সারা দেশে খেলার মাঠের অভাবে আগামী প্রজন্ম বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে তৈরি হতে পারছে না বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা। তাঁরা বলেন, মাঠের দাবিতে সংলাপ বা আলোচনা করে এখন আর কাজ হবে না, আন্দোলনে নামতে হবে।
আজ সোমবার পরিকল্পনা ও উন্নয়ন গবেষণা এবং নীতি বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) আয়োজিত এক ভার্চ্যুয়াল সংলাপে এমন মন্তব্য করা হয়।
‘বাংলাদেশের নগর ও গ্রামীণ এলাকায় খেলার মাঠের সংকট ও করণীয়’ শীর্ষক সংলাপে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম বলেন, শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভালো করার জন্য নয়, সুস্থ-সবল জাতি গঠনের জন্যও খেলাধুলার প্রয়োজন। কিন্তু ঘরের বাইরে খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধা খুবই কম। নারীদের মাঠ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও প্রকট। হাতে গোনা যেসব মাঠ আছে, তার মাত্র ৭ থেকে ৯ শতাংশ ব্যবহার করতে পারেন নারীরা। এমন বাস্তবতায় মাঠের জন্য চিন্তাভাবনা-সংলাপ বাদ দিয়ে আন্দোলন করার সময় এসেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আইপিডির উপদেষ্টা আকতার মাহমুদ বলেন, মাঠ-পার্ক, গণপরিসর সংকুচিত হয়ে আসছে। ব্যাপকভাবে আন্দোলন না করতে পারলে মাঠ-পার্কের উন্নয়ন হবে না, সবার জন্য উন্মুক্ত হবে না। তিনি বলেন, মাঠ সামাজিকীকরণের এক অন্যতম জায়গা, মাঠে খেলাধুলার মাধ্যমে উদার মানসিকতার তৈরি হয়। মাঠ না থাকার কারণে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ছে বলে তিনি মত দেন।
খেলাধুলাসংক্রান্ত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ভালো না করার পেছনে মাঠ না থাকাকে দায়ী করেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক ক্রিকেটার জাভেদ ওমর বেলিম। তিনি বলেন, ‘মাঠ না থাকার কারণে খেলাধুলার সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে না। আমাদের বেসিক ভালো নয়, পরে আমরা শিখি। এ জন্যই বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশ ভালো করতে পারে না।’
সংলাপে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন আইপিডির নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, মাঠকে নগর-পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মাঠ না থাকলে দেশ হয়তো আর্থিকভাবে উন্নত হবে, কিন্তু সুস্থ–সবল জাতি গঠিত হবে না। দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাঠের সংকট সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অন্তত ২০ শতাংশের নিজস্ব কোনো খেলার মাঠ নেই। বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা শহরে ৭৯৫টি, চট্টগ্রামে ৫৪১টি, রাজশাহীতে ৩৭টি, খুলনায় ৬৬টি, সিলেটে ৩২টি এবং বরিশালে ৩৪টি মাঠের ঘাটতি আছে।
ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পাল বলেন, ‘রাজধানীর তেঁতুলতলা মাঠ, যেখানে ৫০ বছর ধরে খেলাধুলা চলছে, সেখানে থানা নির্মাণের উদ্যোগ থেকেই বোঝা যায় মাঠ নিয়ে আমাদের মানসিকতা কেমন। ইট-পাথরের সংস্কৃতি শুধু ঢাকা শহরকে নয়, অন্য শহরগুলোকেও গ্রাস করছে। ফলে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আগামী প্রজন্মের যে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ দরকার, সেটি আমরা করতে পারছি না।’
আইপিডির পরিচালক আরিফুল ইসলাম বলেন, খেলার মাঠের অভাবে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত একটি জাতি তৈরি হচ্ছে। মাঠ ছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফরহাদুর রেজা, ময়মনসিংহ ক্রিকেট একাডেমির সভাপতি আরিফ চৌধুরী, বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড় আফিদা খন্দকার প্রমুখ।