‘হাফপ্যান্ট পরছোস ক্যান, পাজামা নাই’ বলেই কিশোরকে আক্রমণ

প্রতীকী ছবিএআই দিয়ে তৈরি

স্কুলে ফুটবল টুর্নামেন্ট হবে। জার্সি আর শর্টস বা হাফপ্যান্ট পরে স্কুলের কাছের মাঠে কয়েক দিন ধরে প্র্যাকটিস করছে স্কুলছাত্ররা। তত্ত্বাবধান করছেন স্কুলেরই শিক্ষক। তারা রাজধানীর লালমাটিয়ার একটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের ছাত্র। এর মধ্যে কয়েক ছাত্র পাশেই কোচিং সেন্টারে ক্লাস করে। হাতে সময় কম থাকায় প্র্যাকটিস শেষে সরাসরি হাফপ্যান্ট-জার্সি পরেই চলে যায় কোচিং সেন্টারে।

গত বুধবার এক কিশোরও (১৬) সেভাবেই প্র্যাকটিস শেষে বন্ধুদের সঙ্গে চলে গিয়েছিল কোচিংয়ের ক্লাসে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ক্লাস থেকে বের হয়ে কিছুদূর যাওয়ার পরই কিশোরের মাথার পেছনে হঠাৎ করেই কেউ একজন চাঁটি মারেন। কিশোরটি অবাক হয়ে পেছনে ফিরে দেখে ২২ থেকে ২৩ বছরের অচেনা দুই তরুণ। তাঁরা মারমুখী হয়ে ওঠেন, একজন জিজ্ঞাসা করেন, ‘এই তুই হাফপ্যান্ট পরছোস ক্যান? তোর বাড়িতে পাজামা নাই?’ কিশোর জানায়, সে ফুটবল প্র্যাকটিস করে ক্লাসে গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ওই দুই তরুণ গালাগালি করে কিশোরের ওপর আক্রমণ করেন।

ওই কিশোরের এক স্বজন ঘটনাটি তুলে ধরে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। পরে যোগাযোগ করা হলে প্রথম আলোর কাছে পুরো ঘটনা তুলে ধরেন কিশোরের মা। তিনি একসময় সাংবাদিকতা করতেন। স্বামী ব্যবসায়ী। তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে ওই কিশোর দ্বিতীয়। ইংরেজি মাধ্যমের ওই স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে। ধানমন্ডিতে পরিবারটি বাস করে। কিশোরের মা বলেন, হাফপ্যান্ট পরার কারণে তাঁর ছেলের ওপর হামলা করা হয়েছে, এটা মেনে নিতে তাঁর কষ্ট হচ্ছে। তাঁর ছেলেও ট্রমাটাইজড (বিষাদগ্রস্ত) হয়েছে।

দেশে এখন একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যারা এখন আধিপত্যবাদী ও বলিষ্ঠ গোষ্ঠী, তারা তাদের পছন্দকে জোরজবরদস্তি করে চাপিয়ে দিতে চাইছে।
—অধ্যাপক মনিরুল আই খান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাবি

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ওই নারী বলেন, গত ডিসেম্বর মাসে স্কুলে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা হয়েছে। ফলে কোচিংয়ের কিছু ক্লাস করা হয়নি তাঁর ছেলেসহ কয়েক ছাত্রের। কোচিংয়ে সেই ক্লাসগুলো করানো হচ্ছিল। স্কুল, কোচিং সেন্টার ও খেলার মাঠ একই গলিতে। ঘটনার দিন তাঁর ছেলে দুপুরে খেয়ে বেলা পৌনে ৩টার দিকে বাসা থেকে বের হয়। মাঠে ফুটবল প্র্যাকটিস ছিল বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। আর ক্লাস ছিল বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। তাঁর ছেলে কোচিং শেষে যখন গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিল, তখনই আক্রান্ত হয়।

কিশোরের মা বলেন, তাঁর ছেলেকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘হাফপ্যান্ট পরছোস ক্যান?’ তখন তাঁর ছেলে বলেছিল, ‘চাচ্চু, আমি খেলে এসেছি। সরাসরি কোচিংয়ে গেছি।’ ওই সময় তরুণেরা রেগে ওঠেন। ‘পাবলিক প্লেসে (জনসমাগমস্থল) কেন হাফপ্যান্ট পরলি? জানস না পাবলিক প্লেসে হাফপ্যান্ট পরা যায় না?’ এই বলে দুই তরুণের একজন তাঁর ছেলের জার্সি ঘাড় বরাবর এত জোরে টেনে ধরেন যে গলায় দাগ পড়ে গেছে, জার্সি সামনে ঝুলে গেছে। ওই সময় ছেলেকে আরেক তরুণ মারতে উদ্যত হলে তাঁর ছেলে ঘুষি মেরে প্রতিরোধ করে এবং দৌড় দেয়। ওই দুই তরুণও তাকে ধাওয়া করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু ওই সময় কোচিং থেকে আরও কয়েকটি ছেলে বেরিয়ে এলে হামলাকারী তরুণেরা উল্টো দিকে দৌড় দেন।

কিশোরের মা বলেন, ছেলে তার বাবাকে কল দেয় সঙ্গে সঙ্গে। ঠিক ওই সময় তার বাবা অফিস থেকে রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন। লালমাটিয়ার কাছাকাছি ছিলেন। এক মিনিটের মধ্যে তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছান ও ওই বাইকে করেই যেদিকে তরুণেরা দৌড়ে গিয়েছিলেন, সেদিকে যান। কিন্তু ততক্ষণে তরুণেরা পালিয়ে যান। ছেলেটির বাবা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ধানমন্ডির তাঁরা আদি বাসিন্দা। এখানেই তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। কিন্তু এত বছরেও এই এলাকায় হাফপ্যান্ট পরার জন্য হামলা করার ঘটনা তিনি কখনো দেখেননি।

কিশোরের মা বলেন, তিনি খুব বিষণ্ন বোধ করছেন এ ঘটনায়। বারবার খালি ভাবছেন, এটা কোন দেশে বাস করছেন! ছেলেমেয়েকে বাইরে পাঠিয়ে সারাক্ষণ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভুগতে হবে! একই সঙ্গে ভীতও হয়েছেন। এরপর ছেলে ফুটবল প্র্যাকটিসে যাওয়ার সময় তার ব্যাগে পাজামা দিয়ে দিয়েছেন। ছেলে তার বাবাকে প্রশ্ন করেছে, ‘বাবা, হাফপ্যান্ট পরা কি ক্রাইম (অপরাধ)?’

‘নিজেদের পছন্দ চাপিয়ে দিতে জুলুমবাজি’

দেশে গত দেড় বছরে পোশাকের কারণে নারীদের আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের ক্যানটিনে কর্মীদের হাফপ্যান্ট পরা নিয়েও একটি গোষ্ঠীর আপত্তি তোলার খবর আলোচনায় এসেছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল আই খান প্রথম আলোকে বলেন, দেশে এখন একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যারা এখন আধিপত্যবাদী ও বলিষ্ঠ গোষ্ঠী, তারা তাদের পছন্দকে জোরজবরদস্তি করে চাপিয়ে দিতে চাইছে। নানা অজুহাতে অন্যের স্বাধীনতা হরণ করে নিজেদের পছন্দ চাপিয়ে দিতে জুলুমবাজি করছে।

‘যে হাফপ্যান্ট পরছে, সে তো পাজামা পরা কাউকে হাফপ্যান্ট পরতে বাধ্য করছে না—সে উপলব্ধিও ওই গোষ্ঠীর নেই,’ বলেন তিনি।

অধ্যাপক মনিরুল খান বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক সংকট তৈরি করে। একটি সমাজে ভিন্ন ভিন্ন চিন্তার মানুষের মধ্যেও সংহতি থাকে। এই চর্চা না থাকলে তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের দায় সরকার ও সমাজের মানুষের রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা মোকাবিলায় সরকারকে চুপ করে থাকা যাবে না, শক্ত ভূমিকা পালন করতে হবে।