়ত্রিশেক হিজড়া এসে বসেন। তাঁদের সামনে রাখা হয় রেহাল। সবার হাতে তুলে দেওয়া হয় পবিত্র কোরআন। এরপর আবদুর রহমান আজাদ সুরা ফাতিহা ও পবিত্র কোরআনের আয়াত পড়ে শোনান।

হিজড়াদের সঙ্গে যোগাযোগ কী করে হলো—এমন প্রশ্নে মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আবদুল আজিজ হোসাইনী প্রথম আলোকে বলেন, ছয়–সাত মাস ধরে তাঁরা হিজড়াদের সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। একদিন খবর পান বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে হিজড়া কল্যাণ ফাউন্ডেশন আছে। ওই ফাউন্ডেশনের সভাপতি আবিদা সুলতানার সঙ্গে কথা বললে তিনিই যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দেন।

এরপরই উত্তরা, বাড্ডা, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কেরানীগঞ্জ ও বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের কয়েকটি কেন্দ্রে আবদুর রহমান আজাদ ও মাদ্রাসার অন্য শিক্ষকেরা পবিত্র কোরআন পড়াতে শুরু করেন। গতকাল থেকে তাঁরা মাদ্রাসা চালু করলেন। তৃতীয় লিঙ্গের যে কেউ এখানে ভর্তি হতে পারবেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বও করেন আবিদা সুলতানা। উপস্থিত ছিলেন ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাইদুল ইসলাম মাতবর ও স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। মাদ্রাসার অর্থায়ন কে করছেন—জানতে চাইলে মুফতি আবদুর রহমান আজাদ বলেন, মরহুম আহমেদ ফেরদৌস বারী চৌধুরী ফাউন্ডেশন তাঁদের অর্থায়ন করেছে। তাঁরা সরকার বা বেসরকারি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সহায়তা চাননি। এ উদ্যোগ থেকে তাঁরা কোনো লাভ চান না। তাঁদের ভাষায়, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁরা কাজটা করতে চান। কেউ সহায়তা করতে চাইলে করতে পারেন। মাদ্রাসায় এই মুহূর্তে দশজন শিক্ষক আছেন।

কথা হচ্ছিল সোনালী হিজড়ার সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পবিত্র কোরআন পড়া শেখাটাকে তাঁরা মনে করেন আর সব মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার একটা সুযোগ। সেই সঙ্গে কেউ যদি আয়–রোজগারের কোনো প্রশিক্ষণ দিত, তাহলে বাকি জীবনে আর কিছু চাওয়ার থাকত না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0