হাট বসানোর কারণে মেট্রো স্টেশনের ৩০ লাখ টাকার ক্ষতি

মেট্রো স্টেশনের নিচে হাট বসানোর কারণে গাছপালা, ফুলের বাগান, সুরক্ষা ব্যবস্থা (বেড়া) ও অন্যান্য সৌন্দর্যবর্ধনমূলক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।ফাইল ছবি

রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট বসানোর ফলে উত্তরা সেন্টার মেট্রোরেল স্টেশনের প্রায় ৩০ লাখ ২৫ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। কমিটির সদস্যরা আজ বৃহস্পতিবার উত্তর সিটি করপোরেশনের সচিব দপ্তরে প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারাদারের জমা রাখা জামানত থেকে এই ক্ষয়ক্ষতির অর্থ সমন্বয় করা হবে। এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রশাসকের দপ্তর থেকে দেওয়া হবে।

এই কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইজারাদারের অব্যবস্থাপনার কারণে মেট্রোস্টেশনের নিচের পরিবেশের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে গাছপালা, ফুলের বাগান, সুরক্ষাব্যবস্থা (বেড়া) ও অন্যান্য সৌন্দর্যবর্ধনমূলক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি এ ঘটনায় সরকার ও দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।

এ বছর ঈদুল আজহায় উত্তরার দিয়াবাড়িতে ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর-সংলগ্ন বউবাজার এলাকার খালি জায়গা হাটের জন্য ইজারা দিয়েছিল ঢাকা উত্তর সিটি। ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকায় এ হাটের ইজারা পেয়েছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শেখ ফরিদ হোসেন। নিয়ম অনুযায়ী ঈদের চার দিন আগে গত ২৪ মে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই হাট শুরু হয়।

ঈদের আগে দিন উত্তরা দিয়াবাড়ি হাট পরিদর্শনে আসবেন প্রতিমন্ত্রী—এমন খবর পাওয়ার পর হাট এলাকায় হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে জোরদার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম
ফাইল ছবি

হাট চালু হওয়ার পর দেখা যায়, হাটের নির্ধারিত স্থান ছাড়িয়ে উত্তরা সেন্টার মেট্রোস্টেশনের নিচেও গরু-খাসি নিয়ে বেচাকেনা শুরু হয়। বরাদ্দকৃত জায়গার বাইরে মেট্রোস্টেশনের নিচের সড়ক, ফুটপাত, সড়ক বিভাজক এবং আশপাশের খোলা জায়গাজুড়ে গবাদিপশুর হাট বসানো হয়।

হাট শুরুর পরদিন দুপুরে পরিস্থিতি পরিদর্শনে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে মেট্রোস্টেশনের নিচ থেকে ব্যবসায়ীদের সরিয়ে দেন। তবে এরপরও ব্যবসায়ীরা একইভাবে সেখানে পশু এনে বেচাকেনা করেন।

মেট্রোস্টেশনের নিচে এভাবে হাট বসানোর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ওই সময়ে ইজারাদার ব্যবসায়ীদের সরিয়ে দিতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেননি। বরং তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে দাবি করেন, মেট্রোস্টেশনের নিচের জায়গাটিও তাঁর ইজারা নেওয়া হাটের আওতাভুক্ত।

পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ঈদের আগের দিন বিকেলে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান জরুরিভাবে হাট পরিদর্শনে যান। তবে সেদিন মেট্রোস্টেশনের নিচে গরু-খাসি রেখে বেচাকেনার কোনো দৃশ্য দেখা যায়নি। তাদের যাওয়ার আগেই ওই এলাকার সড়ক, ফুটপাত, সড়ক বিভাজক এবং সৌন্দর্যবর্ধনমূলক স্থাপনাগুলোও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়।

ঈদের পর ৩ জুন অস্থায়ী পশুর হাটের কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আরিফুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিটি আজ তাঁদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

আরও পড়ুন

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাটের কারণে মেট্রোস্টেশনের নিচের এলাকায় গাছপালার ক্ষতি হয়েছে ১৯ লাখ ৩০ হাজার টাকার। নিরাপত্তা বেড়া বা ফেন্সিংয়ের ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া হাট শেষে সৃষ্ট ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতেও প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে শ্রমিকের মজুরি বাবদ আড়াই লাখ টাকা, যানবাহনের জ্বালানি খরচ ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা এবং প্রয়োজনীয় মালামাল কেনায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ মামুন-উল-হাসান প্রথম আলোকে বলেন, কমিটির প্রতিবেদনটি তাঁরা পেয়েছেন। এটি নথিভুক্ত করে সিদ্ধান্তের জন্য প্রশাসকের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

ক্ষতির অর্থ ইজারাদারের জামানত থেকে সমন্বয় করা হবে

মেট্রোস্টেশনের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ পুনরুদ্ধারে নতুন করে গাছপালা রোপণ করেছে সিটি করপোরেশন। ১১ জুন
ছবি: প্রথম আলো

আজ দুপুরে দিয়াবাড়ীর উত্তরা সেন্টার মেট্রোস্টেশনের নিচে গিয়ে দেখা যায়, নিচের সড়ক, ফুটপাত ও খোলা জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রয়েছে। সড়ক বিভাজক ও আশপাশের খোলা জায়গায় বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ও সৌন্দর্যবর্ধনকারী গাছ লাগানো হয়েছে। কোথাও কোথাও নতুন সবুজ ঘাসও গজিয়েছে। ফুলগাছগুলোতে ফুটেছে নানা রঙের ফুল। সিটি করপোরেশনের পানির গাড়ি দিয়ে কর্মীদের ওই সব গাছে পানি দিতেও দেখা যায়।

মেট্রোস্টেশনের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ পুনরুদ্ধারে সিটি করপোরেশন ইতিমধ্যে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নতুন করে গাছপালা রোপণ করেছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান।

প্রশাসক প্রথম আলোকে বলেন, হাট শুরুর আগেই সব ইজারাদারকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে ইজারার শর্ত ও নিয়মাবলি লঙ্ঘন করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওই সিদ্ধান্ত মোতাবেক কমিটির প্রতিবেদনে নির্ধারিত ক্ষতির অর্থ ইজারাদারের জমা রাখা জামানত থেকে সমন্বয় করা হবে।