২০৯ খণ্ডে বাঙালির ২০০ বছরের চিন্তার সংকলন
গত ২০০ বছরের বাঙালি চিন্তকদের নির্বাচিত রচনা নিয়ে প্রায় ৭৫ হাজার পৃষ্ঠার সংকলন ‘বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ’ প্রকাশ করেছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম, শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান, পরিবেশ, চলচ্চিত্র, সংগীত, ভাষা, সংস্কৃতি, নারী, সমাজ ও শিক্ষা—এই ১৬টি বিষয়ে রচনাগুলো সংকলিত হয়েছে। ২০৯ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে এই গ্রন্থমালা। এর প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। ১৬টি বিষয়ে দেশের অভিজ্ঞ ও গবেষকদের সমন্বয়ে গঠিত সম্পাদনা পরিষদ সংকলনটি সম্পাদনা করেছে।
এই সংকলন নিয়ে মঙ্গলবার রাজধানীর ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী বইমেলা ও সেমিনারের অংশ হিসেবে সকাল ১০টায় কলেজের মিলনায়তনে ‘বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ: জাতীয় মনন-সংরক্ষণের একটি চেষ্টা’ শীর্ষক আলোচনা হয়। এতে দেশের ১৬০টি বিদ্যালয়ের দুই শতাধিক মাধ্যমিকের শিক্ষক অংশ নেন। সকাল সাড়ে ৯টায় বইমেলার উদ্বোধন করেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল।
অনুষ্ঠানে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জানান কেন এই সংকলনের জন্য গত ২০০ বছরকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৮০৩ সালে রাজা রামমোহন রায়ের লেখার মধ্য দিয়ে বাংলায় যে নবজাগরণের সূচনা, তা মীর মশাররফ হোসেন ও কাজী নজরুল ইসলামের মতো মনীষীদের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে। উনিশ শতক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাঙালির জীবনে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পাশাপাশি চিন্তার জগতেও ব্যাপক সমৃদ্ধি ঘটেছে।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রনীতি থেকে জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বাঙালি মনীষীরা তাঁদের চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে জাতির মননভান্ডার সমৃদ্ধ করেছেন। বিভিন্ন জাতীয় সংকটের সময়ে এই ভূখণ্ডের শক্তিমান ও সংবেদনশীল মনীষীদের চিন্তা ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁদের রচনায়। ‘বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ’ সেই মনীষীদের নির্বাচিত রচনার সংকলন।
বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষার মর্যাদা ও চিন্তাসম্পদ রক্ষা করার দায়িত্ব এখন বাংলাদেশের, এ কথা উল্লেখ করে অনুষ্ঠানের আলোচক প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক কবি সাজ্জাদ শরিফ বলেন, ‘বাঙালির বিচিত্র চিন্তার সঙ্গে বোঝাপড়ার মাধ্যমে সেই চিন্তার নবায়নের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ বলেন, ডিজিটাল যুগে দ্রুত সামাজিক পরিবর্তন ও বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রভাবে দেশীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জাতিগত সত্তা টিকিয়ে রাখতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বই পড়ার মাধ্যমে নিজেদের শিকড় ও চিন্তাধারা জানার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সেমিনারে ‘বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার: বাঙালির শিক্ষাচিন্তার মূল ও আমূল পরিবর্তন’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শোয়াইব জিবরান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকার অধ্যক্ষ অধ্যাপক খাদেমুল ইসলাম। আলোচনার শুরুতে বক্তব্য দেন ফারজানা ব্রাউনিয়া।
সেমিনারের শেষ পর্যায়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে ‘বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ’-এর পরিচিতি তুলে ধরেন খাদিজা হালিম। তিনি বলেন, এই সংকলন কেবল কিছু বইয়ের সমাহার নয়; এটি বাঙালির বৌদ্ধিক অস্তিত্ব, আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ও গবেষণায় ২০৯ খণ্ডের এই সংকলন ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের শিকড় ও চিন্তার ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে। একই সঙ্গে আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণে মননশীল ভিত্তি তৈরিতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।