রং-তুলিতে পিতা-কন্যার যুগলবন্দী

প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী হাশেম খান (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) ও শিল্পী আফজাল হোসেনের (ডান থেকে দ্বিতীয়) সঙ্গে বাবা নোমান ও মেয়ে ইজমা। আলোকি কনভেনশন সেন্টার, ঢাকা; ৯ জানুয়ারি ২০২৬ছবি: মীর হোসেন

রং-তুলিতে পিতা-কন্যার এক ব্যতিক্রমী যুগলবন্দী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী শুরু হলো আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁর আলোকি কনভেনশন সেন্টারে। ‘ব্রাশস্ট্রোকস-অ্যাক্রস জেনারেশন’ নামের তিন দিনের এই প্রদর্শনীতে পিতা নোমান ও তাঁর কন্যা ইজমার মোট ২৬টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে।

নোমান শিল্পকলার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি। তিনি পেশাগতভাবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পদস্থ কর্মকর্তা। পাশাপাশি শৌখিন আলোকচিত্রী। চারুকলার প্রতিও তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। ২০১৮ সাল থেকে শুরু করেছেন ছবি আঁকা। তাঁর আঁকা ছবি প্রথম প্রদর্শিত হয়েছিল ভারতের মুম্বাইয়ের নেহেরু সেন্টার আর্ট গ্যালারির এক যৌথ শিল্পকলা প্রদর্শনীতে।

ঢাকায় এই প্রদর্শনীতে নোমানের মোট ১৬টি চিত্রকর্ম রয়েছে। তিনি মূলত নগরজীবন ও শহুরে দৃশ্যপট আঁকতে পছন্দ করেন। তাঁর কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৪টি বিভিন্ন দেশের শহরের চিত্র। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতীরের পুরান ঢাকা, ভারতের জয়পুর, তিব্বতের পাহাড়ি জনপদ, হংকংয়ের আকাশছোঁয়া ভবনের সারিসহ পর্তুগাল, ইতালি, মেক্সিকো, মরক্কো প্রভৃতি শহরের দৃশ্যপট, ঘরবাড়ি, সড়ক, নদী পাহাড়ি প্রকৃতি তিনি সুনিপুণ দক্ষতায় বাস্তব চিত্রকলার রীতিতে ক্যানভাসে তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া তাঁর প্রথম দিকের আঁকা মৃৎপাত্র ও তিন রমণীর প্রকৃতির দুটি ভিন্ন ধাঁচের কাজও আছে প্রদর্শনীতে।

বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী হাশেম খানকে নিজেদের শিল্পকর্ম দেখাচ্ছেন বাবা নোমান ও মেয়ে ইজমা। আলোকি কনভেনশন সেন্টার, ঢাকা; ৯ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: মীর হোসেন

অন্যদিকে কন্যা ইজমা হলেন ‘ইলাস্ট্রেটর ও ডিজাইনার’। তিনি ঢাকা ও নিউইয়র্কে থেকে কাজ করেন। ইজমা সাভানাহ কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ডিজাইন (এসসিএডি) থেকে ইলাস্ট্রেশন/পাবলিকেশন ডিজাইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি (ব্যাচেলর অব ফাইন আর্টস) অর্জন করেছেন। এখন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিটিমাস ম্যাগাজিনের সঙ্গে কাজ করছেন। এর আগে ইজমা বাংলাদেশে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি–ইউএনডিপিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য অলংকরণের কাজ করেছেন। বাবার সঙ্গে এটি তাঁর প্রথম শিল্পকর্ম প্রদর্শনী।

এই প্রর্শনীর ইজমার শিল্পকর্মগুলো তাঁর কাছের মানুষজনদের নিয়ে। এই মানুষেরা তাঁকে ছেড়ে, পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন। তাঁদের স্মৃতি, আবেগ, বিষণ্নতা মিশে আছে ইজমার কাজে। বেশ ব্যতিক্রমী উপস্থাপনা। তাঁদের অবয়ব আছে কিন্তু মুখের অংশটি ঝাপসা। সেখানে চোখ, নাখ, মুখ কিছু নেই। তাঁদের অবয়বের পাশেই তাঁদের ব্যবহৃত জিনিস এসেছে ক্যানভাসে। এসব ছবির নামও রাখা হয়েছে সেই সব কাছের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে। যেমন ‘দাদু’, ‘চাচি’, ‘বড় নানু’, ‘ইকরাম স্যার’ ইত্যাদি। এ ছাড়া আছে পদ্মফুলের ছবি, তাঁর নিজের ঘরের দৃশ্য। ইজমার ১০টি কাজের মধ্যে ৬ টি ক্যানভাসে আর ৪ টি স্বচ্ছ কাচের ফলকে অ্যাক্রিলিকে আঁকা।

প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনীর শুরুতেই পিতা–কন্যার কাজ নিয়ে ডিজিটাল স্ক্রিনে একটি ভিডিও চিত্র দেখানো হয়। পরে দেখানো হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইজমার করা কাজের আরেকটি ভিডিও চিত্র।

শিল্পীদের সঙ্গে শিল্পকর্ম দেখছেন আগত অতিথি ও দর্শকেরা। আলোকি কনভেনশন সেন্টার, ঢাকা; ৯ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: মীর হোসেন

পিতা ও কন্যাকে শুভেচ্ছা জানান বাংলাদেশে পর্তুগালের ‘অনারারি কনসাল’ শাখাওয়াত হোসেন। বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী হাশেম খান বলেন, শিল্পকলাচর্চার জন্য চারুকলা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করা অনিবার্য শর্ত নয়। কে, কোথায়, কীভাবে শিখবে, তা চারুকলার পাঠ্যক্রমে সীমাবদ্ধ নেই। এই প্রদর্শনীতে পিতা–কন্যার কাজ দেখে তিনি একই সঙ্গে আনন্দিত ও বিস্মিত হয়েছেন।

হাশেম খান বলেন, নোমান তাঁর কাজে মানুষ ও শহরের সম্পর্কের বিষয়টি নিজের উপলব্ধির ভেতর থেকে তুলে ধরেছেন। দেখেই বোঝা যায়, এ ধরনের নিখুঁত একেকটি কাজের জন্য লম্বা সময়ের প্রয়োজন। আর ইজমা তাঁর কাজে নতুন ধরনের রীতির প্রয়োগ করেছেন। বাবা ও মেয়ের কাজের বিষয় ও ধরন আপাতদৃষ্টে আলাদা হলেও একরকম গভীর অন্তমিলও রয়েছে। মানুষ ও মানবিক অনুভূতির বিষয়গুলো এসেছে তাঁদের কাজে।

শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন শিল্পী আফজাল হোসেন ও শিল্পীদের সুহৃদ দেবেশ মাথুর। নোমান তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানান, পেশাগত কাজের ফাঁকে তিনি ছবিগুলো আঁকেন। একটি ছবি শেষ করতে প্রায় ছয় মাস সময় লেগে যায়। ইজমা তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বাবার সঙ্গে যৌথভাবে প্রথম শিল্পকর্ম প্রদর্শনী করতে পেরে তিনি আনন্দিত।

আলোকিতে তিন দিনের এই প্রদর্শনী চলবে ১১ জানুয়ারি রোববার পর্যন্ত। দর্শকদের জন্য প্রতিদিন বেলা ১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রদর্শনী খোলা থাকবে।