পবিত্র ঈদুল আজহায় ঈদের দিন, এর আগের চার দিনসহ মোট পাঁচ দিন রাজধানীর অস্থায়ী হাটগুলোয় কোরবানির পশু বেচাকেনা হবে। মাত্র পাঁচ দিন বসবে—ঢাকার এমন একটি অস্থায়ী হাটের ইজারা দিতে ১৪ কোটি টাকা দরপ্রস্তাব পাওয়া গেছে। হাটটির অবস্থান উত্তরা দিয়াবাড়ি ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর-সংলগ্ন বউবাজার এলাকার খালি জায়গা। এটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন।
গতকাল সোমবার বিকেলে ঢাকা উত্তর সিটির নগর ভবনে অস্থায়ী হাট ইজারা নিতে আগ্রহীদের দেওয়া দরপ্রস্তাবের খাম খোলা হয়। এ সময় দিয়াবাড়ির ওই হাটের জন্য আগ্রহী চার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দরপ্রস্তাব পাওয়া যায়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা দরপ্রস্তাব করেছে এসএফ করপোরেশন।
এ বছর উত্তরা দিয়াবাড়িসহ মোট ১২টি অস্থায়ী হাট বসাতে দরপত্র আহ্বান করে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ। দরপত্র খোলার পর দেখা যায়, চারটি হাট ইজারা নিতে কোনো দরদাতা পাওয়া যায়নি। দুটি হাটে একটি করে দরপ্রস্তাব জমা পড়েছে।
গত তিন বছরের হাটের ইজারামূল্যের গড় করে সরকারি দর নির্ধারণ করা হয়।
অস্থায়ী হাটগুলোর পাশাপাশি ঢাকা উত্তরে স্থায়ী হাট ‘গাবতলী পশুর হাট’ রয়েছে। এ হাটেও কোরবানির পশু বেচাবিক্রি হবে।
সর্বোচ্চ দরদাতা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা
ঢাকা উত্তর সিটিতে দরপত্র আহ্বান করা অস্থায়ী ১২টি হাটের মধ্যে সরকারি দরের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি মূল্য ছিল উত্তরা দিয়াবাড়ি হাটেরই—৮ কোটি ৩০ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৪ টাকা। এই হাট ইজারা নিতে সর্বোচ্চ দরদাতা হলেন এসএফ করপোরেশনের মালিক শেখ ফরিদ হোসেন।
স্থানীয় বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শেখ ফরিদ হোসেন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়কের দায়িত্বে আছেন। ওই হাটের জন্য দর দেওয়া বাকি তিনজন হলেন জামির হোসেন (১৪ কোটি ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা), জুবায়ের এন্টারপ্রাইজের চান মিয়া (১২ কোটি ৭০ হাজার টাকা) এবং রশিদ অ্যান্ড কোংয়ের শফিউল আলম (১২ কোটি ৩৪ হাজার টাকা)।
গত বছর এ হাটের সরকারি দর ছিল ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। পরে ১০ কোটি ১ লাখ টাকায় ওই হাটের ইজারা নিয়েছিলেন এসএম ব্রাদার্সের মালিক এস এম খোকন। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক।
দুই হাটে কোটি টাকার বেশি দর
তেজগাঁওয়ে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট-সংলগ্ন খালি জায়গার হাটের সরকারি দর ছিল ১ কোটি ১৩ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা। ওই হাট ইজারা নিতে আগ্রহী তিন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দরপ্রস্তাব পাওয়া গেছে। সর্বোচ্চ দর উঠেছে ৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এ দর দিয়েছেন শিকদার এন্টারপ্রাইজের মালিক আমিনুল ইসলাম। বাকি দুই দরদাতার মধ্যে মেসার্স রাইয়ান এন্টারপ্রাইজ ৩ কোটি ৩ লাখ টাকা এবং জায়ান এন্টারপ্রাইজ ২ কোটি ৭৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা প্রস্তাব দিয়েছে।
মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের (ইস্টার্ন হাউজিংয়ের) খালি জায়গার অস্থায়ী হাটের জন্য সর্বোচ্চ ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা দরপ্রস্তাব পাওয়া গেছে। এই প্রস্তাব দিয়েছেন ইসলাম এন্টারপ্রাইজের মালিক সিরাজুল ইসলাম। বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানই একই দর দিয়েছে—১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এই হাটের সরকারি মূল্য ১ কোটি ৭৬ লাখ ৪৭ হাজার ৮৫৮ টাকা।
তিন হাটে দর ৩১ লাখ টাকার মধ্যে
মিরপুরের কালশী বালুর মাঠের (১৬ বিঘা) খালি জায়গায় হাটের জন্য সরকার নির্ধারিত দর ছিল ৩০ লাখ টাকা। হাটটি ইজারা পেতে আগ্রহী দুই ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান দর দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি দর দিয়েছেন রেদওয়ান রহমান—৩০ লাখ ১১ হাজার টাকা। অন্যজন খান এন্টারপ্রাইজের মালিক মাসুদুর রহমান খান দর দিয়েছেন ৩০ লাখ ৬ হাজার টাকা।
১৫ লাখ ৫ হাজার টাকা সরকারি মূল্যের কাঁচকুড়া বাজার-সংলগ্ন রহমাননগর আবাসিক এলাকার খালি জায়গার হাটের জন্য তিনটি দরপত্র জমা পড়েছে। সর্বোচ্চ দর দিয়েছেন রফিকুল ইসলাম—২৭ লাখ টাকা। বাকি দুজনের মধ্যে আরফান এন্টারপ্রাইজ ২৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা এবং ম্যাক্সকর্ন ইন্টারন্যাশনাল ১৫ লাখ ২১ হাজার টাকা দর প্রস্তাব জমা দেয়।
পূর্ব হাজীপাড়া এলাকার ইকরা মাদ্রাসার পাশের খালি জায়গার হাটের জন্যও তিনটি দরপ্রস্তাব জমা হয়েছে। হাটটির সরকারি দর ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ দরদাতা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৩ হাজার টাকা বেশি, অর্থাৎ ১৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা দর দিয়েছেন। অন্য দুটি প্রতিষ্ঠান দর দিলেও কেউই নিয়ম অনুযায়ী পে-অর্ডার দেননি।
দুটিতে একটি করে দরপত্র, চারটিতে নেই
মস্তুল চেকপোস্ট–সংলগ্ন পশ্চিমপাড়ার খালি জায়গা ও ভাটুলিয়া সাহেব আলী মাদ্রাসা থেকে ১০ নম্বর সেক্টর রানাভোলা অ্যাভিনিউ-সংলগ্ন উত্তরা রানাভোলা স্লুইসগেট পর্যন্ত খালি জায়গা—এ দুই হাটের জন্য মাত্র একটি করে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দরপ্রস্তাব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৯৩ লাখ ২২ হাজার টাকা মূল্যের মস্তুল হাটের জন্য বিল্লাল হোসেন নামের এক ব্যক্তি দর দিয়েছেন ৩ কোটি ৬০ হাজার টাকা।
তবে রানাভোলা হাটের জন্য দর দেওয়া আগ্রহী একমাত্র প্রতিষ্ঠানের কাছেও সরকার নির্ধারিত দর পাওয়া যায়নি। ওই হাটের সরকার নির্ধারিত দর ৮৮ লাখ ২০ হাজার ৭৫০ টাকা। একমাত্র দরদাতা মেসার্স লামিয়া এন্টারপ্রাইজের নুর আলম দর দিয়েছেন ৮৮ লাখ টাকা।
খিলক্ষেত বাজার–সংলগ্ন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের খালি জায়গা (সরকারি দর ছিল ১ কোটি ৫১ লাখ), মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজার-সংলগ্ন খালি জায়গা (১৪ লাখ), মোহাম্মদপুরের বছিলায় ৪০ ফুট রাস্তাসংলগ্ন খালি জায়গা (১ কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার) এবং ভাটারা সুতিভোলা খাল অস্থায়ী হাটের (৩ কোটি ১২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা) জন্য কোনো দরপ্রস্তাব জমা পড়েনি।
ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমানের নেতৃত্বে দরপত্র খোলা হয়। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি দরদাতাদের দেওয়া পে-অর্ডারসহ যাবতীয় নথিপত্র যাচাই-বাছাই করবেন। কোনো হাটের দরপত্র নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের কোনো অভিযোগ থাকলে লিখিত দিতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী, যেসব হাটের জন্য কোনো দর পাওয়া যায়নি, সেগুলোর জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হবে।