সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ
এক হাতে ট্রলি ও অন্য হাতে তিন বছরের সন্তানকে নিয়ে হাঁটছেন লামিয়া
লামিয়া আক্তার এক হাতে টানছেন ট্রলি ব্যাগ, অন্য হাত দিয়ে ধরে আছেন তিন বছর বয়সী সন্তানকে। এভাবেই সন্তানকে নিয়ে তিনি ধানমন্ডি ২৭ নম্বর থেকে হাঁটছেন। ঘড়ির কাটায় বেলা আড়াইটা। তখন তাঁরা সায়েন্স ল্যাব মোড় পেরিয়ে টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সামনে। লামিয়ার কপাল থেকে ঘাম ঝরছে।
লামিয়া আক্তার জানান, রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে লালবাগে বাবার বাসায় যাচ্ছেন। কিন্তু ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের সামনে এলে বাস থেমে যায়। তারপর এই ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে হেঁটেই যাচ্ছেন। রিকশা নেননি কেন জানতে চাইলে লামিয়া প্রথম আলোকে বলেন, কোনো রিকশা যেতে রাজি হচ্ছে না। হাঁটা ছাড়া উপায় নেই।
কত দূর হাঁটবেন, তা জানতে চাইলে লামিয়া বলেন, ‘কষ্ট হচ্ছে খুব। কিন্তু কিছু তো করার নেই। সড়ক অবরোধের কথা জানলে ঘর থেকেই বের হতাম না।’
ঢাকার বড় সাতটি কলেজের জন্য প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশ জারির দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় ও মিরপুরের টেকনিক্যাল মোড় অবরোধ করেছেন ওই সব কলেজের অনেক শিক্ষার্থী।
সাতটি কলেজ হলো ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ ও তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাঁরা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘রাষ্ট্র তোমার সময় শেষ, জারি করো অধ্যাদেশ’, ‘আমি কে তুমি কে, ডিসিইউ ডিসিইউ’ ইত্যাদি।
শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধের কারণে মিরপুর সড়ক ও আশপাশের অন্যান্য সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের তৈরি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো মানুষ। গাড়ি না পেয়ে তাঁরা হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছেন।
ভোগান্তিতে পড়া মানুষদের কেউ হাসপাতালের উদ্দেশে বের হয়েছেন। কারও পরীক্ষা আছে। কেউ রাজধানীর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ব্যক্তিগত কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন।
মেয়ের পরীক্ষাটা খারাপ হবে ভেবে খারাপ লাগছে
আফরিন রহমান মেয়ে সারা রহমানকে নিয়ে স্কুটি চালিয়ে এসেছিলেন রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে। তাঁদের গন্তব্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বেলা দুইটায় সারার একটি পরীক্ষা। কিন্তু সায়েন্স ল্যাব মোড়ে আসতেই তাঁদের থামিয়ে দেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনকারীদের প্রবেশপত্র দেখানোর পরও তাঁদের স্কুটি নিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি। প্রায় ৪০ মিনিট অপেক্ষা করার পর সারা নেমে হেঁটে কাঁটাবন মোড়ে চলে যান। সেখান থেকে রিকশায় করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন।
তখনো সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন আফরিন রহমান। কিছুক্ষণ পর আন্দোলনকারীদের একজন এসে আফরিন রহমানকে যেতে দেন। ততক্ষণে তাঁর মেয়ে সারা রহমান চলে গেছেন।
যাওয়ার আগে আফরিন রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছু বলার নেই। খুব হতাশ লাগছে। পরীক্ষার আগে এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মেয়েকে আলাদা ছাড়তে হলো। এমন বিড়ম্বনা পোহানোর পর মেয়ের পরীক্ষা খারাপ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এমন দেশে আছি, কারও কাছে যে প্রতিকার পাব, সেই সুযোগও নেই।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা
অবরোধ চলাকালে বেলা দেড়টার দিকে উল্টো পথে সায়েন্স ল্যাব মোড়ে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের বহনকারী একটি বাস, তবে শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে সেটি আটকে যায়। এ সময় বাসটিতে থাকা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে বাসটি ছেড়ে দিলেও বাসটি ভাঙচুর করা হয়।
বাস ভাঙচুরের আগে বাসের এক শিক্ষার্থী নন্দন বর্মণ প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘আমরা সকালে এই পথে গিয়েছি। এখন ক্যাম্পাসে ফিরছিলাম। জানা ছিল না এখানে অবরোধ হবে। আমরা যাওয়ার জন্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে অনুরোধ করেছি, কিন্তু কোনোভাবেই আমাদের যেতে দেওয়া হচ্ছে না।’
বেলা সোয়া তিনটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অনুরোধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বাসটি ছেড়ে দেন। কিন্তু সায়েন্স ল্যাব মোড় ছেড়ে যাওয়ার সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বাসটিতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে বাসের কাচ ভেঙে যায়, তবে কেউ আহত হয়নি।
বাগ্বিতণ্ডার কারণ জানত চাইলে আন্দোলনরত ঢাকা কলেজের এক শিক্ষার্থী তামজিদ হোসেন বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনুরোধে আমরা বাসটি ছেড়ে দেই। কিন্তু যাওয়ার পথে তাঁরা আমাদের ব্যঙ্গ করে স্লোগান দেন। তাঁরা আমাদের আন্দোলন নিয়ে অপমান করেন। এতে শিক্ষার্থীরা ক্ষেপে তাঁদের ধাওয়া দেন।’
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করে আন্দোলন করছিলেন।