বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিসিআইসির চেয়ারম্যান শাহ মোহা. ইমদাদুল হক বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও বিদেশ থেকে আমদানি করা ৬৬ হাজার ৮৭৪ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার বুঝিয়ে দিচ্ছে না মেসার্স নবাব অ্যান্ড কোম্পানি। এ জন্য আমরা প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নবাব খানকে আসামি করে মামলা করেছি। চুক্তি অনুযায়ী, ৫০ দিনের মধ্যে বন্দর থেকে আমাদের গুদামে সার বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু তিনি দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বুঝিয়ে দিচ্ছেন না।’ তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম ও মোংলায় বিসিআইসির নিজস্ব গুদাম না থাকার সুযোগ নিয়েছে নবাব অ্যান্ড কোম্পানি। বাইরে থেকে আমদানি করা সার খালাসের পর কোম্পানির মালিক নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সার রেখেছিলেন। কিন্তু দফায় দফায় চিঠি দিলেও তিনি বিসিআইসিকে পাত্তা দিচ্ছেন না।

এদিকে আসামি নবাব খান প্রথম আলোকে বলেন, হয়রানি করার জন্য বিসিআইসি তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তিনি কোনো সার আত্মসাৎ করেননি। সব সার বুঝিয়ে দেবেন। নবাব খান উল্টো দাবি করেন, তিনি নিজে বিসিআইসির কাছে টাকা পাবেন। কিন্তু তারা টাকা দিচ্ছে না।

দেশে কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য ইউরিয়া সার উৎপাদন করে বিসিআইসি। আবার ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে সার আমদানিও করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি। বিদেশ থেকে কেনা সার পরিবহন ঠিকাদারদের মাধ্যমে বন্দর থেকে গুদামে নিয়ে আসে বিসিআইসি। তাদের চুক্তিবদ্ধ পরিবহন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের একটি নবাব অ্যান্ড কোম্পানি।

বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও বিদেশ থেকে আমদানি করা ৬৬ হাজার ৮৭৪ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার বুঝিয়ে দিচ্ছে না মেসার্স নবাব অ্যান্ড কোম্পানি। এ জন্য আমরা প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নবাব খানকে আসামি করে মামলা করেছি। চুক্তি অনুযায়ী, ৫০ দিনের মধ্যে বন্দর থেকে আমাদের গুদামে সার বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু তিনি দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বুঝিয়ে দিচ্ছেন না
বিসিআইসির চেয়ারম্যান শাহ মোহা. ইমদাদুল হক

বিসিআইসির নথিপত্র থেকে জানা গেছে, কাতার ও সৌদি আরবের কাছ থেকে ১ লাখ ৮৩ হাজার ১৫৬ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার কেনে বিসিআইসি। এসব সার পরিবহন করে তা তাদের গুদামে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নবাব অ্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে পৃথক সাতটি চুক্তি করে প্রতিষ্ঠানটি। চুক্তি অনুযায়ী, বন্দরে আসার ৫০ দিনের মধ্যে বিসিআইসিকে সার বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই কোম্পানি তা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, এমভি জিন্দা নামের একটি জাহাজ কাতার থেকে ইউরিয়া সার নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। ওই সার খালাস হয় ২০২০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। অপর দিকে এমভি সি বেনিভোলেন্স জাহাজে করে সৌদি আরব থেকে কেনা সার খালাস হয় গত বছরের ১১ নভেম্বর। এরপর ২৪ ডিসেম্বর এমভি গোল্ডেন লিফ-২ নামের একটি জাহাজ সৌদি আরব থেকে সার নিয়ে আসার পর সেটিও খালাস করা হয়। সর্বশেষ গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এমভি ইলমা নামের জাহাজে সৌদি আরব থেকে আনা সার চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে খালাস করা হয়েছে।

৬৬ হাজার মেট্রিক টন সার আত্মসাতের ঘটনায় বিসিআইসি মামলা করেছে, সেটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই বিশাল ধরনের দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়–আত্মসাতের ঘটনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে করা সম্ভব নয়, যদি না এর মধ্যে বিসিআইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ না থাকে। এমন একটা সিন্ডিকেট আছে, যেটি এই প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ করে দিয়েছে। শুধু এই কোম্পানিকে বিচারের আওতায় আনলে হবে না, এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে বিচারের আওতায় আনতে হবে
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান

মামলার বাদী ও বিসিআইসির ডিজিএম সাইফুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠান কাতার ও সৌদি আরব থেকে ১ লাখ ৮৩ হাজার ১৫৬ মেট্রিক টন সার কেনে। মেসার্স নবাব অ্যান্ড কোম্পানি এই সার বুঝে নেয়। এর মধ্যে ৬৬ হাজার ৮৭৪ মেট্রিক টন সার বুঝিয়ে দিচ্ছেন না। গত আগস্ট থেকে গত ৩ নভেম্বর পর্যন্ত দফায় দফায় চিঠি দিয়ে সার বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য নবাব অ্যান্ড কোম্পানিকে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি টালবাহানা করছে।’

অবশ্য বিসিআইসির তদন্ত কমিটির কাছে মেসার্স নবাব অ্যান্ড কোম্পানি লিখিতভাবে দাবি করেছে, তাদের কাছে ৫৮ হাজার ৫৩৩ মেট্রিক টন সার রয়েছে। তবে বাস্তবে তদন্ত কমিটি ২৮ হাজার মেট্রিক টন সারের অস্তিত্ব পেয়েছে বলে জানিয়েছেন এই কমিটির প্রধান ও বিসিআইসির উপব্যবস্থাপক (খুলনা) আবু সাঈদ।

সার আত্মসাতের অভিযোগে বিসিআইসির করা মামলা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ও মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সফিকুল ইসলাম আকন্দ।

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘৬৬ হাজার মেট্রিক টন সার আত্মসাতের ঘটনায় বিসিআইসি মামলা করেছে, সেটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই বিশাল ধরনের দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়–আত্মসাতের ঘটনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে করা সম্ভব নয়, যদি না এর মধ্যে বিসিআইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ না থাকে। এমন একটা সিন্ডিকেট আছে, যেটি এই প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ করে দিয়েছে। শুধু এই কোম্পানিকে বিচারের আওতায় আনলে হবে না, এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।’

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন