‘আমরা গরিব মানুষ বাবা, আমাদের তো কাজ করি খাতি হবি’
রোববার দুপুর, ঈদুল ফিতরের পরদিন। বেশির ভাগ মানুষ যখন নতুন পোশাক পরে, ভালো খাবার খেয়ে পরিবার-স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটাতে ব্যস্ত, তখন রাজধানীর বিভিন্ন সড়কেই যাত্রী নিয়ে ছুটছেন পায়ে চালিত রিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকেরা। কারণ, জীবিকার তাগিদের কাছে ঈদের আনন্দ তাঁদের কাছে চাপা পড়ে যায়।
রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় বেলা আড়াইটার দিকে কথা হয় ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। মাথায় গামছা বাঁধা, পরনে পুরোনো শার্ট ও লুঙ্গি। ঈদের মধ্যে কেন বের হয়েছেন, জানতে চাইলে বলেন, গাড়ি ভাড়া না থাকায় বাড়িতে যেতে পারেননি। ঈদের আগে যা টাকা ছিল, তার সবটাই বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিছু টাকা জমলে আরও কয়েক দিন পর বাড়িতে যাবেন।
দুই মেয়ে, দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে সংসার রফিকুল ইসলামের। বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলায়। ঢাকায় তেজকুনিপাড়া এলাকায় থাকেন। তিনি ঢাকায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে রিকশা চালান। দিনে ৪০০ টাকায় ভাড়ায় একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান। মাসে বা দুই মাসে একবার বাড়িতে যান বলেও জানান তিনি।
রফিকুল ইসলামের রিকশা থেকে কয়েক গজ দূরে যাত্রীর অপেক্ষা দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক রিকশাচালক আবদুল বারেক মিয়া। পুরোনো শার্টের সঙ্গে নতুন লুঙ্গি পরেছেন, তবে তাঁর শরীরজুড়ে ক্লান্তির ছাপ। ঈদ কেমন কাটল, এমন প্রশ্নে আবদুল বারেক মিয়া কিছু সময়ের জন্য নীরব থাকেন। একপর্যায়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রিকশা না চালালে তো আর আয় হবে না। সে জন্য বের হয়েছেন।
দুই মেয়ে ও এক ছেলে আবদুল বারেকের। শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে তাঁর বাড়ি। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। এখন ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে থাকেন স্ত্রী। আবদুল বারেক বলেন, ঈদে যেতে পারেননি। সামনের পয়লা বৈশাখে যাবেন।
ফার্মগেট থেকে কিছুদূর এগিয়ে কারওয়ান বাজার এলাকায় কথা হয় আরেক ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক হামিদ মণ্ডলের সঙ্গে। পরনে পাঞ্জাবি–লুঙ্গি আর কোমরে গামছা বাঁধা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঈদে বাড়ি যাওয়া হয়নি, সে জন্য বের হয়েছি। বসে থাকলে তো আর টাকা আসবে না।’
ঢাকার মগবাজার এলাকায় থাকেন হামিদ মণ্ডল। আর তাঁর স্ত্রী ও সন্তানেরা থাকেন জয়পুরহাটে। ঈদের কয়দিন রিকশা চালানো শেষে বাড়িতে যাবেন বলে জানান তিনি। যাত্রী কম থাকে উল্লেখ করে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, রাস্তা ফাঁকা থাকলেও যাত্রী কম থাকে। অনেকে বাসায় থাকেন, আবার কেউ কেউ নিজের গাড়িতে চলেন। তাই তেমন যাত্রীও পাওয়া যায় না।
হামিদ মণ্ডলের সঙ্গে কথা বলার সময়ই কৌতূহলী হয়ে শুনতে আসেন আরেক রিকশাচালক মো. রঞ্জু। তখন কথা হয় তাঁর সঙ্গেও। ৫৫ বছর বয়সী এই প্রবীণ বলেন, ঈদে গাড়ির ভাড়া অনেক বেশি থাকে। তাই বাড়ি যাননি। ঈদের মধ্যেও কেন বের হয়েছেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ বাবা, আমাদের তো কাজ করি খাতি হবি।’
মাত্র ১৮ বছর বয়সেই জন্মস্থান বগুড়া ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আসেন মো. রঞ্জু। ঈদুল ফিতর কেমন কাটল, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তেমন যাত্রী নেই। সবাই ঈদের মধ্যে বাড়ি চলে গেছেন। সদরঘাট থেকে খালি রিকশা নিয়ে এখানে এসেছেন।
গল্প–আলাপে রঞ্জু মিয়া জানালেন তাঁর জীবনের গল্প। অর্থকষ্টেই তিনি ঢাকায় আসেন। পায়ে চালিত রিকশার পাশাপাশি কখনো কখনো কারওয়ান বাজারে কলার আড়তে কাজ করেন তিনি। এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে বগুড়ায় থাকেন তাঁর স্ত্রী। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলে এখনো পড়াশোনা করছেন। রঞ্জু মিয়ার জীবনের গল্প বলতে আছে কেবলই হতাশা আর না পাওয়ার আক্ষেপ। প্রথম আলোকে বললেন, ‘অর্থকষ্টেই জীবন কাটল।’ এখন আর আগের মতো রিকশা চালাতে পারেন না বলেও জানান তিনি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, এমন অনেক রিকশা ও অটোরিকশাচালক ঈদের পরদিনও রাস্তায় বের হয়েছেন। কেউ পরিবারের জন্য, কেউ গ্যারেজের জমা দেওয়ার জন্য, কেউবা শুধু দৈনিক আয় নিশ্চিত করতে। তাঁদের কারও কাছে ঈদ মানে দিন শেষে হাতে কিছু টাকা থাকা, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো।