ঢাকার শিশুরা খেলতে চায়, মাঠ কোথায়
রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় বাস করে একটি পরিবার। সেই পরিবারে দুটি শিশু আছে। একটির বয়স ৪ বছর, অন্যটির ৯ বছর। ৯ বছর বয়সী শিশুটির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, সে সারা দিন মুঠোফোন নিয়ে কেন পড়ে থাকে। জবাবে বলল, সে খেলতে চায়। মাঠ কোথায়?
শিশুটির বাবা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁর আশপাশের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো উন্মুক্ত মাঠ নেই। দু–একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঠ আছে। সেগুলো বিকেলে তালাবদ্ধ থাকে। ফলে তাঁর সন্তান চাইলেও খেলার কোনো সুযোগ নেই।
ঢাকার বহু পরিবারের মা–বাবা এখন মাঠ না থাকার সমস্যায় ভুগছেন। শিশুদের খেলার সুযোগ না থাকায় তারা সারা দিন মুঠোফোন অথবা ট্যাব নিয়ে পড়ে থাকে।
সমস্যাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণার ফল সামনে আসায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের একটি বড় অংশ মুঠোফোন, টেলিভিশন, ট্যাব বা কম্পিউটারের মতো ইলেকট্রনিক যন্ত্রের পর্দায় চোখ রেখে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা কাটায়। এর ফলে তাদের ঘুম কমে যাচ্ছে, ওজন বাড়ছে, মাথাব্যথা ও চোখের সমস্যা হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
দুই বছর ধরে ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৪২০টি শিশুর ওপর এই গবেষণা করা হয়। গবেষণার ফলাফল ৪ মে জার্নাল অব মেডিক্যাল ইন্টারনেট রিসার্চ (জেএমআইআর) হিউম্যান ফ্যাক্টরস-এ প্রকাশিত হয়। গতকাল শুক্রবার তা প্রথম আলোসহ কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ঘোষণা করেছেন, আগামী শিক্ষাবর্ষে বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করা হবে। পরীক্ষায় নম্বরও থাকবে। তিনি বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের ‘ডিভাইসের’ (ডিজিটাল যন্ত্র) আসক্তি কমাতে এই উদ্যোগ নিচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী যেদিন এই ঘোষণা দেন, তার এক দিন পর গত ৩০ মার্চ দুপুরে মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের হোপ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের গেটে কথা হয় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আবিজা রহমানের বাবা কে এম আরিফুর রহমানের সঙ্গে। প্রতিমন্ত্রীর উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও হতাশা নিয়ে তিনি বলেন, ‘উদ্যোগটা চমৎকার। কিন্তু আমার সন্তান খেলবে কোথায়? এই স্কুলের করিডরে নাকি সিঁড়িতে?’
হোপ ইন্টারন্যাশনালের পাশেই আরও দুটি স্কুল দেখা গেল, যেগুলো আবাসিক ভবনের নিচতলা বা গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এগুলোরও নিজস্ব কোনো মাঠ নেই। ভবন থেকে বের হলেই মূল সড়ক, যেখানে চলে হরেক রকমের যানবাহন। ঢাকার বেসরকারি প্রায় সব স্কুলের চিত্র একই।
উদ্যোগটা চমৎকার। কিন্তু আমার সন্তান খেলবে কোথায়? এই স্কুলের করিডরে নাকি সিঁড়িতে?আবিজা রহমানের বাবা কে এম আরিফুর রহমান
কত মাঠ চাই, এখন আছে কত
২০২৩ সালে প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, রাজধানীর ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাঠ আছে মাত্র ৯০টি বিদ্যালয়ে। অর্থাৎ ২৫২টিতে মাঠ নেই।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, একটি আধুনিক শহরে প্রতি আধা বর্গকিলোমিটার এলাকায় একটি খেলার মাঠ থাকা আবশ্যক। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আয়তন (৩০৫ দশমিক ৪৭ বর্গকিলোমিটার) অনুযায়ী মাঠ প্রয়োজন অন্তত ৬১০টি। অথচ বাস্তবে আছে মাত্র ২৩৫টি! অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক মাঠও নেই।
একই গবেষণার তথ্য বলছে, ২৩৫টি মাঠের মধ্যে ১৪১টি রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। এ ছাড়া কলোনির মাঠ আছে ২৪টি এবং ঈদগাহ মাঠ আছে ১২টি। ১৬টি সরকারি মাঠ বিভিন্নভাবে দখল হয়ে গেছে। এর বাইরে মাত্র ৪২টি মাঠ আছে, যেগুলো সবাই ব্যবহার করতে পারে।
যদিও জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঠ, ক্রীড়া, খেলাধুলা ও শরীরচর্চার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হবে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) অনুযায়ী, ঢাকার ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪১টি ওয়ার্ডে কোনো খেলার মাঠই নেই। এর ফলে ঢাকার জনসংখ্যার প্রায় ২৭ দশমিক ৮২ শতাংশ কিশোর ও তরুণ কোনো ধরনের খেলার মাঠের সুবিধা ছাড়াই বেড়ে উঠছে, যা তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
জানতে চাইলে রাজউকের প্রধান নগর–পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নব্বইয়ের দশকে ঢাকার যেসব বড় ও মাঝারি আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, তারা খেলার জন্য মাঠ রাখেনি। তখন আইনকানুনও এতটা কঠোর ছিল না। তবে গত ১০ থেকে ১৫ বছরে যেসব আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তাদের কেউ কেউ খেলার জন্য মাঠ রেখেছে।
মাঠ আছে, কেউ খেলতে পারে না
ঢাকার বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ছুটির পরে তালাবদ্ধ থাকে। সেখানে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খেলতে দেওয়া হয় না, বাইরের শিশুদের তো নয়ই।
মিরপুরের হোপ ইন্টারন্যাশনার স্কুলের কাছেই আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি মোটামুটি বড় মাঠ আছে। তবে কয়েক দিন বিকেলে গিয়ে দেখা গেছে, স্কুলের ফটক তালাবদ্ধ। মাঠ খালি।
আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. নূরে আলম প্রথম আলোকে বলেন, উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে অনেক পক্ষ খেলতে আসে। কিশোরেরা মারামারি করে। এসব সামাল দেওয়ার সক্ষমতা তাঁদের নেই। এ কারণেই স্কুল ছুটির পর মাঠ বন্ধ রাখা হয়।
জাতীয় সংসদ ভবনের সীমানার ভেতরে (পশ্চিম পাশে) শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য ‘শহীদ ফারহান ফাইয়াজ খেলার মাঠ’ উদ্বোধন করা হয়েছিল ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে। সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এটি উদ্বোধন করেন। তবে সেখানে কাউকে খেলতে দেখা যায় না।
মাঠটিতে গতকাল ছুটির দিনে গিয়ে দেখা যায়, ফটক বন্ধ। এক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, মাঠে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ। কেউ যদি ভেতরে প্রবেশ করতে চায়, তাহলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন মাঠটি তদারকির দায়িত্বে রয়েছে। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তরিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, মাঠ যাতে সব সময় খোলা রাখা হয়, সেই নির্দেশনা দেওয়া আছে। এরপরও বন্ধ রাখা হলে তিনি খোঁজ নিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবেন।
মাঠ খুঁজতে কমিটি
রাজধানীর বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ নেই, এমন বাস্তবতায় খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা কতটা যৌক্তিক, এমন প্রশ্নের জবাবে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক প্রথম আলোকে বলেন, পরিকল্পনা করেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা আগামী শিক্ষাবর্ষের আগেই বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
আমিনুল হক বলেন, সারা দেশে শহর ও গ্রামাঞ্চলে খেলার মাঠ নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের জন্য ১০ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। ওই কমিটি মাঠ খুঁজে বের করা বা এই পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সে জন্য কাজ শুরু করেছে। ইতিমধ্যে যেসব স্কুলের মাঠ রয়েছে, সেখানে কেবল ওই স্কুলের শিক্ষার্থীরাই খেলবে না, সেখানে অন্য শিক্ষার্থীরাও খেলতে পারবে এ-সংক্রান্ত চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বি এম আবদুল হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ-সংক্রান্ত চিঠি দেওয়া শুরু হয়েছে।
যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব খেলার মাঠ রয়েছে, তারা অন্যদের খেলার সুযোগ না দিলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে বি এম আবদুল হান্নান বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খেলার মাঠের সুবিধায়ও বৈষম্য
সরকারি যেসব আবাসন প্রকল্প হয়, সেখানে খেলার মাঠ রাখা হয়। সরকারি চাকরিজীবীদের সন্তানদের খেলার মাঠ সুবিধা রয়েছে। বেসরকারি বড় আবাসন প্রকল্পে আছে খেলার মাঠ। এখন অভিজাত ভবন তথা কনডোমিনিয়াম করার সময় খেলার জায়গা রাখা হয়। ফলে ধনী পরিবারের সন্তানেরা খেলার সুবিধা পায়। বঞ্চিত হয় মূলত নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের শিশুরা।
বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে নকশা অনুমোদনের সময় খেলার মাঠের জন্য জায়গা রাখা হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, সেখানে অন্য কোনো স্থাপনা করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাঠ থাকলেও তাতে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারিভাবে মাঠ তৈরি করে তা ভাড়া দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে এখন। এসব মাঠে খেলতে হলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হয়।
নগর-পরিকল্পনাবিদ ও অভিভাবকেরা বলছেন, মধ্যমেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবে ঢাকাসহ শহরের যেসব এলাকায় মাঠ নেই, সেখানে জমি অধিগ্রহণ করে মাঠের ব্যবস্থা করতে হবে। তার আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকার মাঠ এবং সরকারি সংস্থার খোলা জায়গা শিশুদের খেলার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থার জমি অবৈধ দখলে আছে। সেগুলো দখলমুক্ত করে খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা যায়। ঢাকার উদ্যানগুলোর একটি অংশে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ করার পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
নগর–পরিকল্পনাবিদ ও আইপিডির নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার চাইলে মাঠের ব্যবস্থা করতে পারে। প্রশ্ন হলো চায় কি না। ৩০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে মেট্রোরেল করা হলো। একই পরিমাণ টাকা খরচ করে ঢাকায় জমি অধিগ্রহণ করে, ভবন ভেঙে মাঠ করা সরকারের অগ্রাধিকারে আসবে কি? তিনি আরও বলেন, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন জায়গায় মাঠগুলো ক্লাবকে দিয়ে রাখা হয়েছে। সাধারণ পরিবারের শিশুরা খেলতে পারে না। সেগুলোর বরাদ্দ বাতিল করা দরকার।
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মাঠের অভাবে পুরো প্রজন্ম ক্ষতির মুখে পড়ছে। এটা সরকারের অগ্রাধিকারে আসা দরকার।