চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ৭ বছর
বিচারে গতি নেই, সাত মাসে একজনও সাক্ষ্য দেননি
আজ চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের সাত বছর। সেদিনের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে ধীরগতিতে।
‘আমরা পাঁচ ভাই! আমার আব্বা একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিলেন। আমার চার ভাই তখন পড়াশোনা করত। অগ্নিকাণ্ডে বাবা মারা যাওয়ার পর আমার ওপর সংসারের দায়িত্ব আসে। দুই ভাইয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। আমি এখন কাপড়ের দোকানে চাকরি করি। বাবার মৃত্যুর পর আমাদের পুরো সংসার এলোমেলো হয়ে গেছে। আমরা কী অবস্থায় আছি, বলে বোঝাতে পারব না।’
কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত মো. আসিফ। অগ্নিকাণ্ডের সময় তাঁর বাবা জুম্মন ওয়াহেদ ভবনটির দোতলায় একটি ডেকোরেটরের দোকানে ছিলেন। তিনি সেখানেই পুড়ে মারা যান। চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৭১ জনের মধ্যে আসিফের বাবা ছিলেন একজন।
আজ ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের সাত বছর। সেদিনের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে ধীরগতিতে। গত সাত মাসে একজনও সাক্ষ্য দেননি।
বিগত সরকারের পতন হয়েছে, সবার সবকিছু হয়েছে। কিন্তু আমাদের তো কোনো কিছু হইল না। রায়ই তো এখনো হইল না।মো. আসিফ, মামলার বাদী, চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ড
ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের অভিযোগ, সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, সাক্ষীদের হাজিরের জন্য তারা সমন পাঠাচ্ছে।
আদালত সূত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানসনে অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জন মারা যান। অগ্নিকাণ্ডের পরদিন চকবাজার থানায় মামলা করেন মো. আসিফ। মামলাটি তদন্ত করে ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। আট আসামি হচ্ছেন ওয়াহেদ ম্যানসনের মালিক হাসান সুলতান, হোসেন সুলতান, রাসায়নিকের গুদামের মালিক ইমতিয়াজ আহমেদ, পরিচালক মোজাম্মেল ইকবাল, ব্যবস্থাপক মোজাফফর উদ্দিন, মোহাম্মদ জাওয়াদ আতিক, মো. নাবিল ও মোহাম্মদ কাশিফ। তাঁরা আটজনই এখন জামিনে আছেন।
পরে ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত। ওই বছরের ২৪ জুলাই সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর পর থেকে গত আড়াই বছরে ১৬৭ জনের মধ্যে ৬ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। সর্বশেষ গত বছরের ৩১ জুলাই সেলিম আহমেদ লিটন নামের এক দোকানদার সাক্ষ্য দেন।
রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। তবে সাক্ষীরা সমন পেয়েও ঠিকমতো আদালতে হাজির না হওয়ায় মামলার বিচার শেষ হতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।
গত বছরের ১২ নভেম্বর মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণের সর্বশেষ নির্ধারিত তারিখ ছিল। কিন্তু ওই দিন কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। সে জন্য ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. খোরশেদ আলমের আদালত আগামী ২৯ মার্চ পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য করেন।
সংশ্লিষ্ট আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. শহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তো সমন পাঠাচ্ছি। এখন সাক্ষীরা কেন আসছেন না, সেটা তো আমরা জানি না। সঠিকভাবে পেশকার সমন পাঠান কি না, আমি সেটা দেখব। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিচারককে জানিয়েছি, মামলাটা দেরি হচ্ছে।’
ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী জানান, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। তবে সাক্ষীরা সমন পেয়েও ঠিকমতো আদালতে হাজির না হওয়ায় মামলার বিচার শেষ হতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।
৭ বছরেও ক্ষতিপূরণ নেই
অগ্নিকাণ্ডের এক মাস পর ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) উদ্যোগে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গণশুনানিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়র সাইদ খোকন বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দেন।
২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্য থেকে ২১টি পরিবারের সদস্যকে দৈনিক মজুরিভিত্তিক মাস্টাররোলে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরি দেয়। চারটি পরিবারের মধ্যে আর্থিক ক্ষতিপূরণ বাবদ দুই লাখ টাকার চেক প্রদান করা হয়। চারটি পরিবারকে সিটি করপোরেশনের অধীনে অফিসার পদে চাকরি ও দুটি পরিবারকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন মার্কেটে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার জন্য কাগজ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য আসিফ বলেন, ২১টি পরিবারকে মাস্টাররোলে চাকরি দেওয়া হলেও তাঁদের চাকরি এখনো স্থায়ী হয়নি। চারজনকে এখনো অফিসার পদে চাকরি দেওয়া হয়নি। দুজনের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা করে নিয়ে এখনো দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তাঁর ছোট ভাই স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি চাকরি পাননি।
বিচার নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে মামলার বাদী আসিফ বলেন, ‘আমাদের যে এত বড় ক্ষতি হয়ে গেল, তার খবর তো কেউ নেয় না। বিগত সরকারের পতন হয়েছে, সবার সবকিছু হয়েছে। কিন্তু আমাদের তো কোনো কিছু হইল না। রায়ই তো এখনো হইল না।’