মেয়াদ শেষ হতে এখনো প্রায় ১০ মাস বাকি, তার আগেই রাজধানীর মাতুয়াইলের হাজী আব্দুল লতিফ ভূঁইয়া কলেজের গভর্নিং বডি বা পরিচালনা পর্ষদের বর্তমান সভাপতিকে সরানোর একটি তৎপরতা চলছে।
মহিলা দলের নেত্রী পরিচয় দেওয়া একজনকে সভাপতি করতে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠিও দেন। তবে শিরীন সুলতানা দাবি করছেন, ‘ভুল তথ্য’ পেয়ে এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যথাযথ কারণ ছাড়া নতুন কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয় না।
হাজী আব্দুল লতিফ ভূঁইয়া কলেজটি এমপিওভুক্ত, অর্থাৎ এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতনের একটি অংশ সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হয়।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোতে পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনে। ১১ সদস্যের কমিটিতে সভাপতি ও একজন সদস্য (বিদ্যোৎসাহী) মনোনয়ন দেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। অভিভাবক প্রতিনিধি, শিক্ষক প্রতিনিধ, দাতা প্রতিনিধি, হিতৈষী প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে হয়। অধ্যক্ষ পালন করেন সদস্য সচিবের দায়িত্ব।
অধ্যক্ষ মতিয়ার রহমানের দাবি, সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা ও অন্য বিএনপি নেতাদের চাওয়াতেই তিনি সভাপতি পরিবর্তনের আবেদন পাঠিয়েছেন। নিজের পদের মেয়াদ বাড়লে তিনি খুশি হবেন, তবে না বাড়লেও তাঁর আপত্তি নেই।
হাজী আব্দুল লতিফ ভূঁইয়া কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে এখন দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক জাকির আহমেদ চৌধুরী। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গত বছরের ২৯ মে তাঁকে দুই বছরের জন্য এই দায়িত্ব দেয়। সে হিসাবে তাঁর মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ২৮ মে।
কিন্তু ২০ জুলাই বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে একটি চিঠি দেন। ওই চিঠিতে বর্তমান সভাপতি পরিবর্তন করে স্থানীয় ‘শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক’ শারমিন আক্তার রিতাকে মনোনয়ন দেওয়ার সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে নজরুল ইসলামকে কমিটিতে ‘বিদ্যোৎসাহী’ সদস্য হিসেবে রাখার অনুরোধও করেন।
ভুল তথ্যে, বললেন সংসদ সদস্য
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। তিনি ভেবেছিলেন, বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সে কারণেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কমিটি গঠনের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠান।
তিনি বলেন, ‘যে প্রার্থীর জন্য অনুরোধ করেছিলাম, পরে সেই প্রার্থীর ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে নতুন গভর্নিং বডি মনোনয়নের প্রক্রিয়াটি থামিয়ে দিয়েছি।’
শুধু সংসদ সদস্যই নন, কলেজের অধ্যক্ষ আবু নোমান মো. মতিয়ার রহমানও সম্প্রতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শকের কাছে সভাপতি পরিবর্তনের আবেদন করেন। তবে ওই আবেদনে অভিভাবক প্রতিনিধি, দাতা প্রতিনিধি, প্রতিষ্ঠাতা প্রতিনিধি কিংবা নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিদের কারও স্বাক্ষর ছিল না।
মতিয়ার রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা ও অন্য বিএনপি নেতাদের চাওয়াতেই তিনি আবেদন পাঠিয়েছিলেন।
যে প্রার্থীর জন্য অনুরোধ করেছিলাম, পরে সেই প্রার্থীর ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে নতুন গভর্নিং বডি মনোনয়নের প্রক্রিয়াটি থামিয়ে দিয়েছি
দুই প্রস্তাবে এক নাম
সংসদ সদস্য ও অধ্যক্ষ দুজনের চিঠিতেই শারমিন আক্তার রিতাকে সভাপতি মনোনীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
শারমিন আক্তার নিজেকে ক্ষমতাসীন বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যাত্রাবাড়ী থানা কমিটির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে ছাত্র গণ–অভ্যুত্থানের আগে স্থানীয় আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মোল্লা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি থাকা একটি ঈদের শুভেচ্ছা পোস্টারে তাঁর ছবিও দেখা গেছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানায় করা একটি হত্যা মামলায় ৮৫ নম্বর আসামি হিসেবে তাঁর নাম রয়েছে।
এ নিয়ে প্রথম আলোর জিজ্ঞাসায় শারমিন আক্তার বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে অনেক কিছুই পরিবর্তন হতে পারে।
শারমিন আক্তার বলছেন, কলেজের পরিচালনা পর্ষদে তাঁকে সভাপতি পদে দলীয় নেতারাই চাইছেন। নিজের আগের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে অনেক কিছুই পরিবর্তন হতে পারে।
দলের স্থানীয় নেতারা তাঁকে এই পদে চাইছেন বলে দাবি করেন শারমিন আক্তার।
তাঁকে সভাপতি পদে চাওয়ার পেছনে অধ্যক্ষের কোনো স্বার্থ রয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, অধ্যক্ষের কোনো স্বার্থ থাকলে সেটি তাঁর বিষয়। তাঁরা মনে করেছেন, কলেজের পরিচালনা কমিটি পরিবর্তন করা দরকার। এ কারণে আবেদন করা হয়েছে।
নেপথ্যে অধ্যক্ষ–নেত্রী যোগসাজশের অভিযোগ
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কলেজটির বর্তমান অধ্যক্ষ মতিয়ার রহমানের চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন নাকচ হওয়ার পরপরই শুরু হয় সভাপতি পরিবর্তনের তৎপরতা। আর পদ পেয়ে প্রভাব বাড়ানোর আশায় এই তৎপরতায় যুক্ত হন শারমিন আক্তার।
কলেজের একাধিক শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী ১০ অক্টোবর অধ্যক্ষ আবু নোমান মো. মতিয়ার রহমানের চাকরির মেয়াদ শেষ হবে। মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়াতে তিনি গত ২৭ জুন আবেদন করেছিলেন। কিন্তু কলেজের আর্থিক সক্ষমতা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় কমিটি সেই আবেদন নাকচ করে দেয়।
অধ্যক্ষের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন ও পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তের অনুলিপি এই প্রতিবেদক দেখেছেন।
কলেজ কমিটির বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক জাকির আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, অধ্যক্ষের চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর বিরোধী তিনি ছিলেন না। কিন্তু কমিটির অন্য সদস্যরা কলেজের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় তা অনুমোদন করেননি।
অধ্যক্ষের মেয়াদ না বাড়ানোর কারণে পুরো গভর্নিং বডি পরিবর্তনের উদ্যোগ দুঃখজনক। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যদি মনে করে কলেজের স্বার্থে নতুন কমিটি প্রয়োজন, তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই
বর্তমানে কলেজের আর্থিক অবস্থা নাজুক জানিয়ে তিনি বলেন, এরই মধ্যে কয়েকজন শিক্ষকের বেতনও বকেয়া রয়েছে।
পরিচালনা কমিটির কয়েকজন সদস্যের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্তের পরপরই অধ্যক্ষ নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেন। তিনি ২১ জুলাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে কমিটি পরিবর্তনের আবেদন করেন।
পরিচালনা পর্ষদে দাতা সদস্য আবু তাহের মিয়াজি প্রথম আলোকে বলেন, অধ্যক্ষ চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছিলেন। কিন্তু কলেজের বাস্ত
কলেজের পরিচালনা কমিটি পরিবর্তনের জন্য অধ্যক্ষ বা সংসদ সদস্য আবেদন করতে পারেন। তবে কমিটি পরিবর্তন করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের
বতা বিবেচনায় কমিটি তা অনুমোদন করেনি। এ কারণে অধ্যক্ষ কিছুটা মনঃক্ষুণ্ন হয়ে থাকতে পারেন।
এই দাতা সদস্যের ভাষ্য, বর্তমান সভাপতি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তাঁকে সরিয়ে কোনো রাজনৈতিক নেতাকে সভাপতি করা কলেজের জন্য ভালো হবে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের একজন শিক্ষক বলেন, অধ্যক্ষ নিজের চাকরির মেয়াদ বাড়াতে চান। অন্যদিকে মহিলা দলের পরিচয় দেওয়া ওই নেত্রী কলেজ পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করতে চান। এই স্বার্থেই দুই পক্ষ এখন এক হয়ে পরিচালনা কমিটি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।
এদিকে অধ্যক্ষ মতিয়ার রহমান বলেন, নিজের পদের মেয়াদ বাড়লে তিনি খুশি হবেন, তবে মেয়াদ না বাড়লেও তাঁর আপত্তি নেই।
পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তনে কারও সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
হাজী আব্দুল লতিফ ভূঁইয়া কলেজ এমপিওভুক্ত। কলেজের বর্তমানে পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক জাকির আহমেদ চৌধুরী। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গত বছরের ২৯ মে তাঁকে দুই বছরের জন্য সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন দেয়। সে হিসাবে তাঁর মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ২৮ মে।
সভাপতি জাকির আহমেদ বলেন, ‘অধ্যক্ষের মেয়াদ না বাড়ানোর কারণে পুরো গভর্নিং বডি পরিবর্তনের উদ্যোগ দুঃখজনক। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যদি মনে করে কলেজের স্বার্থে নতুন কমিটি প্রয়োজন, তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কলেজ পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, কলেজ অধ্যক্ষের আবেদন তাঁরা পেয়েছেন। তবে পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যথাযথ কারণ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নতুন কমিটি অনুমোদন করে না।