১০০ পরিবেশ পুলিশ দিন শহরের চেহারা বদলে যাবে : আনিসুল হক
>

এক বছর পূর্ণ করলেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের দুই মেয়র। ২০১৫ সালের ৬ মে শপথ নিয়েছিলেন তাঁরা। নাগরিকদের কাছে ভোট চাইতে গিয়ে কী কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাঁরা, গত এক বছরে সেগুলোর কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, কাজ করতে গিয়ে তাঁরা কী কী বাধার মুখে পড়ছেন—এসব বিষয়ে জানতে প্রথম আলো দুই মেয়রের মুখোমুখি হয়। ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হকের দাবি, ই-টেন্ডার চালু করে সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়েছেন তিনি, সিটি করপোরেশনে রাজনৈতিক মাস্তানি বন্ধ করেছেন। আর দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, দলের লোকজন মনঃক্ষুণ্ন হওয়া সত্ত্বেও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ তাঁর উল্লেখযোগ্য সাফল্য
প্রথম আলো: মেয়র হিসেবে শপথ নেওয়ার পর এক বছর তো পূর্ণ হলো। এখন যদি ভোটাররা জানতে চান, নগরবাসীর জন্য কী করলেন?
আনিসুল হক: এ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। আমি ছিলাম সেবাপ্রার্থী। কাউকে চিনি না, জানি না। কোথায় টাকা পাব, জানি না। সেবাপ্রার্থী থেকে সেবাদাতায় পরিণত হওয়ার বিষয়টি বুঝতে বুঝতে আমার ছয় মাস চলে গেছে। তবে এখন আমি সব গুছিয়ে উঠতে পেরেছি। আমার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তার সব কটি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি। অর্জন হয়তো অনেক নেই, তবে অল্প হলেও আছে। আমরা একটা ‘অ্যাপ’ তৈরি করেছি। এর মাধ্যমে নগরবাসী সব সার্ভিস নিতে পারবেন।
প্রথম আলো: এসব অর্জনের সুফল মানুষ কবে পাবেন?
আনিসুল হক: সুফল তো পাচ্ছেনই। তেজগাঁওয়ের (ট্রাকস্ট্যান্ডের সামনের) রাস্তার কথা ভাবুন, গত ৩০ বছরে কেউ এ রাস্তা দিয়ে চলতে পারেনি। এই পথটুকু যেতে দুই ঘণ্টা লেগেছে। এখন কয় মিনিট লাগে? গাবতলী গরুর হাট, বিশাল সিন্ডিকেট। সব ভেঙে দিয়েছি। এ বছর দ্বিগুণ দামে ডাক হয়েছে।
প্রথম আলো: নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার কতটা পূরণ হলো?
আনিসুল হক: ক্লিন ঢাকার কাজ তো ভালোমতো হচ্ছে। বর্জ্য অপসারণ, ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চলছে, রাস্তা করছি, অবৈধ স্থাপনা সরিয়েছি। সবকিছু করতে সময় লাগে। রাস্তায় সিসি টিভি লাগাচ্ছি। গুলশানে ইতিমধ্যে ৫০০ ক্যামেরা লেগেছে। কথা দিচ্ছি, তিন বছর পর কোনো কাজ খুঁজে পাবেন না।
প্রথম আলো: দ্বিতীয় বছরে অগ্রাধিকার কী?
আনিসুল হক: এ বছর রাস্তার কাজ ধরব, এরপর পানি-সমস্যা। আরও আছে ইউলুপ, সবুজ বনায়ন, পার্ক পরিষ্কার করা—সব একসঙ্গে করব।
প্রথম আলো: জলাবদ্ধতা নিয়ে কাজ করছেন না?
আনিসুল হক: জলাবদ্ধতা নিয়েও তো কাজ হচ্ছে। এতে আমার কাজ কম। ড্রেন তো ওয়াসার।
প্রথম আলো: ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট ভাঙতে পেরেছেন?
আনিসুল হক: ই-টেন্ডার হওয়ার পর সেটা ভেঙে গেছে। কাজ হয়তো আগে যাঁরা করতেন, তাঁরাই পাচ্ছেন। কিন্তু সেটা স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হচ্ছে।
প্রথম আলো: ই-টেন্ডার নিয়ে তো আপনার ওয়ার্ড কাউন্সিলররা বিরক্ত। তাঁরা দলের কর্মীদের জন্য কিছু করতে পারছেন না।
আনিসুল হক: আসলে ই-টেন্ডার খুবই স্বচ্ছ, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। সারা দেশ থেকে সবাই এতে অংশ নিতে পারেন। আগে যাঁকে খুশি কাজ দেওয়া যেত। এখন সেটা সম্ভব নয়। কাউন্সিলররা আস্তে আস্তে তা বুঝছেন। তাঁরা আমাকে সাহায্য করছেন।
প্রথম আলো: সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কাউন্সিলরদের কোনো ভূমিকা আছে কি?
আনিসুল হক: খুবই আছে। মিরপুরে ছয়তলা বাড়ির অংশ ভেঙেছি। উত্তরার অনেক স্থানে অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলেছি। এটা তো কাউন্সিলরদের কারণেই সম্ভব হয়েছে।
প্রথম আলো: কারওয়ান বাজার সরানোর কী হলো? কতটা এগোল?
আনিসুল হক: এখানে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। কে ছাড়তে চায়? যাঁরা সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে দোকান লিজ নিয়েছেন, তাঁরা ছাড়তে রাজি। কিন্তু অস্থায়ী যাঁরা আছেন, তাঁরা এত দিন রাজি হননি। সম্প্রতি রাজি হয়েছেন। বিকল্প ব্যবস্থা হলে তাঁরাও ছেড়ে দেবেন। তাঁদের জন্য আমিনবাজারে ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এ বছরই কারওয়ান বাজার খালি হয়ে যাবে, আশা করি।
প্রথম আলো: সব সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার যে কথা আগে বলেছিলেন, সেটা কি হচ্ছে?
আনিসুল হক: সব সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ আছে। গণপূর্তমন্ত্রী খুবই ইতিবাচক। আমাদের সংস্থার মতো রাজউকেও দুর্নীতি আছে। আসলে সমন্বয়টা খুব জরুরি। আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে।
প্রথম আলো: নগর-ব্যবস্থাপনার আইনগত সীমাবদ্ধতা কাটানোর ব্যবস্থা আছে?
আনিসুল হক: এটা তো সরকার বলতে পারবে। আমার মনে হয়, মেয়রকে সবখানেই কোনো-না-কোনোভাবে সমন্বয়কের দায়িত্বটা দেওয়া প্রয়োজন। আজ ওয়াসাকে ডাকলে ওরা আসবে। কিন্তু আমি যদি তাদের সমন্বয় সেলের প্রধান থাকি, তার এই আসা আর সেই আসার মধ্যে তফাত আছে।
প্রথম আলো: আপনার পূর্বসূরি একাধিক মেয়র নগর সরকারের দাবি করে গেছেন।
আনিসুল হক: আমি এটা দাবি করছি না। আমি মনে করি, নগর সরকার হলো সরকারের মধ্যে সরকার। আসলে নগর সরকারের দরকার নেই। একধরনের সমন্বয়ের ক্ষমতা দেওয়া দরকার। যেমন আমাকে যদি ১০০ পুলিশ দেওয়া হয়, তাহলে এই শহরের অবস্থা বদলে যাবে। এখন সব কাজের জন্য পুলিশ চাইতে হয়। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি, আমাকে ১০০ পরিবেশ পুলিশ দিন।
প্রথম আলো: আপনি দায়িত্ব নেওয়ার পর উত্তর সিটি করপোরেশনের দুর্নীতি কি কমেছে? রাজনৈতিক প্রভাব?
আনিসুল হক: একটা পরিবর্তন তো হয়েছে। তারা কাজ করতে চাচ্ছে। এখন কেউ শুক্র-শনি ভাবে না। রাতেও কাজ নিয়ে আমার বাসায় আসে। আমি ঠিকাদারদের বাসায় চেক পাঠিয়ে দিয়েছি। দেশের কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের এভাবে বিল দেওয়ার নজির নেই। আমার সিদ্ধান্ত, তিন দিনের মধ্যে ফাইলের কাজ শেষ করতে হবে। আগে সিটি করপোরেশনে শ্রমিক লীগের নেতা এলে সিইও দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকতেন। আমি এসে এই মাস্তানি বন্ধ করেছি।
প্রথম আলো: মশা মারার কী হলো?
আনিসুল হক: এখানে অনেক ব্যক্তিগত জলাশয় আছে, যেখানে কচুরিপানা আছে, যা আমি পরিষ্কার করতে পারি না। এ বছর আমি আইনি সমস্যায় কিছু করতে পারিনি। তবে কথা দিচ্ছি, আগামী বছর আর মশা থাকবে না।
প্রথম আলো: আপনার দাপ্তরিক কাঠামো, লোকবল?
আনিসুল হক: ৪০ শতাংশ লোক দিয়ে কাজ করছি। আমরা এক বছর ধরে যুদ্ধ করে আসছি। সাংগঠনিক কাঠামো এসেছে। এখন শুরু করলেও লোকজন নিয়োগ করতে অনেক সময় লেগে যাবে।
প্রথম আলো: নতুন বছরে নগরবাসীকে কী বলবেন?
আনিসুল হক: আপনারা আমাকে সহায়তা করুন। আশা করি, আগামী তিন বছরে ঢাকা শহর বদলে যাবে।