ছুটির মাঝে ঐতিহ্যের টানে কেল্লার পানে
মোগল স্থাপত্যের সৌন্দর্য, অসমাপ্ত নির্মাণের রহস্য আর প্রায় ৪০০ বছরের ইতিহাস—এই তিনের মেলবন্ধন আজও মানুষকে আকর্ষণ করে ঢাকার লালবাগ কেল্লার দিকে। ঈদের ছুটিতে সেই আকর্ষণ যেন আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। রাজধানীর এই ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিণত হয় এক প্রাণচঞ্চল মিলনমেলায়, যেখানে ইতিহাস আর উৎসব একসঙ্গে মিশে যায়।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের দুই দিন পর আজ সোমবার দুপুর থেকে রাজধানীর পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লা মুখর হয় দর্শনার্থীদের পদচারণে। কেউ রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে, কেউ এসেছেন পাশের নানা জেলা থেকে। বেলা গড়িয়ে যখন বিকেল, তখন সেই ভিড় কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
আজ বেলা দেড়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পেরেছিলেন লালবাগ কেল্লায়। ছোট–বড় নানা বয়সী এসব দর্শনার্থীর ভিড়ে লালবাগের আশপাশের রাস্তাগুলোতেও তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।
কেল্লার ভেতরে ঢুকেই দর্শনার্থীদের ভিড় জমে পরী বিবির মাজারে। মার্বেল পাথরের নকশা আর নিস্তব্ধ পরিবেশ অনেককেই থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। কেউ ছবি তুলছিলেন, কেউ মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েন স্থাপত্যের সূক্ষ্ম সৌন্দর্যে।
এরপরই অনেকে ছোটেন লালবাগ মসজিদের দিকে। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন দর্শনার্থীরা।
দেওয়ান-ই-আম বা দরবার হলও দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্র। এখানে সংরক্ষিত পুরোনো নিদর্শন, ব্যবহার্য সামগ্রী দেখে অনেকে মুগ্ধ হন। ইতিহাসের পাতা যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে তাঁদের সামনে।
কেল্লার বাগান ও খোলা প্রাঙ্গণও ছিল মুখর। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকে বসে পড়েন সবুজ ঘাসে, কেউ হাঁটেন, আবার কেউ ব্যস্ত হয়ে ওঠেন স্মৃতি বন্দী করতে।
গাজীপুর থেকে আসা আরিফুল ইসলাম স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ঘুরছিলেন কেল্লার ভেতর। পরী বিবির মাজারের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে এমন ঐতিহাসিক জায়গায় আসতে ভালো লাগে। এখানে এসে মনে হয় আমরা ইতিহাসের খুব কাছে চলে এসেছি।’
আরিফুল ইসলামের স্ত্রী ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, ‘লালবাগ কেল্লার স্থাপত্য সত্যিই অসাধারণ। এত পুরোনো হয়েও এত সুন্দরভাবে টিকে আছে—এটাই সবচেয়ে আকর্ষণীয়।’
সাভার থেকে আসা সোহেল রানা বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে এসে বলেন, ‘এই কেল্লার অসমাপ্ত ইতিহাসটাই সবচেয়ে বেশি টানে। মনে হয় এর ভেতরে অনেক গল্প লুকিয়ে আছে।’
পরিবারের সঙ্গে আসা রিমা আক্তার বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসে ভালো লাগছে। এখানে ইতিহাস, সৌন্দর্য—সব একসঙ্গে পাওয়া যায়।’
কেল্লার এক কোণে দাঁড়িয়ে দেয়ালের নকশা দেখছিল দুই শিশু—নাইম ও সুমাইয়া। নাইম কৌতূহল নিয়ে বলে, ‘কেল্লা অনেক বড়। কীভাবে বানাল এটা?’ সুমাইয়া হাসতে হাসতে বলে, ‘আমি এখানে অনেক ছবি তুলেছি, সবাইকে দেখাব!’ শিশুদের এই বিস্ময়ই যেন প্রমাণ করে—লালবাগ কেল্লা শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি শেখারও এক অনন্য ক্ষেত্র।
তবে ভিড়ের চাপে কিছুটা বিশৃঙ্খলাও চোখে পড়ে। অনেক দর্শনার্থী নিয়ম না মেনে বাগানের ফুলে হাত দিচ্ছিলেন। তখন নিরাপত্তাকর্মীদের তৎপর হয়ে উঠতে হচ্ছিল।
আজ দুপুরে কেল্লায় ফটক খোলা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেক দর্শনার্থী। তাঁরা দুপুরের আগেই কেল্লার সামনে এসে ভিড় করেছিলেন। তবে ঢুকতে পারেননি।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে পরিবার নিয়ে আসা রেজাউল করিম বলেন, ‘গতকালও এসেছিলাম। বিকেল পাঁচটা বেজে যাওয়ায় প্রবেশ করতে পারিনি। আজ আবার এলাম, এখন জানতে পারলাম দুপুরে খুলবে। ঈদের সময়টা আরেকটু বেশি সময় দুর্গে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল।’