অর্থসংকটে ডিএসসিসি, কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন–বোনাস হয়েছে ঋণের টাকায়
অন্য বছরের তুলনায় এ বছর রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সিটি করপোরেশন অর্থসংকটে পড়েছে।
রাজধানীর নাগরিক সেবার দায়িত্বে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গত মাসে সংস্থাটিকে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন ও বোনাস দিতে ঋণ করতে হয়েছে। আগামী মাসে নিজস্ব আয় থেকে বেতন দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগে আছেন সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তারা।
সংস্থাটির প্রশাসক ও বিএনপি নেতা আবদুস সালাম ইতিমধ্যে এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চেয়েছেন। ৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, গত কয়েক মাসে প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব আদায় হয়নি। অন্য বছরের তুলনায় এ বছর রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সিটি করপোরেশন অর্থসংকটে পড়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের পর গত প্রায় দেড় বছরে সংস্থাটির রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এই সময়ের মধ্যে মাত্র দুই মাসে শত কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে।
আবদুস সালাম বলেন, বিগত প্রশাসনের সময় যেভাবে ঢালাওভাবে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলে সিটি করপোরেশন কার্যত ধসে পড়বে। কোনোভাবেই তা সম্ভব নয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের পর গত প্রায় দেড় বছরে সংস্থাটির রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এই সময়ের মধ্যে মাত্র দুই মাসে শত কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে, অর্থাৎ নির্বাচনের মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ৪২ কোটি টাকা। অথচ কয়েক বছর আগেও নিয়মিতভাবে মাসে ৭০ থেকে ১০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হতো বলে কর্মকর্তারা জানান।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় হয় ২০২৩–২৪ অর্থবছরে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগের ওই বছরে সংস্থাটি ১ হাজার ৬১ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজস্ব আদায় না বাড়ায় ওই সময় জমা থাকা অর্থ থেকেই গত ১৮ মাস ধরে ব্যয় মেটাতে হয়েছে। ফলে তহবিলে চাপ বাড়তে থাকে।
গত দেড় বছর উন্নয়নকাজের বিল পরিশোধ নিয়েই বেশি তোড়জোড় হওয়ায় আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, যা এখন সিটি করপোরেশনের সেবা কার্যক্রমকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।আদিল মুহাম্মদ খান, নির্বাহী পরিচালক, আইপিডি
অর্থসংকটের পেছনে কারণ
সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের পর তড়িঘড়ি করে বিপুল পরিমাণ উন্নয়নকাজের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ও শেখ ফজলে নূর তাপসের সময় নানা অসংগতির অভিযোগে যেসব বিল আটকে রাখা হয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই পরে ঠিকাদারদের পরিশোধ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের কিছু কর্মকর্তা কমিশন বাণিজ্যের বিনিময়ে করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে এসব টাকা ঠিকাদারদের দিতে সহযোগিতা করেছেন।
সংস্থাটির হিসাব শাখার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেক ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করে বিল তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এমনকি ‘মব’ তৈরির অভিযোগও রয়েছে। তিনি বলেন, প্রকৌশল বিভাগের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে দ্রুত বিল আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ তহবিল থেকে বেরিয়ে গেছে।
শুধু করপোরেশনের টাকাই শেষ করা হয়নি, পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় কিছু কাজের কার্যাদেশ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। নানা কারণে আটকে থাকা বিলগুলো তড়িগড়ি করে দেওয়ার ক্ষেত্রে করপোরেশনের কারও যোগসাজশ রয়েছে কি না, সেগুলো তদন্ত করে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।আবদুস সালাম, ডিএসসিসির প্রশাসক
ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ মাসে উন্নয়নকাজের বিল হিসেবে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এর সবটাই দেওয়া হয়েছে সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে। তবে মাঠপর্যায়ে অনেক প্রকল্পে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলেও বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি ইতিমধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব কাজ বাস্তবায়ন হলেও ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করার মতো আর্থিক সক্ষমতা বর্তমানে সিটি করপোরেশনের নেই বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সংস্থাটির প্রশাসক আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, শুধু করপোরেশনের টাকাই শেষ করা হয়নি, পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় কিছু কাজের কার্যাদেশ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। নানা কারণে আটকে থাকা বিলগুলো তড়িগড়ি করে দেওয়ার ক্ষেত্রে করপোরেশনের কারও যোগসাজশ রয়েছে কি না, সেগুলো তদন্ত করে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।
সিটি করপোরেশনের কাছে আরও কিছু তহবিলে অর্থ রয়েছে। যেমন জামানত তহবিলের এফডিআর, অগ্রিম বাজার সালামি, রাস্তা খনন তহবিলের এফডিআরসহ কয়েকটি খাতে মোট প্রায় ৮৬৯ কোটি টাকা রয়েছে। তবে এসব অর্থ নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত থাকায় তা থেকে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন বা সাধারণ খরচ মেটানোর সুযোগ নেই। এ কারণে আগামী মাসের বেতন–ভাতা কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বেতন দিতেই দুশ্চিন্তা
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন–ভাতা এবং পরিচালন ব্যয় মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে সাধারণ তহবিলে আছে মাত্র ১৬ কোটি টাকা।
অবশ্য সিটি করপোরেশনের কাছে আরও কিছু তহবিলে অর্থ রয়েছে। যেমন জামানত তহবিলের এফডিআর, অগ্রিম বাজার সালামি, রাস্তা খনন তহবিলের এফডিআরসহ কয়েকটি খাতে মোট প্রায় ৮৬৯ কোটি টাকা রয়েছে। তবে এসব অর্থ নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত থাকায় তা থেকে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন বা সাধারণ খরচ মেটানোর সুযোগ নেই। এ কারণে আগামী মাসের বেতন–ভাতা কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০২৫–২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এক হাজার ৩২০ কোটি টাকা। গত ৮ মাসে সংস্থাটির আয় হয়েছে ৬২৫ কোটি টাকা। একই সময় পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৪১৮ কোটি টাকা। আর উন্নয়নকাজে ব্যয় হয়েছে ৫২০ কোটি টাকা।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় কমে গেলে তার প্রভাব সরাসরি নাগরিক সেবায় পড়ে।
রাজস্বের প্রধান উৎস
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সবচেয়ে বড় তিনটি রাজস্ব উৎস হলো—হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স ফি এবং বাজার ও সম্পত্তি ইজারা। এর বাইরে বিজ্ঞাপন ও সাইনবোর্ড ইজারা, পার্কিং ইজারা, জন্ম–মৃত্যুনিবন্ধন ফি এবং বিভিন্ন ধরনের সনদ ফি থেকেও রাজস্ব আদায় করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এসব খাত থেকেও প্রত্যাশিত রাজস্ব আসছে না বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় কমে গেলে তার প্রভাব সরাসরি নাগরিক সেবায় পড়ে। তাঁদের মতে, নগরের দৈনন্দিন সেবাগুলোর বড় অংশই সিটি করপোরেশনের নিজস্ব রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল। ফলে রাজস্ব কমে গেলে মশকনিধন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রাস্তা ও ড্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ, স্ট্রিটলাইট পরিচালনাসহ মৌলিক সেবাগুলো ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, রাজস্ব সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা দিতে পারে। অনেক সময় চলমান প্রকল্পের কাজ থেমে যায় কিংবা নতুন প্রকল্প নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন–ভাতা পরিশোধ, নগর অবকাঠামোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নাগরিক সেবা সম্প্রসারণেও চাপ তৈরি হয়।
জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান অর্থসংকট শুধু রাজস্ব ঘাটতির ফল নয়; এর পেছনে প্রশাসনিক অদক্ষতা ও অস্বচ্ছ ব্যয় ব্যবস্থাপনাও বড় কারণ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বহু বছরের পুরোনো বকেয়া বিল, যার কিছু অনিয়ম বা ভুলের কারণে আটকে ছিল—সেগুলো কমিশন–বাণিজ্যের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অল্প সময়ে বিপুল অর্থ বেরিয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, গত দেড় বছর উন্নয়নকাজের বিল পরিশোধ নিয়েই বেশি তোড়জোড় হওয়ায় আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, যা এখন সিটি করপোরেশনের সেবা কার্যক্রমকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।