ছয়তলা ভবনের কাঠামো নির্মাণের পর চারপাশের দেয়াল ও আনুষঙ্গিক কাজ বাদ রেখে ২০০৭ সালে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয় সিটি করপোরেশন। ঠিকাদারেরা অতিরিক্ত অর্থ দাবি করায় তখন নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায় বলে সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে। তারপর প্রায় ১৫ বছর ধরে ভবনটি পড়ে আছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের একাংশ দখল করে বানানো হয়েছে কমিউনিটি বিট পুলিশের কার্যালয়। অন্য পাশে আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর উত্তর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ১৩ নম্বর ইউনিটের প্রধান কার্যালয়। এ ছাড়া ভবনের পশ্চিম পাশে গৃহস্থালি থেকে সংগ্রহ করা বর্জ্য স্থানান্তরের জন্য সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর গাবতলীতে আমিনবাজার কিচেন মার্কেট পরিদর্শনে যান ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম। পরিদর্শনকালে মিরপুর-১১ নম্বরের এই ভবন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি ওই মার্কেটের নাম দিয়েছি—জন্ম থেকে জ্বলছি। মার্কেটটি চালুই হলো না। অথচ বুয়েট বলছে, মার্কেটটি পরিত্যক্ত।’

মার্কেট চালুর আগেই তা ‘পরিত্যক্ত’ হওয়ার বিষয়ে জানতে ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ভবনটির অবস্থা জানতে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি প্রতিনিধিদলকে নিয়োগ করা হয়েছিল। তারা ২০২০ সালে ভবনটির ওপর কারিগরি মূল্যায়ন করে একটি প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে ভবনে ‘রেট্রো ফিটিং’ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এ বাবদ ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব তখন করা হয়েছিল।

প্রকৌশলীরা বলছেন, রেট্রো ফিটিংয়ের অর্থ হচ্ছে, কোনো ভবনের কলাম, বিম, ছাদ দুর্বল হয়ে গেলে তা আবার মজবুত ও ব্যবহার উপযোগী করতে অতিরিক্ত রড বা অন্য নির্মাণসামগ্রীর প্রলেপ দেওয়া।

অর্থাৎ কলাম বা ছাদ দুর্বল হলে তার পাশ দিয়েই অতিরিক্ত রড-সিমেন্টের বাড়তি প্রলেপ দিয়ে তা মজবুত করার কাজটিকে প্রকৌশলবিদ্যায় রেট্রো ফিটিং বলে।

বিপণিবিতান ভবনে দোকান বরাদ্দ পেতে যেসব ব্যবসায়ী সিটি করপোরেশনে টাকা জমা দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ইতিমধ্যে মারা গেছেন। আর বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা বলছেন, তাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁরা টাকা দিয়ে ফেঁসে গেছেন।

মারা যাওয়া ব্যক্তিদের একজন মিরপুরের বাসিন্দা আবদুল জলিল। তাঁর ছেলে মোহাম্মদ সোহেল। তিনি জানান, দোকান পেতে তাঁর বাবা গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরুতে টাকা জমা দিয়েছিলেন। দোকান পাওয়ার আশায় দিন কাটাতে কাটাতে আবদুল জলিল ২০১৩ সালে মারা যান। এখন তাঁরা দোকান পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু এ অপেক্ষা ফুরাচ্ছে না। অন্যদেরও একই অবস্থা।

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণ বা কোনো তত্ত্বাবধান করা হচ্ছে না। ফলে ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যা নামলে ভবনের ভেতরে মাদক সেবনসহ নানা অনৈতিক-অপরাধমূলক কাজ চলে। এমনকি ভবনে খুনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। তাই সিটি করপোরেশনের উচিত, ভবনটি রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা করা।

ডিএনসিসির রাজস্ব বিভাগের হিসাবে, বিপণিবিতান ভবনটিতে ২ হাজার ৩৬৩টি দোকান আছে। এগুলো বরাদ্দের জন্য স্থানীয় তিনটি সমিতির মাধ্যমে সিটি করপোরেশন প্রায় ১৪ কোটি টাকা প্রাথমিকভাবে সংগ্রহ করে। এর মধ্যে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সময় ১২ কোটি ৩২ লাখ ৮০ হাজার টাকা নেওয়া হয়।

একটি দোকানের জন্য টাকা জমা দেন ইমতিয়াজ আলম। তিনি নিউ সোসাইটি মার্কেট ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের কোষাধ্যক্ষ। ইমতিয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা টাকা জমা দিয়ে একেবারে ফেঁসে গেছি। ভবনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সিটি করপোরেশনের কোনো মাথাব্যথাই নেই। ভবনটি যে যার মতো দখল করে রেখেছে। ভবনের ভেতরে গত বছর এক ব্যক্তি খুন হন।’

বিপণিবিতান ভবনটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, মেয়র ও স্থানীয় সংসদ সদস্য একাধিকবার ভবনটি পরিদর্শন করেছেন। যাঁরা দোকান বরাদ্দ পেয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে সমন্বয় করে বুয়েটের প্রতিবেদন অনুযায়ী ভবনটি ব্যবহার উপযোগী করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বিপণিবিতানটির নাম ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ দেওয়ার কারণ কী? এ প্রশ্নে মেয়র আতিকুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভবনটির নির্মাণকাজ অনেক বছর আগে শুরু হয়। কিন্তু আজও ব্যবসায়ীদের দোকান বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। ভবনটি বানানোর সময়ই নির্মাণের ত্রুটি ধরা পড়ে। ভবনটি ত্রুটিযুক্ত। সংস্কার ছাড়া ভবনে ওঠা যাবে না, এতে জানমালের ঝুঁকি থাকবে।’

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন