বয়স ৪০ বছর পার হয়েছে, এমন নারীরা আড্ডায় হাসতে আর মন খুলে কথা বলতে এসেছিলেন। তবে একটা পর্যায়ে হাসির পাশাপাশি একেকজন জীবনের এমন সব গল্প বললেন, যা শুনে শুধু যিনি বলছিলেন, তিনি কাঁদলেন না, অন্যরাও চোখ মুছতে মুছতে ওই বক্তাকে জড়িয়ে ধরছিলেন।
সংগীতশিল্পী ফাহমিদা নবীর সঙ্গে গলা মিলিয়ে এই নারীরা গাইলেন ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে...।’
গতকাল শুক্রবার এ আড্ডা বসেছিল রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। আড্ডার আয়োজন করেছিল ‘মন জানালা’ নামের অনলাইনভিত্তিক একটি সামাজিক উদ্যোগ। এত দিন ফেসবুক গ্রুপে এই নারীরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, গতকাল ৭৫ জন নারী সরাসরি একত্র হয়েছিলেন আড্ডায়। একজন যখন ছবি তুলছিলেন, তখন একজন একজন করে পারলে ৭৫ জনই ছবি তুলতে হাজির হচ্ছিলেন। বয়স হয়েছে—এ কথাটাই ভুলে গিয়েছিলেন তাঁরা।
আড্ডার পাশাপাশি একেকজনের পরিচিতি, জীবনের গল্প বলা চলতে থাকে। প্রথমে অনেকেই নিজের কষ্টের কথাটি চেপে রেখেছিলেন, তবে একসময় আর থাকতে না পেরে বলেই দিচ্ছিলেন কষ্টের কথাটা। এই কষ্ট থেকে আবার যখন ঘুড়ে দাঁড়ানোর গল্প বলছিলেন, তখন হাততালির মাত্রাটা আরও বাড়ে। বক্তব্য দেওয়ার সময় সংগীতশিল্পী ফাহমিদা নবী যখন কাশছিলেন, তখন চার থেকে পাঁচজন লবঙ্গের কৌটা নিয়ে মঞ্চে হাজির হলেন। ফাহমিদা নবী বললেন, এভাবেই একজনের পাশে আরেকজনকে দাঁড়াতে হবে।
এই নারীরা রাজধানী, এমনকি কেউ কেউ গাজীপুরসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছেন। কেউ এসেছেন ছেলে বা মেয়ের শাশুড়িকে নিয়ে, কেউ এসেছেন শাশুড়ির সঙ্গে। আবার কেউ মা বা মেয়ের সঙ্গে এসেছেন। তবে বেশির ভাগই এসেছেন একা। বয়সের পার্থক্য ভুলে একসময় সেলফি তুলতে তুলতে একে অন্যের বন্ধু হয়ে গেলেন। প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিলেন, তাঁরা আজ থেকে বন্ধু হলেন।
মন জানালার সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হাসিবুল করিম জানালেন, তাঁরা দুই ভাই যখন নিজেদের চাকরি ও জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলেন, তখন দেখলেন তাঁদের মা আবিদা সুলতানা আস্তে আস্তে নিজেকে সবকিছু থেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন। জীবন নিয়ে স্বপ্ন দেখা বাদ দিচ্ছেন। অসুস্থ হচ্ছেন বেশি। মূলত নিজের মা–সহ অন্য মায়ের মন ভালো রাখার কথা চিন্তা করেই এমন একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার চিন্তা করেন। এ উদ্যোগে যুক্ত হন বর্তমানে মন জানালার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মৌসুমী মৌ।
সংগঠনটির উদ্যোক্তারা জানালেন, মন জানালা চল্লিশোর্ধ্ব নারীদের সংযোগ, বিকাশ ও অনুপ্রেরণার একটি প্ল্যাটফর্ম। থেমে যাওয়া নয়, সময় এখন এগিয়ে যাওয়ার। এটাই হচ্ছে মূল স্লোগান। এ প্ল্যাটফর্মটি কাজ করছে এ বয়সী নারীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, আর্থিক মুক্তির বিষয়ে। ভবিষ্যতে নারীদের ক্ষমতায়নেও কাজ করবে।
আলোচনায় ফাহমিদা নবী বলেন, ‘জীবন বৈচিত্র্যময়। সবার জীবনই আলাদা। প্রতিটি মানুষই জীবন নামক সিনেমার নায়ক–নায়িকা।’ তিনি জীবনের ১২টি বছর গান গাওয়া থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হওয়া এবং সেখান থেকে ঘুড়ে দাঁড়ানোর গল্পও বললেন। তাঁর পরামর্শ হলো, চারপাশের ফালতু মানুষের জন্য নিজের চোখের পানি নষ্ট করার কোনো মানে নেই। হাসতে হবে। সৎ ও সোজা পথে হাঁটতে হবে। সন্তানের কাছে মায়েরা কখনো যেন বোঝা না হন, সন্তানের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা যাতে না করেন, সে আহ্বানও জানালেন। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো জীবনে যা করতে ভালো লাগবে, তা–ই করতে হবে। কে কী বলল, তা ভেবে লাভ নেই।
গতকালের আড্ডায় উচ্চশিক্ষিত নারীরাও উপস্থিত ছিলেন। কেউ কেউ বড় বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন বা অবসরে গেছেন। কেউ কেউ ছিলেন হোটেল ব্যবসায়ীসহ উদ্যোক্তা। তবে কেউ কেউ উচ্চশিক্ষিত হওয়ার পরেও পরিবারের নিষেধাজ্ঞা বা সন্তানের জন্য চাকরি করতে পারেননি, ‘হাউস ওয়াইফ’ পরিচয় দিতে গিয়ে লজ্জা পাচ্ছিলেন। তবে মায়ের সঙ্গে আসা একজন বললেন, মায়েরা ত্যাগস্বীকার করেছিলেন বলেই সন্তানেরা আজ বড় বড় পেশায় আছেন। তাই হাউস ওয়াইফ পরিচয় লজ্জার নয়, এটা গর্বের। আড্ডা থেকেই সুপারিশ আসে, এই মায়েদের জন্য মন জানালা প্ল্যাটফর্ম থেকেই উদ্যোগ নেওয়ার।
আলোচনায় অভিনয়শিল্পী দীপা খন্দকার বলেন, ‘আমার বয়সও ৪০ বছর পার হয়েছে। কিন্তু মনে তো থাকে না।’ তিনি বলেন, ৪০ বছর কোনো বয়সই না। এখন নিজেকে সময় দিতে হবে। নিজেকে সুখী রাখতে হবে। হাসতে হবে। ইচ্ছে হলে সাজতে হবে। ভাবতে হবে জীবনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গাছ লাগিয়েছিলেন, তাতে ফল ধরেছে। এখন দায়িত্ব অনেকটাই শেষ। আর শরীরটা নিজের, অসুস্থ হলে সে কষ্টটা নিজের। তাই মনের যত্ন নিতেই হবে। মন ভালো থাকলে শরীরটাও ভালো থাকে।
রেজুভা ওয়েলনেস প্রতিষ্ঠানের কনসালট্যান্ট চিকিৎসক তাওহিদা রহমান বলেন, স্বাভাবিক নিয়মেই ৪০ বছর পার হলে ক্লান্তি বাড়তে থাকে। নিজের জন্য সময় বের করলেও অপরাধবোধ কাজ করে। তবে নিজের জন্য সময় বের করতেই হবে। একটু একটু করে নিজের ভালো থাকার জন্য বের করা সময়কে নিত্যদিনের রোজনামচার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
নিজের জীবনের গল্প বলতে গিয়ে ৪৭ বছর বয়সী তাওহিদা রহমান বলেন, তিনি চারটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন। ৪০ বছর বয়সে দ্বিতীয় সন্তানের মা হয়েছেন। তবে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত খাবার খাওয়া, ব্যায়াম করা, নিজের ত্বকসহ শরীরের প্রতি যত্নবান হওয়ার গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, ৩০ বছর বয়সে প্রথম সন্তানের জন্মের পর সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বিদেশে পোস্টগ্র্যাজুয়েশন করে এসেছিলেন। প্রথম সন্তানকে যেভাবে সময় দিয়েছিলেন, দ্বিতীয় সন্তানের বেলায় তা পারছেন না। এটাই স্বাভাবিক। এমন পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক হিসেবেই মেনে নিতে হবে। বিকেল থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত চলে এ আলোচনা ও আড্ডা।