দেয়ালজুড়ে একের পর এক অনেক মানুষের মুখচ্ছবি। কোনোটি আকারে অনেক বড়। এমনকি বিশাল বলা যেতে পারে। আবার অনেকগুলো মাঝারি, কিছু আছে ছোট।
কিছু মুখচ্ছবি কাচের ফ্রেম দিয়ে বাঁধাই করা, অনেকগুলো ফ্রেম ছাড়ই দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা। এমন প্রায় ৯০টি শিল্পকর্ম নিয়ে শিল্পী ফারজানা আহমেদের একক প্রদর্শনী ‘আত্ম-অনুপস্থিতির সাক্ষ্য’ শুরু হলো শুক্রবার লালমাটিয়ায় কলাকেন্দ্রে।
ছবির মুখগুলোর দিকে তাকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে ইচ্ছা হয়, ‘দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।’ কিন্তু সরাসরি চেনাও যায় না। অনেক ছবিরই নাক, মুখ, চোখ কিছু নেই। শুধু আছে মানবমুখের আবছা আকৃতি। আবার যেসব ছবিতে নাক, মুখ, চোখ আছে, সেগুলোও খুব স্বাভাবিক নয়। ভয় পেলে, আতঙ্কগ্রস্ত হলে, যন্ত্রণাকাতর হলে, বিস্মিত হলে, ক্রুদ্ধ হলে, শোকাভিভূত হলে, উত্তেজিত হলে— এমন বিবিধ মানবিক আবেগ, অনুভূতিতে মানুষের মুখে যে অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে, শিল্পী তাই ফুটিয়ে তুলেছেন। যেন সমাজ ও সমকালের অভিব্যক্তিই প্রকাশিত হয়েছে এসব মুখের আদলে।
শিল্পী ফারজানা আহমেদ জানালেন, এই কাজগুলো ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে করা। মানুষ তখন বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে পথে নামছিলেন। সংগ্রাম করছিলেন।
অনেক রকমের নিষেধাজ্ঞা, নির্যাতন, নিবর্তন সহ্য করে তাঁদের কথা বলা অব্যাহত রেখেছিলেন। জীবনের মায়া তুচ্ছ করে রাজপথে নেমেছেন। সেই মানুষগুলোর ভেতরে কেমন আবেগ কাজ করেছে, সেই ভাবনা থেকেই তিনি এই কাজগুলো করেছেন।
মানুষগুলোকে হয়তো আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল না, তবে তাদের আবেগ, তাদের বক্তব্য বোঝা যাচ্ছিল। সময়ের এই দাবি ও বাস্তবতাকেই তিনি তুলে ধরেছেন। তখন ভয় ছিল, আতঙ্ক ছিল; কিন্তু মানুষের সাহসও ছিল প্রবল। মুক্তির জন্য, মঙ্গলের জন্য মানুষের মানবিক উদ্যম ও প্রচেষ্টা এসেছে তাঁর শিল্পকর্মে। তিনি বলেছেন, ‘আমি একটা স্বপ্ন খুঁজছি এই দুঃস্বপ্নের নগরীতে’। সেই স্বপ্নই আঁকা হয়েছে চেনা অচেনা, আধেক চেনা অনেক মানুষের মুখাবয়বে।
শিল্পী নিসার হোসেন বললেন, ফারজানা আহমেদ উর্মি তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে কাজের ধারাবাহিকতা ও নিজস্ব চিত্রভাষা সৃষ্টির মাধ্যমে বিশিষ্টতা অর্জন করেছেন। সাধারণত নারী শিল্পীদের শিল্পকর্ম বলতে যেমন কাজের কথা ভাবা হয়, উর্মির কাজ তার চেয়ে আলাদা। প্রথম থেকেই তিনি তাঁর কাজের শৈল্পিক মান, বিষয়গত ভাবনা, মাধ্যমের ব্যবহার, অভিব্যক্তির প্রকাশ—সবকিছু দিয়ে অভিভূত করেছিলেন।
প্রদর্শনীর কিউরেটর ও কলাকেন্দ্রের পরিচালক শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দর্শকের স্বাগত জানিয়ে বলেন, শিল্পী ফারজানা আহমেদ চিত্র নির্মাণ, বিনির্মাণে, শারীরিক-মানসিক চাক্ষুষ ক্ষুধা, উচ্ছ্বাস তাঁকে এ সময়ের শিল্পচর্চায় উদ্যমী শিল্পীতে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও আলোচনা করেন শিল্পসংগ্রাহক রেজওয়ান রহমান। শিল্পীর মা হাসিনা আসরাফুজ্জামানও উপস্থিত ছিলেন। শিল্পী তাঁর মাকে দর্শকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ফারজানা আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন। এর আগে তাঁর আরও পাঁচটি একক চিত্রকলা প্রদর্শনী হয়েছে ঢাকা, কোরিয়া ও জাপানে। অংশ নিয়েছেন দেশ–বিদেশের বহু দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে।
অ্যাক্রিলিক, জলরং, কোলাজ ও মিশ্রমাধ্যমে আঁকা এই শিল্পকর্ম প্রদর্শনী চলবে আগামী ২ মার্চ পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনী সবার জন্য খোলা থাকবে।