উত্তরায় জুলাই শহীদ নারী মঞ্চের ভাস্কর্যগুলো কালো কাপড়ে ঢাকল কারা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও অংশগ্রহণকারী নারীদের আত্মত্যাগ, সাহস ও ঐতিহাসিক অবদান স্মরণীয় করে রাখতে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি গোলচত্বরে (মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজসংলগ্ন) নির্মাণ করা হয়েছিল ‘জুলাই শহীদ নারী মঞ্চ’। কিন্তু সেই স্মৃতিমঞ্চের নারী ভাস্কর্যগুলো এখন কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে বেঁধে রাখা হয়েছে। কে বা কারা কেন শুধু নারী ভাস্কর্যগুলো এভাবে ঢেকে রেখেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে দিয়াবাড়ি এলাকায় ওই গোলচত্বরে গিয়ে দেখা যায়, চত্বরটির পূর্ব অংশে পশ্চিম দিকে মুখ করে মঞ্চটি নির্মাণ করা হয়েছে। মঞ্চের তিনটি স্তম্ভ রয়েছে। এক পাশের স্তম্ভে আন্দোলনের প্রতীক মুষ্টিবদ্ধ হাত এবং অন্য পাশের স্তম্ভে জুলাই অভ্যুত্থানে মানুষের মুখে মুখে পরিচিতি পাওয়া প্রতিবাদী বিভিন্ন স্লোগান। এর মধ্যে লাল রঙের একটি গোল বৃত্তে লেখা, ‘দফা এক দাবি এক, স্বৈরাচারের পদত্যাগ’। আর মাঝের স্তম্ভটি ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে বেঁধে রাখা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সংগ্রহ করা একটি ছবিতে দেখা যায়, মাঝের ওই স্তম্ভে ১০ জন নারীর আবক্ষ ভাস্কর্য রয়েছে।
ভাস্কর্য কালো কাপড় দিয়ে বাঁধা থাকার বিষয়ে স্থানীয় একাধিক দোকানির সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। গোলচত্বরের পাশেই চায়ের দোকান শহীদুল ইসলামের। তিনি বলেন, শুরু থেকেই তিনি ওই অংশটি কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা অবস্থায় দেখেছেন। রোদ, ঝড়বৃষ্টিতে কাপড় পুরোনো হয়ে খুলে যায়, বাতাসে ছিঁড়ে যায়। আবার কারা যেন নতুন করে কালো কাপড় বেঁধে দেয়।
সর্বশেষ কালো কাপড় লাগাতে দেখেছেন মোহাম্মদ রাকিব নামের এক তরুণ। তিনি দিয়াবাড়ি বিআরটিএ কার্যালয়ের পাশে একটি খাবার হোটেলের কর্মী। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, গত শনিবার রাত দেড়টার দিকে হোটেলের কাজ শেষে বাসায় ফিরছিলেন তিনি। তখন গোলচত্বরে ওই মঞ্চে তিন-চারজনকে কালো কাপড় দিয়ে ভাস্কর্য বাঁধতে দেখেন। তাঁদের কাউকে তিনি চেনেন না বলেও জানান।
এদিকে কালো কাপড় দিয়ে নারী ভাস্কর্যের অংশটুকু ঢেকে রাখা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ‘চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে উত্তরা’ (সংক্ষেপে চব্বিশের উত্তরা) নামের পেশাজীবী অভিভাবকদের একটি সংগঠনের সদস্য মনীষা মাফরুহা কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখা ভাস্কর্যের ছবি নিজের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করে দাবি করেছেন, কালো কাপড়ের নিচে থাকা কয়েকজন নারীর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে।
‘জুলাই শহীদ নারী মঞ্চ আবার কালো কাপড়ে ঢাকা কেন? নারী ভাস্কর্যগুলো কোথায়?’—এমন প্রশ্ন তুলে মনীষা মাফরুহা লেখেন, এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং জুলাই আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা স্মরণ, নতুন প্রজন্মের কাছে সেই ইতিহাস তুলে ধরা এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে পরিকল্পিত একটি স্মৃতিমঞ্চ। তবে উদ্বোধনের আগেই উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে মঞ্চটি কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয় এবং পরে তা আর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়নি।
এ বিষয়ে মনীষা মাফরুহার সঙ্গে প্রথম আলোর মুঠোফোনে কথা হয়। তিনি বলেন, গত শনিবার ১০ জন নারীর স্মরণে সংগঠনের সদস্যরা মঞ্চসংলগ্ন এলাকায় গাছের চারা লাগাতে যান। তখন তাঁরা (চব্বিশের উত্তরার সদস্যরা) ভাস্কর্যের ওই অংশটি খোলা দেখতে পেয়েছিলেন। পরদিন গিয়ে আবার দেখেন, ওই অংশটি কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। কালো কাপড় সরিয়ে দেখতে পান, নারীদের অবয়ব–সংবলিত অংশ থেকে প্রায় চারটি নারী ভাস্কর্য সম্পূর্ণভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে।
ভাস্কর্য কালো কাপড় দিয়ে বাঁধা প্রসঙ্গে মনীষা বলেন, গত ১৮ ডিসেম্বর ওই মঞ্চের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে উদ্বোধন না হওয়ায় সিটি করপোরেশনের নির্দেশে ঠিকাদার নারী ভাস্কর্যের অংশটি কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছিলেন। মাঝে অনেক দিন কোনো কাপড় ছিল না। এখন নতুন করে ওই অংশটি কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে নারীদের আবক্ষ অবয়বের কয়েকটি ভাস্কর্য তুলে ফেলা হয়েছে। কেন শুধু নারী ভাস্কর্য সরানো হলো এবং কারা এ কাজ করেছে, তা দ্রুত তদন্ত করে প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
এ ঘটনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের কাছে ‘চব্বিশের উত্তরা’ লিখিত অভিযোগ দিয়েছে বলেও ফেসবুক পোস্টে জানান মনীষা। পাশাপাশি ওই ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত, অপসারণ করা নারী ভাস্কর্য উদ্ধার ও পুনঃস্থাপন, দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ, স্মৃতিমঞ্চের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের জাতীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মঞ্চের ফলকে উদ্বোধক হিসেবে তৎকালীন ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের নাম লেখা। এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘চব্বিশের উত্তরা নামের সংগঠনের প্রস্তাবে এবং আমার উদ্যোগে মঞ্চটি নির্মাণ করা হয়েছিল। আমি থাকার সময়ই ওই মঞ্চের নির্মাণকাজ শেষ হয়।’ তবে নির্মাণকাজ চলার সময়ই মঞ্চ ও নারী ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়ে তিনি উগ্রপন্থীদের হুমকি পেয়েছিলেন বলে জানান মোহাম্মদ এজাজ।
ভাস্কর্যে কালো কাপড় বাঁধা নিয়ে কথা বলতে ঢাকা উত্তর সিটির অঞ্চল-৬-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান এবং ওই অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশীদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছে প্রথম আলো। এই দুই কর্মকর্তাকে খুদে বার্তাও দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি নিয়ে অবগত আছেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটির বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ওই অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।