স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকার আশুলিয়া থেকে মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় আসছিলেন মো. আল আমিন। পরিবার নিয়ে তিনি হেঁটে চিড়িয়াখানার দিকে যাচ্ছিলেন। প্রথম আলোকে আল আমিন বললেন, সনি সিনেমা হল থেকে একটু এগোতেই দেখেন প্রচুর যানজট। কিছুক্ষণ বসে থেকে তাই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হেঁটেই রওনা দেন।
আজ রোববার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, জাতীয় চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের ঢল নেমেছে। মিরপুর ১ নম্বরের সনি সিনেমা হল থেকে চিড়িয়াখানার দিকে অল্প এগোলেই যানজটের শুরু। দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে অনেকে বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন থেকে নেমে হেঁটে যাচ্ছেন। সেই দলে ছিল আল আমিনের পরিবার। মানুষের ঢল থাকায় যানজট নিয়ন্ত্রণে রাইনখোলা মোড় থেকে চিড়িয়াখানার দিকে যানবাহন যেতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে চিড়িয়াখানাগামী সব ধরনের দর্শনার্থীদের প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হয়েছে।
রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় ঈদের দ্বিতীয় দিনে গতকাল রোববার ১ লাখ ৯০ হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটেছে। গতকাল সন্ধ্যায় জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক রফিকুল ইসলাম তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) চিড়িয়াখানার ফটক খোলা হয়েছে সকাল ৯টায়। কিন্তু সকাল ৮টা থেকে লোকজন অবস্থান নেওয়া শুরু করে। আজ টিকিট বিক্রি বন্ধ হয়েছে বিকেল ৫টায়। মাগরিবের নামাজের মধ্যে দর্শনার্থীদের বের হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ভিড় থাকায় পৌনে ৭টায় লোকজন বের হচ্ছে। আজকে ১ লাখ ৯০ হাজার দর্শনার্থীর আগমন ঘটেছে।’
প্রতিবছরই পবিত্র ঈদুল ফিতরের সময় জাতীয় চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
জাতীয় চিড়িয়াখানায় বেঙ্গল টাইগার, কালো ভালুক, হায়েনা, হাতি, জলহস্তী, ক্যাঙারু, অজগর, ঘড়িয়াল থেকে শুরু করে উটপাখিসহ ১৩৭ প্রজাতির ৩ হাজার ৫২৩টি প্রাণী রয়েছে।
ফিরতেও ভোগান্তি
অন্যদিকে চিড়িয়াখানা থেকে বের হওয়া লোকজনও যানবাহন পাননি। ফলে হাজারো দর্শনার্থীকে চিড়িয়াখানা থেকে হেঁটে মিরপুর ১ নম্বরের সনি সিনেমা হল পর্যন্ত আসতে হয়েছে। সেখান থেকে তাঁদের বাস, সিএনজি বা অন্য যানবাহনে ফিরতে হয়েছে।
মানুষের ঢল সামলাতে চিড়িয়াখানার মূল ফটকও গতকাল খুলে দেওয়া হয়েছে। মূলত দর্শনার্থীরা যেন সহজে বের হয়ে যেতে পারেন। কারণ, প্রবেশের জন্য ফটকের সংখ্যা বেশি থাকলেও বের হওয়ার জন্য কম।
সরেজমিনে দেখা যায়, দর্শনার্থীদের অধিকাংশই পরিবার নিয়ে এসেছেন। মূলত শিশুদের ইচ্ছাপূরণের জন্য ঈদের সময় দর্শনার্থীদের বড় অংশ এসে থাকে।
চিড়িয়াখানায় ঘুরে ঘুরে এমনিতেই ক্লান্ত। এর মধ্যে চিড়িয়াখানা থেকে বের হয়ে যানবাহন পাচ্ছি না। তাই বাধ্য হয়ে হাঁটা শুরু করেছি। ব্যবস্থাপনা আরও ভালো হওয়া দরকার ছিল। তাহলে সাধারণ মানুষকে এমন ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।রোকেয়া আক্তার, চিড়িয়াখানার দর্শনার্থী
মা, বোন ও ভাইকে নিয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে চিড়িয়াখানায় আসেন মো. হোসাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিড়িয়াখানায় প্রচুর ভিড়। আসার সময় ৪০০ টাকা দিয়ে যাত্রাবাড়ী থেকে চিড়িয়াখানা এসেছিলাম। চিড়িয়াখানা থেকে বের হয়ে দেখি, আশপাশে যানবাহন নেই। যে দু-একটা আছে, বাড়তি ভাড়া চায়। সিএনজিচালকেরা যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা ভাড়া চাইছেন। এখন পরিবার নিয়ে হেঁটেই রওনা দিয়েছি।’
হোসাইনের বোন রোকেয়া আক্তার। তিনি বলেন, ‘চিড়িয়াখানায় ঘুরে ঘুরে এমনিতেই ক্লান্ত। এর মধ্যে চিড়িয়াখানা থেকে বের হয়ে যানবাহন পাচ্ছি না। তাই বাধ্য হয়ে হাঁটা শুরু করেছি। ব্যবস্থাপনা আরও ভালো হওয়া দরকার ছিল। তাহলে সাধারণ মানুষকে এমন ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।’
জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, চিড়িয়াখানার পার্কিং এলাকায় এত জটলা লেগে গেছিল যে কোনোভাবেই এখান থেকে গাড়ি বের করে ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। যার কারণে রাইনখোলা থেকে গাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ট্রাফিক পুলিশ করেছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য এ কাজ করেছে তারা।
রাজধানীর মুগদা এলাকা থেকে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসেন তুহিন আহমেদ। ভিড় হলেও চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসতে পেরে তাঁরা খুশি।
তুহিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ঈদের দিন বাসায় ছিলেন। তাই গতকাল স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে চিড়িয়াখানায় এসেছেন। মূলত সন্তানদের কারণেই তাঁরা এসেছেন। কারণ, সম্প্রতি তাঁরা সপরিবার সুন্দরবনে গিয়েছিলেন। বাচ্চারা সেখানে হরিণ ও কুমির দেখতে পেয়েছিল। বাঘ দেখতে পারেনি। বাচ্চাদের চিড়িয়াখানায় বাঘ দেখাতেই মূলত তাঁরা এসেছেন।
বড় ছেলে তাহমিদ আহমেদ (১০) বলে, সে বাঘ দেখতে পেয়েছে। তা ছাড়া ময়ূরকে পেখম মেলতে দেখেছে সে। তার খুব ভালো লেগেছে চিড়িয়াখানায় এসে।