হেভেন মাইক্রোস্কুলের দ্বিতীয় বার্ষিক অনুষ্ঠান
স্নায়ুবৈচিত্র্যসম্পন্ন শিশুদের গান, ছবি-ভিডিও প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে উদ্যাপন
স্নায়ুবৈচিত্র্যসম্পন্ন (নিউরোডাইভারজেন্ট) শিশুদের নানা উপস্থাপনায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশেষায়িত হেভেন মাইক্রোস্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর বারিধারার একটি হোটেলে স্কুলটির দ্বিতীয় বার্ষিক এ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবক, পরিবারের সদস্য ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। হেভেন মাইক্রোস্কুল মূলত স্নায়ুবৈচিত্র্যসম্পন্ন (নিউরোডাইভারজেন্ট) শিশুদের জন্য পরিচালিত একটি বিশেষায়িত শিক্ষালয়।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সংগীত পরিবেশনা, তাদের নির্মিত ভিডিও ও তাদের তোলা ছবির প্রদর্শনী হয়। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার ও সম্মাননা। আয়োজনের প্রতিটি পর্বে শিশুদের সৃজনশীলতা ও প্রচেষ্টার বহুমাত্রিকতার প্রকাশ ফুটে ওঠে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, আত্মপ্রকাশ ও ব্যক্তিগত বিকাশকে উৎসাহিত করতে এই আয়োজন বলে জানিয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল—‘নিউরোডাইভার্স ভয়েসেস অব টুমরো’।
অনুষ্ঠানের শুরুতে হেভেন মাইক্রোস্কুল নিয়ে একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। তাতে বিশেষায়িত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তুলে ধরে বলা হয়, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে নির্দিষ্ট সময়, তুলনা আর নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে, সেখানে নিউরোডাইভার্স শিশুদের জন্য আলাদা ও সংবেদনশীল শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলেছে হেভেন মাইক্রোস্কুল। প্রতিষ্ঠানটির মূল দর্শন—শিশুকে বদলানোর চেষ্টা নয়, বরং শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী শেখার পরিবেশকে পুনর্গঠন করা। শিশুদের বিশ্বাস, প্রতিটি শিশুর শেখার ধরন আলাদা, আর সেই বৈচিত্র্যই স্বাভাবিক।
হেভেন মাইক্রোস্কুলের প্রধান আঞ্জুমান পারভীন প্রথম আলোকে বলেন, নিউরোডাইভার্স শিশুদের শিখন সক্ষমতা নিয়ে কোনো অনুমান না করা, চোখে চোখ রেখে কথা বলা বা চাপ না দেওয়া কিংবা তাৎক্ষণিক সাড়া প্রত্যাশা না করাই অন্তর্ভুক্তিমূলক আচরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই দর্শনকে সামনে রেখেই হেভেন মাইক্রোস্কুল এমন একটি শিক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায়, যেখানে শিশুরা শুধু শেখে না—নিজেদের মতো করেই বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়।
রাজধানীর গুলশান এলাকায় পরিচালিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে আঞ্জুমান পারভীন বলেন, প্রতিটি শিশুর শেখার ধরন, আগ্রহ ও বিকাশের গতি এক নয়। কিন্তু বাংলাদেশে নিউরোডাইভার্স শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি এখনো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। তিনি আরও বলেন, নিউরোডাইভার্স শিশুদের ক্ষেত্রে প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির পাশাপাশি এমন একটি পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে তাদের ব্যক্তিগত চাহিদা, সক্ষমতা ও আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এসব শিশুর জন্য ধারাবাহিক সহায়তা ও পরিচিত শিক্ষকের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে এই শিক্ষক বলেন, নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশে তারা নিজেদের সম্ভাবনা আরও ভালোভাবে বিকশিত করতে পারে।
এরপর অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন হেভেন মাইক্রোস্কুলের শিক্ষার্থী আহনাফ। এই শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার ও সম্মাননা স্মারক তুলে দিয়ে সংগীতশিল্পী নকীব খান উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, শিশুরা তাঁর গাওয়া গান গাওয়া এবং এসব গানে আগ্রহী হওয়ার বিষয়টি তাঁর হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
অনুষ্ঠানের হলরুমজুড়ে আহনাফ নামের আরেক শিক্ষার্থীর তোলা কয়েকটি ছবির প্রদর্শনী হয়। এরপর এই শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার ও সম্মাননা তুলে দিয়ে আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অর্জনকে কেবল আনুষ্ঠানিক পুরস্কারের মানদণ্ডে মূল্যায়ন করলে চলবে না।
বিশেষায়িত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। সেখানে এক শিক্ষার্থীর বানানো ভিডিও প্রদর্শনের পর ওই শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার ও সম্মাননা স্মারক তুলে দিয়ে তিনি বলেন, স্নায়ুবৈচিত্র্যসম্পন্ন শিশুদের জন্য এমন উদ্যোগ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্বের অংশ।
হেভেন মাইক্রোস্কুলের আরেক শিক্ষার্থী আম্মারের আগ্রহ সাবান বানানোতে, সে হতে চায় উদ্যোক্তা। এই শিক্ষার্থীর আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে সাবান বানানোর প্রশিক্ষণ দেয় তার স্কুল। তারই অংশ হিসেবে এই শিক্ষার্থীর বাড়িতে বানানো সাবান উপহার হিসেবে দেওয়া হয় অনুষ্ঠানের অতিথিদের। এরপর ওই শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার ও সম্মাননা তুলে দিয়ে নারী উদ্যোক্তা আফরোজা পারভীন নিউরোডাইভারজেন্ট শিশুদের উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহের প্রশংসা করেন।
অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে স্যার জন উইলসন স্কুলের অধ্যক্ষ সাবরিনা শহীদ বলেন, একটি শিশুকে বড় করে তুলতে আসলে পুরো একটি সমাজের প্রয়োজন হয়।
আর শিক্ষার্থী আম্মারের মা তানিম লাইলা তাঁর সন্তানের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দেওয়ায় হেভেন মাইক্রোস্কুলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।