রাজধানীর মিরপুর-১ ও মিরপুর-১০ নম্বর সেকশন এবং উত্তরায় উচ্ছেদ হওয়া হকারদের পুনর্বাসনের জন্য বিকল্প জায়গা খুঁজছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। উপযুক্ত জায়গা পাওয়া গেলে সেখানে হকারদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিয়মিত ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির।
ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান আজ বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে এ কথা জানান। তিনি বলেন, হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গার ব্যবস্থা করা হবে। সেখানে সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ থাকবে। তবে কোনো অবস্থাতেই সড়ক দখল করে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না।
সম্ভাব্য কয়েকটি জায়গা নিয়ে আজ সকালে করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে বলে জানান শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের নিজস্ব জমি খুঁজে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে জরুরি ভিত্তিতে জায়গা নির্ধারণ করা হবে।
প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা হকারদের জন্য একটা নির্দিষ্ট জায়গার ব্যবস্থা করছি। আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিন সেখানে পরিদর্শনে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। জায়গাটি উপযুক্ত হলে সেখানে তাঁদের জন্য আপাতত হলিডে মার্কেট করা হবে। সেখানে ৩০০ থেকে ৫০০ জনকে জায়গা দেওয়া সম্ভব কি না, তা দেখা হবে।’
মিরপুর এবং উত্তরার হকারদের জন্য সম্ভাব্য স্থান
মিরপুরের হকারদের জন্য শাহ আলী কাঁচাবাজারের আড়ত কমপ্লেক্সের একটি জায়গা বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান ডিএনসিসির প্রশাসক। তিনি বলেন, গতকাল উচ্ছেদ অভিযানের সময় আড়ত ব্যবসায়ীদের একজন ওই জায়গা ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। তবে এ বিষয়ে আড়ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক হয়নি। জায়গাটি পরিদর্শনের পর আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
বর্তমানে তাঁর কাছে প্রায় ৮০০ হকারের একটি তালিকা রয়েছে। সেটি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হতে পারে।
এর আগে মিরপুর-১০ এলাকার হকারদের গাবতলীর দিকে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত একটি জায়গায় যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে ওই জায়গায় হকারদের অনেকে যাননি বলে জানান প্রশাসক। তাঁদের আবারও প্রস্তাব দেওয়া হবে। এ জন্য মাইকিং করে হকারদের জানানো এবং তাঁদের সঙ্গে বসে আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে উত্তরার রাজলক্ষ্মী এলাকার হকারদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে মাঝামাঝি কোনো জায়গা খোঁজার চেষ্টা চলছে। এ জন্য দিয়াবাড়ির একটি জায়গাও পরিদর্শন করা হতে পারে। সেখানে হকারদের জায়গা দেওয়ার সুযোগ না থাকলে অন্য বিকল্প খোঁজা হবে।
নির্দিষ্ট সময় বেঁধে ব্যবসার সুযোগ
ডিএনসিসির প্রশাসক বলেন, হকারদের শুধু সপ্তাহে দুই দিন হলিডে মার্কেটে বসার সুযোগ দিলে তাঁদের জীবিকা নির্বাহ কঠিন হতে পারে। এ কারণে নির্ধারিত জায়গায় নিয়মিত ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সময়টি বিকেল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত হতে পারে।
শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘সেটা অবশ্যই কোনো নির্ধারিত খালি জায়গা হবে; রাস্তা নয়। রাস্তা ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই। প্রয়োজনে জায়গাটিতে সীমানাপ্রাচীরও করে দেওয়া হবে।’
চাঁদাবাজি ঠেকাতে সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধান
পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে হকারদের কাছ থেকে বাইরের কোনো গোষ্ঠী যাতে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় করতে না পারে, সে বিষয়েও নজর দিতে চায় ডিএনসিসি। প্রশাসক বলেন, হকারদের সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি নেওয়া হতে পারে। বিনিময়ে তাঁদের ব্যবসার জায়গা থেকে উৎপন্ন বর্জ্য পরিষ্কার করবে সিটি করপোরেশন।
নির্ধারিত জায়গায় নিয়মিত ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সময়টি বিকেল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত হতে পারে।
শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত একটা ফি থাকবে। যেমন: ৫০ টাকা। তাঁরা যে ময়লা করবেন, সেই ময়লা আমরা পরিষ্কার করে দেব। এ রকম শর্তের ভিত্তিতে তাঁদের একটা ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা করব।’
হকারদের তালিকা নতুন করে যাচাই হতে পারে
মিরপুরের হকারদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে আগের তালিকাটি আবার যাচাই করার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন ডিএনসিসির প্রশাসক। তাঁর ভাষ্য, কয়েক মাস আগে তিনটি সংস্থার মাধ্যমে তালিকাটি তৈরি করা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করে কারা কোথায় থাকেন এবং কত দিন ধরে ব্যবসা করছেন, তা যাচাই করেছিলেন।
তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। কেউ তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, আবার নতুন কেউ হকার হিসেবে বসেছেন। তাই আগের তালিকার ভিত্তিতেই সবাইকে পুনর্বাসন করা হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
শফিকুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমানে তাঁর কাছে প্রায় ৮০০ হকারের একটি তালিকা রয়েছে। সেটি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হতে পারে। তবে পুনর্বাসনের জন্য জায়গা নির্ধারণ, সেখানে কতজনকে রাখা সম্ভব এবং কারা অগ্রাধিকার পাবেন—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
উচ্ছেদ অভিযানের পর হকারদের জীবিকা ও সড়ক দখলমুক্ত রাখার মধ্যে সমন্বয় করাই এখন ডিএনসিসির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। বিকল্প জায়গা নির্ধারণ ও তালিকা সংশোধনের কাজ শেষ হলে পুনর্বাসনের পরিকল্পনাটি কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, তা স্পষ্ট হবে।
উচ্ছেদের পর ফাঁকা সড়ক-ফুটপাত
মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেট ও মিরপুর-১৩ নম্বরের দিকে সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর অভিযান চালায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। অভিযানের পর গোলচত্বর থেকে বিআরটিএ কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার ফুটপাতসহ আশপাশের সড়ক ফাঁকা হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত ও সড়কের বড় অংশজুড়ে থাকা পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও খাবারের দোকান সরিয়ে দেওয়ায় পথচারীদের চলাচলে স্বস্তি ফেরে। তবে ওই অভিযানের সময় হকার ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, গাড়িতে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
উচ্ছেদের পর মিরপুর-১০ এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় ডিএনসিসি। সংস্থাটির প্রশাসক রাতের বেলায় এলাকাটি পরিদর্শন করে গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার, নালা-নর্দমার উন্নয়ন এবং ময়লা ফেলার পাত্র বসানোর নির্দেশ দেন। অবৈধ দোকানের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং মেট্রোরেলের পিলার ও আশপাশের দেয়াল থেকে অবৈধ পোস্টার সরানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়।
গতকাল বুধবার মিরপুর-১ নম্বরের শাহ আলী কাঁচাবাজার এলাকায় সকাল ও সন্ধ্যায় দুই দফায় উচ্ছেদ অভিযান চালায় ডিএনসিসি। এ সময় অস্থায়ী দোকানপাট ও কাঠামো ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি সড়ক ও ফুটপাতে রাখা মালপত্র জব্দ করা হয়।
এর আগে গত ৩০ এপ্রিল মিরপুরের ২০২ জন হকারকে ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেয় ডিএনসিসি। তাঁদের মধ্যে ১০২ জনকে মিরপুর-১৩ নম্বর সেকশনের ওয়াসা রোডে এবং ১০০ জনকে গাবতলী কাঁচাবাজার সংলগ্ন খালি জায়গায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তখন হকাররা ওই জায়গায় ব্যবসা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।