মানুষের শরীরের ঘ্রাণ ছড়িয়ে মশাকে আকৃষ্ট করার ফাঁদ বসাচ্ছে ডিএনসিসি

কীটনাশক ছাড়াই এডিসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মশা ধরতে বিজি সেন্টিনেল ট্র্যাপ নামের এমন আধুনিক ফাঁদ বসাতে যাচ্ছে ডিএনসিসিছবি: ডিএনসিসির সৌজন্যে

মানুষের শরীরের ঘ্রাণের মতো কৃত্রিম সুগন্ধ ছড়িয়ে মশাকে ডেকে আনবে ফাঁদ। আকৃষ্ট হয়ে কাছে এলেই শক্তিশালী পাখার টানে জালের ভেতর মশা আটকা পড়বে। কীটনাশক ছাড়াই এডিসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মশা ধরতে এমন আধুনিক ফাঁদ বসাতে যাচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।

প্রাথমিকভাবে ডেঙ্গু রোগী বেশি ভর্তি হয়—এমন ১০টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বসানো হবে ‘বিজি সেন্টিনেল ট্র্যাপ’ নামের এই মশার ফাঁদ।

আগামী সপ্তাহ থেকে নির্ধারিত হাসপাতালগুলোয় ফাঁদ বসানোর কাজ শুরু হওয়ার কথা। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কাছ থেকে এসব ফাঁদ সংগ্রহ করেছে ডিএনসিসি। কারিগরি সহযোগিতা থাকায় এসব ফাঁদ সংগ্রহ ও বসাতে সংস্থাটির কোনো অর্থ ব্যয় হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ফাঁদটিতে থাকা ‘বিজি–লিওর’ নামের বিশেষ কৃত্রিম সুগন্ধি মানুষের ত্বকের প্রাকৃতিক গন্ধের অনুকরণ করে। এতে ল্যাকটিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া ও বিভিন্ন ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিডের মতো উপাদানের গন্ধ ছড়িয়ে মশাকে আকৃষ্ট করা হয়।

মশা নিয়ন্ত্রণে এর আগে নানা ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করেছে ডিএনসিসি। উড়ন্ত বা পরিপক্ব মশা মারতে ধোঁয়ার সঙ্গে কীটনাশক ছড়িয়ে ফগিং করা হয়। লার্ভা ধ্বংসে জমে থাকা পানিতে ব্যবহার করা হয় ট্যাবলেট ও ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক লার্ভিসাইড। মশা মারার ‘কামান’ হিসেবে পরিচিত উচ্চক্ষমতার হুইলব্যারো যন্ত্রও কিনেছে সংস্থাটি। মশার ঘনত্ব পরীক্ষা ও উপস্থিতি পর্যবেক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছে গ্র্যাভিড ট্র্যাপ। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে বিজি সেন্টিনেল ট্র্যাপ।

তবে এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার। তাঁর ভাষ্য, বিজি সেন্টিনেল ট্র্যাপ মূলত মশা নিধনের যন্ত্র নয়; এটি মশার উপস্থিতি, ঘনত্ব ও বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণের একটি বৈজ্ঞানিক উপকরণ। ফাঁদে কিছু মশা আটকা পড়লেও ব্যাপকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা সীমিত।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কাছ থেকে এসব ফাঁদ সংগ্রহ করেছে ডিএনসিসি
ছবি: ডিএনসিসির সৌজন্যে

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মশাকে বন্ধ্যা ও প্রজনন ক্ষমতাহীন করার কৌশল নিয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সঙ্গে ডিএনসিসির গবেষণা ও কারিগরি সহযোগিতা চলছে। এর আওতায় ‘বিজি সেন্টিনেল ট্র্যাপ’ আনা হয়েছে। হাসপাতাল এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে এসব ফাঁদ বসানো হচ্ছে।

মশাকে বন্ধ্যা ও প্রজনন ক্ষমতাহীন করার কৌশল নিয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সঙ্গে ডিএনসিসির গবেষণা ও কারিগরি সহযোগিতা চলছে। এর আওতায় ‘বিজি সেন্টিনেল ট্র্যাপ’ আনা হয়েছে। হাসপাতাল এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে এসব ফাঁদ বসানো হচ্ছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ডিএনসিসি

মানুষের গন্ধে ফাঁদের দিকে মশা

ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিজি সেন্টিনেল ট্র্যাপ কোনো ক্ষতিকারক কীটনাশক ব্যবহার ছাড়াই প্রধানত এডিস ও কিউলেক্স মশা সংগ্রহ এবং তাদের উপস্থিতি ও ঘনত্ব পর্যবেক্ষণের আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। ফাঁদটিতে থাকা ‘বিজি–লিওর’ নামের বিশেষ কৃত্রিম সুগন্ধি মানুষের ত্বকের প্রাকৃতিক ঘ্রাণের অনুকরণ করে। এতে ল্যাকটিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া ও বিভিন্ন ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিডের মতো উপাদানের গন্ধ ছড়িয়ে মশাকে আকৃষ্ট করা হয়। পাশাপাশি ড্রাই আইস বা সিলিন্ডারের মাধ্যমে কার্বন ডাই–অক্সাইড ব্যবহার করলে মশার কাছে সেখানে মানুষ বা অন্য কোনো জীবন্ত প্রাণীর উপস্থিতির সংকেত তৈরি হয়।

ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য আরও বলছে, ফাঁদটির নকশাও মশাকে আকৃষ্ট করতে ভূমিকা রাখে। মানুষের শরীরের তাপ ও বায়ুপ্রবাহের মতো কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে এটি মশাকে ফাঁদের দিকে টেনে আনে। সাদা জালিদার অংশের মাঝখানে থাকা কালো প্রবেশপথটি মশার জন্য দৃষ্টিগত সংকেত হিসেবে কাজ করে। মশা ওই কালো অংশের দিকে উড়ে এলে ভেতরে থাকা বৈদ্যুতিক সাকশন পাখা সেটিকে টেনে ফাঁদের মধ্যে নিয়ে যায়।

ভেতরে ঢোকার পর মশাগুলো একটি বিশেষ নেট ব্যাগে জমা হয়। বাতাসের প্রবাহের কারণে সেখান থেকে সহজে বের হতে পারে না। বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন বা ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে গেলেও ফাঁদের স্বয়ংক্রিয় শাটার বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আগে ধরা মশা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না।

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বেশি ভর্তি হয়—ডিএনসিসির আওতাধীন এমন ১০টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালকে এই ফাঁদ বসানোর জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে।

যে ১০ হাসপাতালে বসানো হবে ফাঁদ

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বেশি ভর্তি হয়—ডিএনসিসির আওতাধীন এমন ১০টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালকে এই ফাঁদ বসানোর জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য, হাসপাতালের ভেতরে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানো কোনো এডিস মশা যেন অন্য রোগীকে কামড়ে ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ না পায়, সেই ঝুঁকি কিছুটা কমানো।

মানুষের শরীরের গন্ধের মতো কৃত্রিম সুগন্ধ ছড়িয়ে মশাকে ডেকে আনবে এই ফাঁদ। ছবি: ডিএনসিসির সৌজন্যে

পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড–১৯ হাসপাতালে ছয়টি করে ফাঁদ বসানো হবে। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে বসানো হবে চারটি, কুয়েত–বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে চারটি ও উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চারটি ফাঁদ বসানো হবে।

এ ছাড়া উত্তরার শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনটি, মিরপুরের ডা. এম আর খান শিশু হাসপাতালে তিনটি ও আলোক হাসপাতালে তিনটি ফাঁদ বসানোর পরিকল্পনা আছে। ডিএনসিসির প্রধান কার্যালয়ে (নগর ভবন) বসানো হবে আরও চারটি ফাঁদ। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, কিছু ফাঁদ পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণে রাখা হবে। আপাতত এই যন্ত্র উন্মুক্ত বা খোলা স্থানে ব্যবহারের সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন

ফাঁদ কি মশা নিয়ন্ত্রণের সমাধান

অধ্যাপক কবিরুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, বিজি সেন্টিনেল ট্র্যাপ মূলত মশা নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র নয়; বরং মশার উপস্থিতি ও বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণের ফাঁদ। হাসপাতালে এটি বসালে কিছু মশা আটকা পড়বে এবং তাতে মশার সংখ্যা সামান্য কমতে পারে। ব্যাপকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা সীমিত বলে মনে করেন তিনি।

কবিরুল বাশার বলেন, ফাঁদে আটকানো মশার নমুনা নিয়মিত সংগ্রহ করে সেগুলোয় ডেঙ্গু ভাইরাসের উপস্থিতি ও সেরোটাইপ বিশ্লেষণ করা গেলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে কোনো এলাকায় মশার মাধ্যমে রোগ ছড়ানোর সক্ষমতা সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে এমন বিশ্লেষণ ও নজরদারির সক্ষমতা সিটি করপোরেশনের আছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

কবিরুল বাশারের ভাষ্য, মশা পর্যবেক্ষণের জন্য বিজি সেন্টিনেল ট্র্যাপ অন্যতম সেরা উপকরণ হলেও মশা নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা খুব বেশি নয়। হাসপাতাল এলাকায় ১০টি মশা আটকা পড়লে ওই ১০টি মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়ানোর ঝুঁকি ঠেকানো যাবে—এটুকুই এর সরাসরি নিয়ন্ত্রণমূলক সুফল।

মশা পর্যবেক্ষণের জন্য বিজি সেন্টিনেল ট্র্যাপ অন্যতম সেরা উপকরণ হলেও মশা নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা খুব বেশি নয়। হাসপাতাল এলাকায় ১০টি মশা আটকা পড়লে ওই ১০টি মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়ানোর ঝুঁকি ঠেকানো যাবে—এটুকুই এর সরাসরি নিয়ন্ত্রণমূলক সুফল।
কবিরুল বাশার, কীটতত্ত্ববিদ ও অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বিকল্প হতে পারে দেশীয় প্রযুক্তি

কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বায়োজেন্টস নামের একটি কোম্পানি এই ফাঁদ তৈরি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে একটি ফাঁদের বর্তমান মূল্য প্রায় ২০৮ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশে আমদানি করলে শুল্কসহ সব মিলিয়ে এর দাম ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

মশাকে আকৃষ্ট করার জন্য ব্যবহৃত প্রযুক্তি বা বিজি–লিওরের দামও প্রায় ৫৩ মার্কিন ডলার। কবিরুল বাশারের মতে, এই ফাঁদের কাঠামো তুলনামূলকভাবে সাধারণ হলেও উৎপাদন খরচের তুলনায় বিশ্ববাজারে এ ধরনের ফাঁদ বেশ উচ্চ মূল্যে বিক্রি হয়।

ভেতরে ঢোকার পর মশাগুলো একটি বিশেষ নেট ব্যাগে জমা হয়। বাতাসের প্রবাহের কারণে সেখান থেকে সহজে বের হতে পারে না
ছবি: ডিএনসিসির সৌজন্যে

বিদেশি এই ফাঁদের পরিবর্তে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি তুলনামূলক কম দামের মশা নিধন, নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ ফাঁদ পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে কবিরুল বাশার বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে ফাঁদভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণে টেকসই পরিকল্পনা করতে হলে সিটি করপোরেশন দেশীয় প্রযুক্তিগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করতে পারে। ভালো ফল পাওয়া গেলে বিদেশি উচ্চ মূল্যের ফাঁদের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে তৈরি ফাঁদ ব্যবহার সম্ভব।

আরও পড়ুন

দুটি দেশীয় ফাঁদের উদাহরণও দেন কবিরুল বাশার। থিংক ল্যাবসের তৈরি একটি মশা মারার ফাঁদ রয়েছে। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের উদ্যোগে তাঁর নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে ‘ডেন–এক্স ট্র্যাপ’।

কবিরুল বাশারের দাবি, স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব ফাঁদ শুধু মশা সংগ্রহ বা পর্যবেক্ষণ নয়, মশা নিধন ও নিয়ন্ত্রণেও একাধিকভাবে ব্যবহার করা যায়। কার্যকারিতার দিক থেকেও এগুলো বিদেশি ফাঁদের চেয়ে ভালো।

আরও পড়ুন