আধুনিক পদ্ধতিতে বীজ আলু উৎপাদনের এক প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজধানীর গাবতলী এলাকায় জলাধার ভরাট করছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। ইতিমধ্যে বালু ও মাটি ফেলে প্রায় ৩৬ বিঘা (১২ একর) জলাধার ভরাট করে ফেলা হয়েছে।
ভরাটকৃত এ জায়গা ঢাকা মহানগরের নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) অনুযায়ী জলাধার হিসেবে চিহ্নিত। আর আইন বলছে, প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গা ভরাট করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
এদিকে জলাধার ভরাট করা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, জলাধার ভরাটে শহরে জলাবদ্ধতা হবে। এতে দুর্ভোগে পড়বে নগরবাসী। তবে বিএডিসি আইন, মহাপরিকল্পনা, আপত্তি—কিছুই তোয়াক্কা করছে না।
বিএডিসি কোনোভাবেই ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে জলাধার ভরাট করতে পারে না জানিয়ে নগর–পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, সরকারি একটি সংস্থা যখন আইন অমান্য করে, মহাপরিকল্পনা মানে না, আরেকটি সরকারি সংস্থার (ডিএনসিসি) আপত্তি অগ্রাহ্য করে, তখন বোঝা যায় যে রাষ্ট্রব্যবস্থা ঠিকমতো চলছে না।
আইন অনুযায়ী অবৈধ
‘প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণ আইন ২০০০’ অনুযায়ী প্রাকৃতিক জলাধার হচ্ছে নদী, খাল, বিল, দিঘি, ঝরনা বা জলাশয় হিসেবে মহাপরিকল্পনায় চিহ্নিত বা সরকারের গেজেটে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বন্যাপ্রবাহ এলাকাঘোষিত কোনো জায়গা এবং পানি ও বৃষ্টির পানি ধারণ করে এমন কোনো ভূমি।
ঢাকা শহরের পানি অপসারণের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা কল্যাণপুর জলাধার। এটি ভরাট হলে পানি নামার জায়গা পাবে না। ফলে জলাবদ্ধতায় নগরবাসীর দুর্ভোগ বাড়বে।সেলিম রেজা, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ঢাকা উত্তর সিটি
আইনে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। এ ধরনের জায়গা অন্য কোনোভাবেও ব্যবহার করা যাবে না এবং ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা যাবে না। আইন ভাঙলে জরিমানা করা হবে।
বিএডিসি যা করছে
বিএডিসির কর্মকর্তারা জানান, তাঁদের প্রকল্পের নাম ‘জীব প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষি বীজ উন্নয়ন ও বর্ধিতকরণ প্রকল্প’। এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য আলুর অনুচারা উৎপাদন করে বীজ আলুতে আমদানি নির্ভরতা কমানো ও বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার হ্রাস করা।
মিরপুর বীজ উৎপাদন খামারের (গাবতলী) জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক কামরুল হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, ১২ একর জায়গা ভরাট করা হয়েছে। সেখানে উচ্চপর্যায়ের গবেষণাকাজ হবে। জীব প্রযুক্তির মাধ্যমে আলুর বীজ উৎপাদন করা হবে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, মূলত টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে ভাইরাসমুক্ত উন্নত মানের আলুবীজ উৎপাদন করা হবে এ প্রকল্পের আওতায়। এ ছাড়া উদ্যান জাতীয় ফসলের অনুচারাও উৎপাদন করা হবে। পাশাপাশি সিড হেলথ ও মলিকুলার ল্যাবরেটরিতে বীজের রোগ শনাক্তকরণ এবং বিএডিসির বিভিন্ন ফসলের মান বিশ্লেষণ, বিশুদ্ধকরণ, উন্নয়ন ও জার্মপ্লাজম সংরক্ষণের কাজ করা হবে।
উত্তর সিটির আপত্তি
বিএডিসির জমিতে ভারী স্থাপনা নির্মাণ না করতে গত ২৯ মার্চ সংস্থাটিকে চিঠি দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্তৃপক্ষ। এটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, গাবতলী বেড়িবাঁধ ও কল্যাণপুর জলাধারসংলগ্ন বিএডিসির প্রায় ১১৭ একর জায়গা ড্যাপের নকশা অনুযায়ী জলাধারের আওতাভুক্ত। সেখানে ভারী স্থাপনা হলে জলাধারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে।
এ ছাড়া জলাধারে কোনো ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করার ক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ছাড়পত্র গ্রহণের বাধ্যবাধকতা আছে। তাই বিএডিসিকে ওই জায়গায় ভারী স্থাপনা নির্মাণ করা থেকে বিরত থাকতে ও ড্যাপের নীতিমালা অনুযায়ী তা জলাধার হিসেবে বজায় রাখতে পদক্ষেপ নিতে বলা হয় চিঠিতে।
সেলিম রেজা প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা শহরের পানি অপসারণের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা কল্যাণপুর জলাধার। এটি ভরাট হলে পানি নামার জায়গা পাবে না। ফলে জলাবদ্ধতায় নগরবাসীর দুর্ভোগ বাড়বে।
ভরাটের কাজ চলমান আছে জানানো হলে সেলিম রেজা বলেন, সরকারি একটি সংস্থার সঙ্গে তো যুদ্ধ ঘোষণা করা যায় না। এ প্রক্রিয়ার ভেতরেও জলাধার ভরাট করলে মেয়র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। প্রয়োজনে এটি সরকারের উচ্চপর্যায়ে নেওয়া হবে।
ভরাট প্রায় শেষ
জলাধারটি যেখানে ভরাট করা হচ্ছে, সেটি গাবতলীতে বিএডিসির সেন্ট্রাল টিস্যু কালচার ও সিড হেলথ ল্যাবরেটরির উল্টো পাশে। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বালু ভরাটের কাজ শেষ। এখন বালুর ওপর মাটির স্তর দেওয়া হচ্ছে। খননযন্ত্রের মাধ্যমে করা হচ্ছে মাটি সমান করার কাজ।
এ ছাড়া জলাধারের ভরাটকৃত জায়গার দুই পাশে লাগানো হয়েছে ধান। এক পাশে গৈদারটেক এলাকা, অন্য পাশে গাবতলী থেকে মানসুরাবাদ যাওয়ার রাস্তা ও বিএডিসির টিস্যু কালচার ল্যাব।
আবার ভরাটকৃত জায়গার এক পাশে টিনের ছাউনি ও বেড়া দিয়ে একটি অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। ভরাটের পর জায়গাটি মাঠের মতো হওয়ায় স্থানীয় কিশোর-যুবকেরা সেখানে ক্রিকেট খেলছেন।
বেদখল অর্ধেকের বেশি
ঢাকা উত্তর সিটির সম্পত্তি বিভাগের হিসাবে, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বৃষ্টির পানিনিষ্কাশনে ঢাকা ওয়াসা তাদের ৫৩ একর জায়গা হস্তান্তর করেছে। করপোরেশনের নিজের আছে ৫২ একর।
এদিকে কল্যাণপুর জলাধারের পাশে বিএডিসির জায়গা আছে প্রায় ১১৭ একর। ড্যাপের নকশা অনুযায়ী এটি জলাধারেরই অংশ। বর্ষায় পুরো এলাকা পানিতে ডুবে যায়, যা নগরী থেকে খাল ও নালার মাধ্যমে নিষ্কাশিত হওয়া পানি ধারণ করে।
উত্তর সিটির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহে আলম প্রথম আলোকে বলেন, কল্যাণপুর জলাধারের অর্ধেকের বেশি জায়গা বেদখল হয়ে আছে। খাল ও জলাধারের সীমানা নির্ধারণ প্রকল্পের আওতায় সীমানা খুঁটি বসানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে জায়গা উদ্ধার করা হচ্ছে।
সর্বশেষ গত ২০ মার্চ এক অভিযান চালিয়ে জলাধারের এক একর জায়গা দখলমুক্ত করা হয়। এ ছাড়া জলাধারের জায়গায় গড়ে ওঠা প্রায় ৩০টি দোকান, ২০টি বস্তিঘর ও দুটি রিকশার গ্যারেজসহ অবৈধ মালপত্র উচ্ছেদ করা হয়।
গত বছরের জলাবদ্ধতার অবস্থা
ভারী বর্ষণে নগরবাসী কেমন জলাবদ্ধতার শিকার হন, তার সর্বশেষ উদাহরণ গত অক্টোবর মাসের শেষে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে হওয়া বৃষ্টি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ওই সময় ঢাকায় ২৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। বৃষ্টি থামার প্রায় ২০ ঘণ্টা পরও জলাবদ্ধ ছিল কল্যাণপুর জলাধার এবং যে খাল হয়ে সেখানে পানি নামে, এর আশপাশের এলাকা।
এসব এলাকা হলো মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয় হাউজিং, মোহাম্মদিয়া হোমস, নবোদয় হাউজিং, শ্যামলী হাউজিং, মনসুরাবাদ হাউজিং, গাবতলী সিটি কলোনি ও গৈদারটেক এলাকা। এসব এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর পানি জমে ছিল। জলাধারে বৃষ্টির পানির ধারণক্ষমতা কমে যাওয়াই এর কারণ বলে জানান সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।
এদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ঢাকা থেকে গড়ে ৫ হাজার ৭৫৭ একর জলাভূমি হারিয়ে গেছে।
‘প্রহসনের শামিল’
ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, বিএডিসি কোনোভাবেই জলাধার ভরাট করতে পারে না। কারণ, সিটি করপোরেশন নিষেধ করছে। সরকারের আইন আছে। অর্থ ব্যয় করে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাও করা হয়েছে। তারপরও তারা ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখার বিষয়গুলো না মানলে এটা প্রহসন।
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ২০০০ সালের জলাধার আইনে স্পষ্টভাবে জলাধার ও জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না, বলা আছে। ড্যাপ করা হয়েছে। এরপরও চোখের সামনে তারা জলাধার ভরাট করছে। ফলে ঢাকা আরও বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। সরকারি সংস্থা আইন অমান্য করার কারণেই আবাসন প্রতিষ্ঠানও জলাধার ভরাটের সাহস পায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্য সরকারি সংস্থাও জলাধার ভরাট করছে উল্লেখ করে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘শহরকে বাসযোগ্য করার দায়িত্ব পালনে কেউ আগ্রহী নন; বরং সবাই ভাবে, আমি ভরাট করলে কিছু হবে না। অথচ সাম্প্রতিক দুর্যোগগুলো ইঙ্গিত করছে, জলাধার আমাদের কেন দরকার।’
জানতে চাইলে বিএডিসির চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ সাজ্জাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়ে জানা নেই। তাই এ নিয়ে আমি স্পেসিফিক (নির্দিষ্ট করে) উত্তর দিতে পারব না।’ বিষয়টি নিয়ে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে বলেন তিনি।
বিএডিসির ওই প্রকল্পের পরিচালক এ বি এম গোলাম মনছুর। বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।