কোথাও ১০ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা, হেলপারের ডাক, ‘আজকে কিন্তু ভাড়া বেশি’

বাসে ওঠার জন্য যাত্রীদের ঠেলাঠেলি। কোনোভাবে উঠতে পারলে ভাড়া নিয়ে আদায়কারীর সঙ্গে যাত্রীদের বচসা হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে সরকারিভাবে নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশের আগেই ঢাকা মহানগরের কোনো কোনো বাসে পাঁচ টাকা বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। সর্বনিম্ন ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন রুট ঘুরে দেখা গেছে, বাসে ওঠার সময়ই যাত্রীদের সতর্ক করে চালকের সহকারী (হেলপার) বলছেন, ‘আজকে কিন্তু ভাড়া বেশি।’

বাড়তি ভাড়া দিতে রাজি না হওয়ায় কোথাও কোথাও যাত্রীদের সঙ্গে তাঁদের কথা–কাটাকাটিও হচ্ছে। নতুন ভাড়ার তালিকা না থাকায় কত ভাড়া দিতে হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। আবার বাড়তি ভাড়া গুনতে গিয়ে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন অনেক যাত্রী।

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শনির আখড়া, আসাদগেট, ফার্মগেট ও বাংলামোটর এলাকায় বিভিন্ন বাসে যাতায়াত করে এবং যাত্রী ও পরিবহনকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

১০ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা

বেলা পৌনে ১১টার দিকে শনির আখড়া বাস স্টপেজে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড, ভুলতা ও মাতুয়াইল থেকে আসা অন্তত সাতটি বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বাসগুলো গুলিস্তান পর্যন্ত চলাচল করে। এসব বাসের চালকেরা জানান, আগে এসব বাস ডিজেল–চালিত ছিল, তেলের দাম বাড়ার পর বেশ কিছুদিন আগে গ্যাসে রূপান্তর করা হয়েছে। তাই তাঁরা আগের ভাড়াই নিচ্ছেন।

তবে সাইনবোর্ড থেকে সাভার রুটে চলাচলকারী লাব্বাইক পরিবহনে গতকাল সোমবার রাত থেকে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাসচালকের সহকারী। বাসের যাত্রীরা জানিয়েছেন, প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। সাইনবোর্ড থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা রুটের অনাবিল পরিবহনেও একই হারে ভাড়া বেড়েছে। তবে ভুলতা থেকে গুলিস্তান রুটের মেঘলা পরিবহনে ভাড়া বাড়েনি।

বেলা ১১টার দিকে শনির আখড়ায় আসে চাষাড়া থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা রুটে চলাচলকারী মৌমিতা পরিবহনের একটি বাস। যাত্রী তোলার সময়ই বাসটির সহকারী সাদ্দাম হোসেন বলে দেন, ‘আজকে কিন্তু ভাড়া বেশি।’ বাসে উঠে দেখা যায়, বাড়তি ভাড়া নিয়ে এক যাত্রী ও শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া দেওয়া নিয়ে অন্য দুই যাত্রীর সঙ্গে সাদ্দাম হোসেনের বাগ্‌বিতণ্ডা হচ্ছে। ভাড়ার নতুন তালিকা প্রকাশ না হলেও কেন বাড়তি টাকা নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তোলেন যাত্রীরা।

সাদ্দাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরকার কিছু না জানিয়েই হুট করে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই আজ সকাল থেকে যাত্রীদের তেলের দাম বাড়ার কথা জানিয়ে প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা বেশি নিচ্ছেন তাঁরা। তবে সব যাত্রীর কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করতে পারছেন না।

এই বাসে শনির আখড়া থেকে চানখাঁরপুল ও নীলক্ষেতের ভাড়া ছিল যথাক্রমে ২০ টাকা ও ২৫ টাকা। আজ ভাড়া নেওয়া হচ্ছিল যথাক্রমে ২৫ ও ৩০ টাকা। আগে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এই দুটি স্থানের ভাড়া নেওয়া হতো ১০ টাকা। আজ ১৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া আসাদগেট থেকে ফার্মগেট ও ফার্মগেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত আগে ১০ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও আজ ১৫ টাকা নিতে দেখা গেছে।

‘গোনা টাকায় চলি, বাড়তি টাকা কোথায়’

মৌমিতা পরিবহনের সেই বাসে পথ এগোতে থাকল। পথে এলিফ্যান্ট রোড থেকে মিরপুর মাজার রোডে যাওয়ার উদ্দেশে বাসটিতে উঠেন বেসরকারি চাকরিজীবী কে এম আল আমিন। আসাদগেট এলাকায় বাসের ভেতরে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও অতিরিক্ত ভাড়া দেওয়া জনগণের জন্য বাড়তি ভোগান্তি উল্লেখ করে আল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, তেলের দাম বাড়বে, সেটি সরকার আগে থেকে জানিয়ে দিলে ভালো হতো। হুট করে তেলের দাম বাড়ানোয় বাসের প্রতি স্টপেজে বাড়তি পাঁচ টাকা নিচ্ছে। বাসা থেকে ২০ টাকা ভাড়া দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বের হলেও বাসে উঠে ২৫ টাকা দিতে হচ্ছে। এটা জনগণের জন্য দুর্ভোগ তৈরি করেছে।

আসাদগেট থেকে ফার্মগেট যাওয়ার জন্য এই প্রতিবেদক ওঠেন গাবতলী সার্ভিস (প্রা.) লিমিটেডের একটি বাসে। আগে এই পথে ভাড়া ছিল ১০ টাকা, আজ নেওয়া হয় ১৫ টাকা। ফার্মগেট থেকে বিহঙ্গ পরিবহনের বাসে শাহবাগ যাওয়ার পথেও একই চিত্র দেখা যায়।

বিহঙ্গ পরিবহনের ওই বাসে ফার্মগেট থেকে গুলিস্তান যাচ্ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মনির হোসেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘খালি ভোগান্তিই নয় ভাই, আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। আমাদের জন্য কষ্ট। আমরা তো গোনা টাকায় চলি। বাড়তি কোনো টাকা নেই। এক্সট্রা ইনকাম নেই। যে টাকা পাই, সে টাকা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হয়। নতুন করে গাড়িভাড়া যদি বৃদ্ধি হয়, সেটা আমাদের জন্য জুলুম।’

তবে নতুন ভাড়া নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত বাড়তি টাকা দিতে চান না অনেকে। বিহঙ্গ পরিবহনের বাসটিতে থাকা ঠিকাদার আমিনুল ইসলাম রানা বলেন, ‘আমি এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া দিইনি, দেবও না। যতক্ষণ তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে রেট নির্ধারণ করবে না, ততক্ষণ তাদের অতিরিক্ত ভাড়া দেব না।’

কেউ আছেন নির্দেশনার অপেক্ষায়

বেলা একটার দিকে ফার্মগেট এলাকায় বিভিন্ন বাসের চালকের সহকারী ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে ভাড়া আদায়ে ভিন্নতা দেখা যায়। কেউ বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন, কেউ নিচ্ছেন না। যাঁরা নিচ্ছেন না, তাঁরা নতুন ভাড়ার তালিকার অপেক্ষায় আছেন বলে জানিয়েছেন। আবার কেউ বাড়তি ভাড়া চাইলেও যাত্রীরা তা দিতে চাইছেন না।

আবদুল্লাহপুর থেকে ফুলবাড়িয়া রুটে চলাচলকারী এয়ারপোর্ট–বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ পরিবহনের চালকের সহকারী রুবেল হোসেন বলেন, ‘দাম বাড়ানো হয় নাই। কিন্তু আমাদের তেলের যে অবস্থা, তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। যাত্রীদের থেকে চাই (অতিরিক্ত ভাড়া), কিন্তু যাত্রীরা ঠিকমতো দেয় না।’

ওয়েলকাম পরিবহন চলাচল করে সাভার থেকে মতিঝিল রুটে। বাসচালকের সহকারী সজীব মিয়া জানান, গতকাল রাত থেকে তাঁরা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। তবে একই পরিবহনের আরেক বাসের সহকারী মতিন মিয়া উল্টো তথ্য দিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে জানান, নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ হলে তাঁরা বাড়তি ভাড়া নেবেন।

শিকড় ও বিকল্প পরিবহনের সহকারীরা জানান, তাঁরা এখনো আগের ভাড়াই নিচ্ছেন। শনির আখড়া ও ফার্মগেট এলাকায় দুটি বিআরটিসি বাসের সহকারীরাও আগের ভাড়া নেওয়ার কথা জানান। যাত্রীরাও বলেন, এসব বাসে তাঁদের বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে না।

পুরোনো বাস, নতুন ভাড়ার চাপ

ঢাকায় চলা বেশির ভাগ বাস–মিনিবাস বাইরে থেকে দেখতে রংচটা ও লক্কড়ঝক্কড়। বেশির ভাগ বাসের পেছনের লাইট–ইন্ডিকেটর নেই। ডানে–বাঁয়ে বা পেছনে দেখার আয়না নেই। ভেতরে আসনও তেল চিটচিটে। দাঁড়িয়ে গাদাগাদি করে যেতে হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলতে দেওয়া হবে না। এরপর তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার পেরিয়ে এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। কিন্তু রাজধানীর বেশির ভাগ বাসেরই চেহারা বদলায়নি।

পুরোনো লক্কড়ঝক্কড় এসব বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি ভাড়ার চাপ। সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করেই পরিবহনকর্মীদের অনেকেই নিজেদের মতো ভাড়া নিচ্ছেন। আর সেই বাড়তি টাকার বোঝা বইতে হচ্ছে যাত্রীদের।