নতুন রাষ্ট্রপতি আজ বঙ্গভবনে উঠেছেন, জেনে নিন শতাব্দীপ্রাচীন ভবনটির ইতিহাস
বঙ্গভবন হলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও দপ্তর। নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নিলেও আজ রোববার উঠেছেন শতাব্দীপ্রাচীন এ স্থাপনায়।
ব্রিটিশ শাসকেরা এ ভবন নির্মাণ করেন। সময়টা ১৯০৫ সাল। বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা করে ব্রিটিশরা। ফলে বাংলা ভাগ হয়ে দুটি প্রদেশ হয়। একটি পশ্চিমবঙ্গ, যার রাজধানী কলকাতা। অন্যটি পূর্ববঙ্গ ও আসাম। ঢাকাকে এ প্রদেশের রাজধানী করা হয়।
১৯০৫ সালের অক্টোবরে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করা হয়। নতুন প্রদেশ তো হলো। কিন্তু পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের নতুন লেফটেন্যান্ট গভর্নর থাকবেন কোথায়? এ প্রয়োজনীয়তা থেকেই ব্রিটিশ সরকার ঢাকার বুকে এখনকার বঙ্গভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়; যদিও ‘বঙ্গভবন’ নামটি দেওয়া হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে।
নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ঢাকায় আসেন স্যার জোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলার। মূলত তাঁর জন্যই ঢাকার দিলকুশা এলাকায় দানা দিঘির ময়দানে নতুন বাসভবন নির্মাণের কর্মযজ্ঞ শুরু করা হয়। ১৯০৫ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। পুরোপুরি শেষ হয় ১৯১১ সালে। এর আগেই ১৯০৬ সালে নতুন বাসভবনে ওঠেন ব্যামফিল্ড ফুলার।
ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুনের লেখা ‘ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ নামের বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে এবং বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির ‘ঢাকা কোষ’ বইয়ে বঙ্গভবন নির্মাণের ইতিহাস বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এসব বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখন যে জায়গায় বঙ্গভবনের অবস্থান, সেটা একসময় ঢাকার নবাব পরিবারের সম্পত্তি ছিল। বঙ্গভঙ্গের পর তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার লেফটেন্যান্ট গভর্নরের জন্য বাসভবন নির্মাণে আগ্রহী হলে নবাব পরিবারের স্যার সলিমুল্লাহ দিলকুশায় তাঁদের পারিবারিক বাগানে এ বাসভবন নির্মাণের প্রস্তাব করেন। এ জন্য বাগানবাড়ির দক্ষিণ অংশটি ব্রিটিশ সরকারের কাছে ইজারা দেওয়া হয়।
দক্ষিণ অংশের যে অংশ ‘দানা দিঘির ময়দান’ নামে পরিচিত ছিল, সেখানে ভবনটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ব্যামফিল্ড ফুলার নিজেই বাসভবনের জায়গাটি বেছে নেন। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার আগ অবধি এখানে পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের আইন পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হতো। বিভিন্ন সময় অভিজাত শ্রেণির মানুষদের অভ্যর্থনা জানানো হতো।
পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণ হতো এ ভবনে। বিশেষ রাষ্ট্রীয় দিবস পালনে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতো গভর্নর হাউস বা আজকের বঙ্গভবনে। ‘ঢাকা কোষ’ বইয়ে বলা হয়েছে, বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পরও প্রাদেশিক গভর্নরকে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঢাকায় আসা ও অবস্থান করার বিধান চালু ছিল। তখন দিলকুশার গভর্নর হাউসটি ব্যবহার করা হতো।
কাঠের প্রাসাদ থেকে বঙ্গভবন
‘ঢাকা কোষ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ১৯০৫ সালে ২৩ দশমিক ৫ হেক্টর জায়গায় আজকের ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হয় ১৯১১ সালে। শুরুতে এর নাম ছিল ‘গভর্নমেন্ট হাউস’। সেগুন কাঠের তৈরি ভবনটির মেঝের আয়তন ২৫ হাজার ১২৮ বর্গফুট। কাঠের মেঝে ছিল মাটি থেকে চার ফুট উঁচু। এ জন্য একে ‘টিম্বার প্যালেস’ বা কাঠের রাজপ্রসাদ বলা হতো।
১৯৬১ সালে এক ঘূর্ণিঝড়ে কাঠের প্রাসাদটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যবহারের পুরোপুরি অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এরপর নতুন করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের জন্য নতুন বাসভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভবনের নকশা কেমন হবে, সেটা ঠিক করতে লাহোর থেকে আনা হয় নামকরা স্থপতি মঈনুদ্দিন চিশতিকে।
তৎকালীন গভর্নর আজম খানের ইচ্ছা অনুযায়ী মঈনুদ্দিন চিশতি এ ভবনের নকশায় ইসলামিক স্থাপত্যশৈলীকে প্রাধান্য দেন। ১৯৬৪ সালে ১৭ জানুয়ারি এই স্থপতির হাত ধরে ৮৪ হাজার বর্গফুটের দোতলা ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়। নতুন এ প্রাসাদে যুক্ত হয় দরবার হল, গভর্নরের শোবার ঘর, দপ্তর, বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য বেশ কয়েকটি কক্ষ।
অন্যদিকে ‘ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ভবনটি। এরপর আরও এক দফা ভবনটি সংস্কার করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২৩ ডিসেম্বর এখানেই নতুন দেশের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়েছিল। ওই সময় ভবনটিকে রাষ্ট্রপতির আবাস ও দপ্তর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। নাম রাখা হয় বঙ্গভবন।
বঙ্গভবনে সময়ের প্রয়োজনে যুক্ত করা হয়েছে অতিরিক্ত কক্ষ। দেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের চিত্রকর্ম দিয়ে ভবনের অভ্যন্তরকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে।