মহান মানুষদের মৃত্যু হলেও তাঁদের কর্ম ও আদর্শ সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার পথ দেখায়

শোকসভায় বক্তব্য দিচ্ছেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। শনিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনেছবি: সুজনের সৌজন্যে

মহান মানুষের মৃত্যু হলেও তাঁদের চিন্তা, কর্ম ও আদর্শ সমাজকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার পথ দেখায়। তাঁদের মূল্য মাপা যায় না। যাঁরা তাঁদের চিন্তা, কর্ম ও মানবিকতা দিয়ে সমাজে প্রভাব ফেলেন, তাঁরা সাধারণ মানুষের সীমা অতিক্রম করে মহৎ মানুষে পরিণত হন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রয়াত পাঁচ সংগঠকের স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় এ কথাগুলো উঠে আসে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সুজনের সাবেক সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান, স্থানীয় সরকারবিশেষজ্ঞ ও সংগঠনের সাবেক কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য তোফায়েল আহমেদ, জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্য ও নারী অধিকারকর্মী রওশন জাহান, রংপুর বিভাগীয় সমন্বয় কমিটির সাবেক আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন এবং সিলেট বিভাগীয় সমন্বয় কমিটির সাবেক আহ্বায়ক ফারুক মাহমুদ চৌধুরীর স্মরণে এ শোকসভার আয়োজক সুজন।

শনিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে এ শোকসভা হয়। এতে প্রয়াত ব্যক্তিদের স্বজন ও সহকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। শোকসভার শুরুতে প্রয়াত ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর তাঁদের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করা হয়।

স্মরণসভায় সুজনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন সভাপতির বক্তব্যে বলেন, মহৎ মানুষদের স্মরণ করার মূল উদ্দেশ্য তাঁদের প্রশংসা করা নয়, বরং তাঁদের আদর্শ ও গুণাবলি থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের জীবনকে গড়ে তোলা। যাঁরা মানবকল্যাণে কাজ করেছেন, তাঁদের স্মরণ করে সভা সমাজকে অনুপ্রাণিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

এম এ মতিন বলেন, পাঁচজন বিশিষ্ট নাগরিকের স্মরণে এ আয়োজন করা হলেও তাঁদের প্রত্যেকের জন্য আলাদাভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠান করা যেত। কারণ, তাঁদের অবদান ও উচ্চতা এতটাই বড় যে স্বল্প সময়ে তা তুলে ধরা কঠিন। তবু এ আয়োজনের উদ্দেশ্য হলো তাঁদের গুণাবলি থেকে শিক্ষা নেওয়া। মহৎ মানুষের গুণাবলি সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় না; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। একজন তরুণ যদি মনে করে সে হাফিজউদ্দিন খানের মতো সৎ সরকারি কর্মকর্তা হবে, তোফায়েল আহমেদের মতো গবেষক হবে বা রওশন জাহানের মতো লেখক হবে—তাহলেই স্মরণসভার সার্থকতা আসবে।

‘মহান মানুষের মূল্য মাপা যায় না’

সভায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান ‘সৎ পাবলিক সার্ভেন্ট’, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ও নিবেদিতপ্রাণ নারী অধিকারকর্মীদের আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যাঁরা সততা, গণতন্ত্র, নারী অধিকার ও সুশাসনের জন্য কাজ করেছেন, তাঁদের স্মরণ করার সবচেয়ে বড় উপায় হলো তাঁদের অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নেওয়া।

স্মরণসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে রওনক জাহান প্রয়াত পাঁচজনের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তাঁদের মধ্যে রওশন জাহান তাঁর বোন। বোনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, রওশন জাহানের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল একজন কর্মী হিসেবে তিনি বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কোনো পারিশ্রমিক নেননি; স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করেছেন।

রওনক জাহান বলেন, স্মরণসভা আয়োজনের উদ্দেশ্য শুধু শোক প্রকাশ নয়; বরং যাঁরা সুশাসন, নারী অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছেন, তাঁদের আদর্শকে ধারণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এগিয়ে নেওয়া।

সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সুজনের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে এই পাঁচজনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাঁদের নিষ্ঠা, সততা ও সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণেই সুজন আজ একটি পরিচিত ও সম্মানিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, স্মরণ করা পাঁচজনের সবার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কারও সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে, কারও সঙ্গে কাজের সূত্রে দীর্ঘদিন যোগাযোগ ও মতবিনিময় হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ ও তর্কবিতর্ক হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কখনো কমেনি।

প্রয়াত পাঁচ সংগঠকের স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় আলোচকেরা। শনিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে
ছবি: সুজনের সৌজন্যে

মহান মানুষের মৃত্যু হলেও তাঁদের চিন্তা, কর্ম ও আদর্শ সমাজকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার পথ দেখায় বলে উল্লেখ করেন সুজনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস। তিনি বলেন, মহান মানুষের মূল্য মাপা যায় না। যাঁরা তাঁদের চিন্তা, কর্ম ও মানবিকতা দিয়ে সমাজে প্রভাব ফেলেন, তাঁরা সাধারণ মানুষের সীমা অতিক্রম করে মহৎ মানুষে পরিণত হন। স্মরণসভায় যাঁদের স্মরণ করা হয়েছে, তাঁরা এমনই পাঁচজন মহৎ মানুষ।

প্রয়াত তোফায়েল আহমেদের স্ত্রী মাসুদা আক্তার চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে তাঁদের প্রায় ৪০ বছরের দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি তুলে ধরেন। এ সময় তিনি তোফায়েল আহমেদের করা স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সংস্কারবিষয়ক প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করার দাবি জানান।

স্মরণসভায় এম হাফিজউদ্দিন খানের কন্যা হাসনা সামস হাসির পূর্বে ধারণ করা একটি ভিডিও চিত্র প্রচার করা হয়। তিনি বলেন, তাঁর বাবা জীবনের নানা ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও নীতিনিষ্ঠ ছিলেন। সততা ছিল হাফিজউদ্দিন খানের জীবনের অন্যতম মূল স্তম্ভ।

সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকারের সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন প্রয়াত রওশন জাহানের বোন বিশ্বব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিলুফার আহমেদ, বার্ডের পরিচালক ও তোফায়েল আহমেদের সহকর্মী ফৌজিয়া নাসরীন, সুজন রংপুর জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক জাকির আহমেদসহ অনেকে।