সরকারি সংগীত কলেজে কেবল ‘নেই আর নেই’

১৯৬৩ সালে সংগীতাচার্য পণ্ডিত বারীণ মজুমদারের হাত ধরে কলেজটির যাত্রাছবি: প্রথম আলো

স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শব্দবিজ্ঞান শব্দ গ্রহণ নামের একটি বিষয় পড়তে হয়। ১০০ নম্বরের এ বিষয়ের ব্যবহারিকের জন্য বরাদ্দ ৫০। তবে কলেজটির শব্দ ও সংগীতবিষয়ক ল্যাব বা অডিও রেকর্ডিং (শব্দ ধারণ) স্টুডিও কমপ্লেক্স চার বছর ধরে বন্ধ। শিক্ষার্থীদের মাঝেমধ্যে ল্যাবের তালা খুলে দেখিয়ে বলা হয়—এটি একটি স্টুডিও।

এ চিত্র দেশের একমাত্র সরকারি সংগীত কলেজের। সংগীতে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশেষায়িত এ কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য নেই প্রয়োজনীয় বাদ্যযন্ত্রসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত কোনো অডিটরিয়াম বা মিলনায়তন।

ভবনের নিচতলার একটি কক্ষকে মিলনায়তন হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে, সেখানে সাউন্ড সিস্টেম কাজ করে না। কলেজটিতে নেই পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক ও বাদ্যযন্ত্র। নেই সাংস্কৃতিক ভবন।

১৯৬৩ সালে সংগীতাচার্য পণ্ডিত বারীণ মজুমদারের হাত ধরে কলেজটি যাত্রা। ১৯৮৪ সালে কলেজটিকে সরকারি হয়। তবে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ৫ দশমিক ১ বিঘা আয়তনের জায়গায় চারতলা একটি ভবনে চলছে সংগীত কলেজের সব কার্যক্রম। কলেজটির মূল স্লোগান—সুর-জ্ঞান-আলো।

কলেজটির শব্দ ও সংগীতবিষয়ক ল্যাব বা অডিও রেকর্ডিং (শব্দ ধারণ) স্টুডিও কমপ্লেক্স চার বছর ধরে বন্ধ।
ছবি: প্রথম আলো

শিক্ষকেরা বলছেন, বিশেষায়িত হিসেবে কলেজটি কখনো সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। তাই বাজেট বরাদ্দ থেকে শুরু করে কোনো ক্ষেত্রেই বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে না। অথচ এ প্রতিষ্ঠান থেকেই তৈরি হয়েছেন দেশবরেণ্য শিল্পী, সুরকার। গুণী ব্যক্তিরা এখানে শিক্ষকতায় যুক্ত।

বর্তমানে কলেজটির শিক্ষার্থী ৪২৮ জন। এবারই প্রথম চার বছরের স্নাতক (সম্মান) শেষে শিক্ষার্থীরা স্নাতকোত্তরে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

সুর ভেসে আসে

গত ১১ সেপ্টেম্বর কলেজটির মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ল সবুজ মাঠ। গাছে গাছে সবুজ ক্যাম্পাস। নানা ফুল ফুটে আছে। শহীদ মিনারের লাল রঙের বেদিতে শিক্ষার্থীরা আড্ডার ছলে গান গাইছেন। সব মিলে মন ভালো করে দেওয়ার মতো পরিবেশ। তবে চারতলা ভবনটিতে ঢুকে চোখে পড়ে অযত্নের ছাপ।

শিক্ষকেরা জানালেন, মোট জনবলের মধ্যে অফিস সহকারী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ অফিস স্টাফ আছেন মাত্র ১২ জন। দুজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, এত বড় ভবনের একদিকে ঝাড়ু দিলে অন্যদিকে তাকানোর সুযোগ পান না। লম্বা টানা বারান্দা দিনের বেলাতেও অন্ধকার হয়ে আছে। গান ও বাদ্যযন্ত্রের রেওয়াজ করার কক্ষগুলোর দেয়াল ও ছাদ স্যাঁতসেঁতে। ভবনটির বিভিন্ন জায়গায় ভাঙা চেয়ার–টেবিল আবার কোথাও আবর্জনা পড়ে আছে।

সরকারি সংগীত কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের চাকরির বাজারের পরিসর তেমন বড় নয়।
ছবি: প্রথম আলো

অডিও রেকর্ডিং স্টুডিও কমপ্লেক্সের তালা খোলা হয় না বহু দিন। মাকড়সা জাল বিছিয়েছে। ১৯৯৮ সালে উদ্বোধন হওয়া স্টুডিওটির বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতে জমে আছে ধুলো। লাখ লাখ টাকার যন্ত্রগুলো এখন আর যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।

ভবনের চারতালায় ৩২ জন মেয়ে শিক্ষার্থী থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে হোস্টেলের অবস্থা আরও শোচনীয়। হোস্টেলের মূল কলাপসিবল গেটের সামনে দুটি বালতিতে ময়লা উপচে পড়ছে। মাছি ভনভন করছে। হোস্টেলের কক্ষগুলোও শ্রীহীন। ছেলে শিক্ষার্থীদের হোস্টেলে নেই।

নানা সমস্যার পরও চলছে শিক্ষার্থীদের সংগীতসাধনা
ছবি: প্রথম আলো

কলেজের গ্রন্থাগারটি বেশ বড়। সংগীতসহ বিভিন্ন বিষয়ের বই আছে ১০ হাজার ৮৭৬টি। তবে বইগুলোতেও অযত্নের ছাপ। সহকারী লাইব্রেরিয়ান রোখসানা আক্তারকে লাইব্রেরির পাশাপাশি হোস্টেলের দেখভাল করতে হচ্ছে। জানালেন, জনবলের অভাবে তাঁকেই লাইব্রেরির তালা খোলা থেকে শুরু করে সব কাজ করতে হয়।

পটুয়াখালীর রাখী কর্মকার স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি হোস্টেলে থাকেন। বললেন, মানিয়ে নিতে হচ্ছে। তবে এই শিক্ষার্থী হোস্টেলের অব্যবস্থাপনার চেয়েও অডিও রেকর্ডিং স্টুডিওটি দ্রুত চালুর ওর বেশি জোর দিলেন। তাঁর মতে, সংগীতের বিভিন্ন বিষয় হাতে-কলমে শিখতে পারছেন না বলে তেমন লাভ হচ্ছে না।

তবে এত সব সমস্যার মধ্যেও কোনো কক্ষ থেকে ভাটিয়ালির সুর, আবার কোনো কক্ষ থেকে তবলার ধা-ধিন-ধিন-ধা, কোনো কক্ষ থেকে নজরুল বা রবীন্দ্রসংগীতের সুর ভেসে আসছিল।

‘টানাপোড়েনের সংসার’

কলেজটির লোকসংগীত বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক (চুক্তিভিত্তিক) কমল খালিদ বললেন, ‘সংগীত কলেজটি হলো টানাপোড়েনের সংসার। পিয়ানো, কি–বোর্ড, ইউকেলেলি বা এ ধরনের আধুনিক বাদ্যযন্ত্র নেই। হারমোনিয়াম, তবলা যেগুলো আছে, তা মেরামত করে করে কাজ চালাতে হচ্ছে। কলেজের সাউন্ড সিস্টেম কাজ করে না। সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার নেই। তবে এত সমস্যার মধ্যেও স্বস্তির কথা হলো ছেলেমেয়েরা খুব ভালো গান গায় বা বাদ্যযন্ত্র বাজায়।’

সহকারী অধ্যাপক কমল খালিদ সংগীত কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তিনি বললেন, ‘আমরা সংগীতের জন্য ১২ জন চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছি। এখন সপ্তাহে আমাকে ২১টি ক্লাস নিতে হচ্ছে। কলেজে মাস্টার্স চালু হলে আমাদের চাপ বাড়বে। ৬২ জন শিক্ষকের পদ সৃষ্টির অনুমোদন দিয়েছে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ জরুরি।’

বর্তমানে কলেজটিতে  প্রদর্শক আছেন তিনজন। তবলা সংগতকার আছেন দুজন। আর বাংলা, ইংরেজি এ ধরনের বিষয় পড়ানোর জন্য শিক্ষক আছেন ১৪ জন।

সরকারের বরাদ্দ কম, নজর নেই

২০১৭ সালের মার্চ মাস থেকে কলেজটির অধ্যক্ষ অধ্যাপক কৃষ্টি হেফাজ। তিনি জানালেন, একাডেমিক ভবন ও মিলনায়তন নির্মাণ, জনবলসংকট সমাধানে নিয়োগ ইত্যাদি বিষয় প্রক্রিয়াধীন। স্টুডিওটি চালু করা জরুরি বলেও উল্লেখ করলেন তিনি।

কৃষ্টি হেফাজ বলেন, কলেজটি বিশেষায়িত কলেজ। ফলে সরকারের ২০০টি কলেজের কাজ একসঙ্গে করে ফেলতে পারলেও এ কলেজের কাজে সময় বেশি লাগে। সরকার মূলত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় কলেজের বরাদ্দ দিয়ে থাকে।

কলেজটির মোট বরাদ্দ বছরে মাত্র চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম, সে হিসেবে বরাদ্দ ঠিকই আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অন্যান্য কলেজে সরকার শিক্ষা উপকরণ হিসেবে চক, ডাস্টার দিচ্ছে। কিন্তু এ কলেজে শিক্ষা উপকরণ হচ্ছে স্টুডিও নির্মাণ, হারমোনিয়াম বা তবলা কেনা, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিন্তু সেই বিশেষ বরাদ্দ তো পাওয়া যাচ্ছে না।

সরকারি সংগীত কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের চাকরির বাজারের পরিসর তেমন বড় নয়। জাতীয় প্রচারমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই শিক্ষার্থীদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানালেন কৃষ্টি হেফাজ।

তাঁর মতে, এ কলেজে সরকার বিশেষ বরাদ্দ দিলে বা নজর বাড়ালে তা মূলত দেশের উপকারেই লাগবে। সংগীত গুরুমুখী বিদ্যা বলে এ নিয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা বিনয়ী, ভদ্র হয়। তাঁরা মাদক বা বিভিন্ন অস্থিরতা থেকে দূরে থাকে।

বারীণ মজুমদারের পরিবারের সদস্যদের আক্ষেপ

সংগীত কলেজের বিভিন্ন প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, পণ্ডিত বারীণ মজুমদার ও কয়েকজন মানুষের সহায়তায় কলেজটি মনোয়ারা কিন্ডার গার্টেনের (৬৮, কাকরাইল) শ্রেণিকক্ষে যাত্রা শুরু করে কলেজ অব মিউজিক নামে। শুরুতে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বারীণ মজুমদার।

শিক্ষকদের অনুদানেই মূলত চলত কলেজটি। সরকারি অনুদান পেতে কলেজ অব মিউজিকের পাশাপাশি খোলা হয় একাডেমি অব মিউজিক। কলেজটি সেগুনবাগিচা, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, গ্রিন রোডসহ বিভিন্ন ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত হয়। ১৯৮৪ সালে কলেজটি সরকারি হয়।

আগারগাঁওয়ের বর্তমান জায়গায় ক্লাস শুরু হয় ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় কলেজটি পুনরায় ভাড়া বাড়িতে স্থানান্তরিত করতে হয়। ১৯৯২ সালের শেষ দিক থেকে কলেজটি আবার আগারগাঁওয়ে নিজস্ব জমিতে ফিরে আসে।

পণ্ডিত বারীণ মজুমদারের ছেলে কণ্ঠশিল্পী বাপ্পা মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাবাকে কলেজ থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোসহ অনেক মন খারাপের ঘটনা ঘটেছে। চার বছর আগে প্রথমবারের মতো বাবার একটি ছবি কলেজে প্রদর্শনের জন্য রাখা সম্ভব হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো পণ্ডিত বারীণ মজুমদার সংগীত উৎসব করতে পেরেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।’

বাপ্পা মজুমদার বলেন, কলেজটির উন্নয়নে সরকারকে দীর্ঘদিন ধরেই বলা হচ্ছে, কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না। এটি জাতিগতভাবেও লজ্জার বিষয়। সরকার কলেজটির উন্নয়নে নজর না দিলে বা সরকার সংগীতকে গুরুত্ব না দিলে এ খাতের উন্নয়ন আশা করা যায় না।

যোগ্য অভিভাবক প্রয়োজন

অন্যান্য কলেজে যেভাবে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়, সেভাবেই সংগীত কলেজে এইচএসসি/আই মিউজে মানবিক ও সংগীত—এ দুই বিভাগে ভর্তি হয় শিক্ষার্থীরা। সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা বাংলা, ইংরেজি, তথ্যপ্রযুক্তি, উচ্চাঙ্গসংগীত, লঘুসংগীত (কণ্ঠ, বেহালা, তবলা), অর্থনীতি পৌরনীতি ও ইতিহাস—এ বিষয়গুলো পড়ছেন। আর মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা বাংলা, ইংরেজি এসব বিষয়ের সঙ্গে লঘুসংগীত পড়ছে। বেহালা বা তবলা নিয়েও পড়া যায়।

একাদশ প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১১৭ জন। দ্বিতীয় বর্ষে শিক্ষার্থী ১০০ জন। এরপর শিক্ষার্থীরা সংগীতের বিশেষ কোর্সে পড়াশোনা করেন। বাদ্যযন্ত্র নিয়ে পড়েন কেউ কেউ। অনেকে অন্য জায়গায় চলে যান।

কলেজটিতে ব্যাচেলর অব মিউজিকে (সম্মান) উচ্চাঙ্গসংগীত, নজরুলসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, লোকসংগীত, তালযন্ত্র (তবলা)—এই পাঁচটি কোর্স চালু রয়েছে।

কলেজটির জন্মলগ্ন থেকে জড়িত ছিলেন কণ্ঠশিল্পী খুরশীদ আলম। তিনি কলেজটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার আদৌ চায় কি না, কলেজটি ভালোভাবে চলুক, তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। কলেজের সার্বিক মানের যে অবস্থা, তা নিয়ে কথা বলতে লজ্জা লাগে।’ তিনি বলেন, কলেজটি সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য যোগ্য অভিভাবক প্রয়োজন।