ঢাকার এই ফুটপাতগুলোতে ১০০ টাকায় পাওয়া যায় ‘নিয়ম মানার হেলমেট’
দামে সস্তা হলেও এসব হেলমেট যাত্রীদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারে, তা নিয়ে রয়েছে শঙ্কা।
হলুদ স্কুটি নিয়ে নিউমার্কেট যাচ্ছিলেন জিহাদ আরমান (২৪)। স্কুটির পেছনে বন্ধু রাতুল হাসান (২৩)। জিহাদের মাথায় হেলমেট থাকলেও রাতুলের মাথায় ছিল না। সায়েন্স ল্যাব মোড়ের কিছুটা সামনে ফুটপাত ঘেঁষে স্কুটি থামালেন। ১০০ টাকায় ফুটপাত থেকে কিনলেন কালো রঙের একটি হেলমেট।
সায়েন্স ল্যাব ছাড়াও রাজধানীর কয়েকটি জায়গায় এভাবে ফুটপাতে বিক্রি হয় হেলমেট। এগুলো বেশ সস্তা।
রাজধানীতে মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন অনেক বেড়েছে। ট্রাফিক আইন অনুযায়ী চালকের সঙ্গে যাত্রীর মাথায়ও হেলমেট থাকতে হয়। নয়তো ট্রাফিক পুলিশ মামলা দিয়ে বসেন। তাই চলতি পথে কেউ পুলিশের মামলা থেকে বাঁচতে, কেউ চুরি যাওয়া থেকে রক্ষা পেতে কেনেন এসব হেলমেট। অনেকে আবার কেনেন কিছুটা কম দামে পাওয়ায়। দামে সস্তা হলেও এসব হেলমেট যাত্রীদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারে, তা নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। এ যেন কেবলই নিয়ম মানার হেলমেট।
জিহাদ জানালেন, তাঁর দুটি হেলমেটই ছিল। কয়েক দিন আগে একটি চুরি হয়ে যায়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভালো হেলমেট সঙ্গে রাখা একটু ঝামেলা। দামি হেলমেট চুরি হয়। এই কয়েক দিন আগেই আমার একটা চুরি হলো। পাঁচ মিনিটের জন্য রেখে গেছিলাম। এসে দেখি নাই। এগুলার সে ভয় নাই।’
সায়েন্স ল্যাব মোড়ের ফুটপাতের দোকানটির বিক্রেতা মোহাম্মদ বাচ্চু মিয়া (৪২)। ফুটপাতেই বিছিয়ে রাখেন রং–বেরঙের নানা হেলমেট। জানালেন, ঢাকা শহরে তিনিই প্রথম রাস্তায় হেলমেট বিক্রি শুরু করেন। ১০০ টাকা থেকে শুরু করে দুই হাজার টাকার হেলমেট রয়েছে তাঁর কাছে। দিনে ৪০ থেকে ৫০টি হেলমেট বিক্রি হয় বাচ্চু মিয়ার। জিঞ্জিরার বিভিন্ন কারখানা ও ভারত থেকে আসে এসব হেলমেট। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বেচাবিক্রি চলে তাঁর।
এর আগে কাপড়ের ব্যবসা করতেন তিনি। করোনা মহামারির সময় পড়েন বড় ক্ষতির মুখে।
বাচ্চু মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যবসায় লস (ক্ষতি) খাওয়ার পর ভাবলাম, এমন কিছু করি যাতে মানুষের উপকারও হয়, আর আমারও লস না হয়। ঢাকা শহরে আমিই প্রথম এইটা শুরু করি। সব ধরনের বাইকআলারাই আমার থেকে হেলমেট কেনে। কেউ মামলার ভয়ে কেনে, আবার কেউ কম দাম দেখে কেনে।’
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮–এর ধারা ৪৯–এর উপধারা ১–এর প্রথম অংশের চ–তে বলা হয়েছে, ‘চালক ছাড়া মোটরসাইকেলে একজনের অধিক সহযাত্রী বহন করা যাবে না। চালক ও সহযাত্রীকে যথাযথভাবে হেলমেট ব্যবহার করতে হবে। এই বিধান লঙ্ঘন করা হলে তা একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।’ এই অপরাধে অনধিক ৩ (তিন) মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ (এক) পয়েন্ট কাটা যাবে।
আসাদ গেটে ছয় মাস ধরে ফুটপাতে এভাবে হেলমেট বিক্রি করছেন হাসিবুর রহমান (৪৩)। ফুটপাতের রেলিংয়ে সারি করে সাজানো এসব হেলমেট। তিনি জানালেন, বেশির ভাগ ক্রেতা রাইড শেয়ারের বাইকার। তাঁরা যাত্রীদের জন্য কেনেন।
হাসিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার কেনার থেকে ২০–৩০ টাকা লাভ হইলে দিয়ে দিই। এই দামে দোকানে দিতে পারে না। তদের তো দোকানের একটা খরচ আছে। কিন্তু আমার কাছে তো এইগুলো নাই। আমার কাছে এখন চার–পাঁচ ক্যাটাগরির হেলমেট আছে। আর মাঝে মাঝে বেশিও থাকে। একেকটা একেক দামের। ১২০, ২০০, ২৫০, ৩০০, ৪০০—এ রকম দাম।’
মিরপুর–১০ গোলচত্বরে কথা হয় রাহাতের (২৮) সঙ্গে। তিনি রাইড শেয়ার করেন। কথায় কথায় জানালেন, হেলমেট ফুটপাত থেকেই কেনেন। খুব যে কম দাম, তা না। শোরুম থেকে ২০ টাকা হয়তো কম। কিন্তু ওই অনেক সময় ভুলে সঙ্গে নেওয়া হয় না। তখন কিনতে হয়। হেলমেট ছাড়া চলা যায় না।
মোটামুটি বিক্রি হলেও ব্যবসাটি খুব লাভজনক নয়। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সামনের ফুটপাতে হেলমেট নিয়ে বসতেন শাহজাহান কবির। মুঠোফোনে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। জানালেন, দুই সপ্তাহ হলো আর বসছেন না। তিনি বলেন, ‘ব্যবসা বন্ধ করে দিছি। ব্যবসা ভালো হয় না। পাঁচ–সাতটা বিক্রি হয়। ও দিয়ে পোষায় না।’