রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবন সংস্কার শেষ, দরকার আসবাব ও চিকিৎসার সরঞ্জাম
আকাশি নীল ও সাদা রঙে নতুন করে সাজানো হয়েছে ভবন এবং লাগানো হয়েছে নতুন দরজা–জানালা। জানালায় স্বচ্ছ কাচ, কক্ষে কক্ষে বৈদ্যুতিক পাখা। বাইরে নতুন সাইনবোর্ড। ভাঙা দেয়াল মেরামত করে তৈরি করা হয়েছে সীমানাপ্রাচীর।
হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর এভাবেই সংস্কার করে মিরপুর–১–এর রাড্ডা এমসিএইচ–এফপি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি ব্যবহার উপযোগী করা হয়েছে। এখন প্রয়োজনীয় আসবাব ও চিকিৎসার সরঞ্জাম জোগাড় করতে পারলেই পুরোদমে সেবা কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে।
আজ শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির মূল ভবনের সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে। প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশের পর নতুন করে তৈরি করা হয়েছে টিনের ছাউনি। সংস্কার করা হয়েছে কর্মীদের খাবার ঘর। ভবনের সামনের ও পেছনের ভাঙা দেয়াল নতুনভাবে ইটের গাঁথুনি দিয়ে নির্মাণ করে প্লাস্টার করা হয়েছে। পেছনের সীমানাপ্রাচীরেও অর্ধেক দেয়াল তুলে সাদা রং করা হয়েছে। নতুন করে দেওয়া হয়েছে পানির সংযোগ, বসানো হয়েছে পানির কল। কক্ষগুলোর দরজা–জানালায় ঝুলছে নতুন পর্দা।
তবে ভবনটি ব্যবহার উপযোগী হলেও স্বাস্থ্যসেবার পূর্ণাঙ্গ আয়োজন এখনো শেষ হয়নি। চিকিৎসকদের কক্ষ, পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও অন্যান্য সেবার জন্য প্রয়োজনীয় আসবাব ও যন্ত্রপাতি জোগাড় করতে হবে। তবে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে রাড্ডার মিরপুর–১০ কেন্দ্র থেকে কিছু পুরোনো আসবাব ওই কেন্দ্রে নিয়ে রাখা হচ্ছে।
কেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার প্রথম আলোকে বলেন, সংস্কারকাজ শেষ হওয়ায় এখন সেবা কার্যক্রমের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও আসবাবের ব্যবস্থা করতে হবে। কিছু জিনিস উদ্ধার করা গেলেও সেগুলোর ব্যবহারযোগ্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি চালু করতে আরও কিছু সরঞ্জাম ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা দরকার।
নাসরিন আখতার আরও বলেন, হামলার পরও টিকা দিতে আসা শিশু, মা ও অন্য সেবাপ্রার্থীদের অনেকে কেন্দ্রে আসছেন। আবার ভাঙচুরের কারণে সেবা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে কারও কারও মধ্যে সংশয়ও রয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন হলে নিয়মিত সেবা কার্যক্রম চালু করা সহজ হবে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে মিরপুর–১–এর রাড্ডা এমসিএইচ–এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশি অস্ত্র নিয়ে সেখানে ঢুকে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ওষুধ, টিকা, চিকিৎসার সরঞ্জাম ও অন্যান্য সামগ্রী লুট করে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির ব্যানারে এই হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
হামলার পর ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে কেন্দ্রটিতে হাম–রুবেলাসহ ইপিআই টিকাদান শুরু হয়। প্রথম দুই দিন ফটকের বাইরে খোলা আকাশের নিচে ত্রিপল টানিয়ে শিশুদের টিকা দেওয়া হয়। পরে ভাঙচুর করা কক্ষগুলো পরিষ্কার করে সীমিত পরিসরে সেবা চালু করা হয়। পর্যায়ক্রমে মায়েদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়ার কাজও শুরু হয়।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, হামলার খবর পাওয়ার পর বিদেশে থেকেই তিনি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। দেশে ফেরার পর কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে সংস্কারের উদ্যোগ নেন। তাঁর ভাষ্য, গত সাত দিনে দেয়াল, জানালা, দরজা, বৈদ্যুতিক সংযোগ, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সংস্কারকাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রটি আগামীকাল শনিবার বিকেলে রাড্ডা কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
আমিনুল হক আরও বলেন, এটি মা ও শিশুদের জন্য একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এখানে শিশুরা টিকা নিতে আসে। তাঁর নিজেরও শৈশবে মায়ের সঙ্গে এসে এখানে টিকা নেওয়ার স্মৃতি রয়েছে। সে কারণে কেন্দ্রটি সংস্কার করে দেওয়াকে তিনি নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেছেন। একই সঙ্গে হামলার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা প্রয়োজন।
সংস্কারকাজ শেষ হওয়ায় স্বস্তি পেয়েছেন কেন্দ্রটির দীর্ঘদিনের কর্মীরাও। সেখানে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কাজ করছেন হাবিব হাওলাদার। ১৯৮৯ সাল থেকে টানা ৩৭ বছর ধরে তিনি এই কেন্দ্রে কর্মরত। বরিশাল থেকে এসে এখানেই চাকরি শুরু করেছিলেন তিনি। প্রথম আলোকে হাবিব বলেন, ‘যখন এই কেন্দ্রে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছিল, তখন খুব খারাপ লেগেছিল। বরিশাল থেকে এসে এখানেই প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম। এখানে চাকরি করে আমার সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছি। তারাও এখন চাকরি করছে। এই কেন্দ্রই আমার পরিবারের সব।’
হাবিব হাওলাদার বলেন, ‘ভাঙচুরের পর এখন সংস্কার করে দেওয়ায় কিছুটা ভালো লাগছে। আবার এখানে মানুষ সেবা নিতে আসবে, মা, নারী ও শিশুরা সেবা পাবে—এটা ভেবে ভালো লাগছে।’
১৯৭৪ সালে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাড্ডা এমসিএইচ–এফপি সেন্টারের কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছে। সংস্কার শেষে ভবনটি ব্যবহারের উপযোগী হলেও এখন কেন্দ্রটির সামনে পরবর্তী কাজ হলো প্রয়োজনীয় আসবাব, চিকিৎসার সরঞ্জাম ও অন্যান্য উপকরণ জোগাড় করে স্বাভাবিক সেবা কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা।