ছয়জনের জন্য ২ হাজার টাকা নিয়ে ঈদবাজারে তাঁরা

ছোট শিশুর জন্য কারওয়ান বাজারে জুতা কিনছে এই পরিবার। গতকাল রোববার কারওয়ান বাজারেছবি: নাজনীন আখতার

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ২ নম্বর সুপারমার্কেটে ঢোকার পথে জুতার কয়েকটি অস্থায়ী দোকান। সেখানে দাঁড়িয়ে দুই শিশুকে নিয়ে জুতা দেখছিলেন দুজন নারী। বয়স্ক এক নারীর কোলে কয়েক মাস বয়সী এক ছেলেশিশু। তার চেয়ে কম বয়সী আরেক নারীর পাশে দাঁড়িয়ে আছে ১০–১১ বছরের একটি মেয়ে।

ওই নারী জুতা নামিয়ে ছোট মেয়েটিকে পরাচ্ছিলেন। নিজেও কিছু জুতা পরছিলেন। কোন জুতাটা কিনলে ভালো হয়, পাশ থেকে বলছিলেন বয়স্ক নারী।

গতকাল রোববার এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা হয় তাঁদের। জানতে চাইলে বয়স্ক নারী জানালেন, তাঁর নাম রাহিমা। সঙ্গে বড় ছেলের বউ আঁখি ও দুই নাতি-নাতনি। তাঁরা বেগুনবাড়িতে সিদ্দিক মাস্টারের ঢালে ভাড়া থাকেন। ঈদের কেনাকাটার জন্য এসেছেন।

এই পরিবারের বাজেট দুই হাজার টাকা। পরিবারের সদস্যসংখ্যা ছয়। বাজার ঘুরে দেখেছেন, বড় ছেলের দেওয়া এই টাকায় পরিবারের সবার হবে না। তাই আগে দুই শিশুর জন্য কেনা চলছে।

রাহিমা যখন কথা বলছিলেন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে, তখন আঁখি দোকানির সঙ্গে জুতার দর–কষাকষি নিয়ে ব্যস্ত। রাহিমা বললেন, তাঁর স্বামী ১২-১৩ বছর আগে মারা গেছেন। বড় ছেলে উমর হোসেন একটি রিকশার গ্যারেজে কাজ করেন। বেতন পান ৬ হাজার টাকা। ছোট ছেলে কিশোর বয়সী। মাত্র ১৬ বছর বয়স। অভাবের কারণে কিশোর ছেলেকেও কাজে দিয়েছেন। একটা অফিসে পিয়নের কাজ করে, বেতন পায় ১০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ছোট ছেলে এখনো বেতন পায়নি।

কি কেনাকাটা করেছেন জানতে চাইলে রাহিমা বলেন, ‘সবার জন্য তো আর হইব না। সবার বাজার করমু কইত্তোনে। জুতা দেখতাছি। নাতি-নাতনির জন্য জুতা কিন্যা যা থাকে! দুই হাজার টাকার বাজার, আরকি! বোঝেন না! এটা তো আর পোলাপান বোঝে না। আমি বলছি আমার জন্য কিছু লাগব না।’

মেয়ের জন্য বোরকা কিনছেন এই মা। গতকাল রোববার কারওয়ান বাজারে
ছবি: নাজনীন আখতার

শিশু দুটির মা আঁখি বলেন, ‘জামা এখনো কিনি নাই। আল্লাহ দেখি সামর্থ্য কতটুকু রাখছে। ওদের (দুই শিশু) জন্য হইলেই হবে। আমার জন্য লাগবে না।’ জানালেন, নিজের জন্য এই দোকান থেকে দেড় শ টাকা দিয়ে এক জোড়া স্যান্ডেল কিনেছেন। আরেকটা দোকান থেকে মেয়ের জন্য উঁচু হিলের ভালো জুতা কিনেছেন। ৫০০ টাকা দাম নিয়েছে। মেয়ে লেহেঙ্গা কিনতে চায়। লেহেঙ্গার সঙ্গে উঁচু হিলের জুতা পরতে চায়। জুতা হলো। জামা হবে কি না, জানেন না এই মা।

জুতা কিনতেই পরিবারটির ঈদের বাজেট দুই হাজার টাকার তিন ভাগের এক ভাগ শেষ হয়ে গেছে। যে দোকানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখান থেকে স্বামী-শাশুড়ি আর ছোট সন্তানের জুতা কেনা যাবে কি না, দেখছেন আঁখি।

কারওয়ান বাজারের ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, দোকানে দোকানে পরিবারগুলো ঘুরছে ঈদের কেনাকাটার জন্য। শ্রমজীবী দুই নারী এসেছিলেন থ্রি-পিস কিনতে। এক নারী জানালেন, তিনি ভাবির জন্য ৭০০ টাকা দিয়ে থ্রি-পিস কিনেছেন।

ব্রাদার্স পয়েন্ট নামের একটি দোকানে তিন নারী দুই শিশুকে নিয়ে জামা কিনতে এসেছেন। একজন কারুকাজ করা একটি জামার দিকে হাত বাড়ালে আরেকজন বলে উঠলেন, ‘এইটা তুই কিনতে পারবি? সুতিরটা দ্যাখ!’

ওই নারী পরে মেয়েশিশুটির জন্য একটি সুতির টু–পিসের দাম জানতে চান। দোকানি দাম হাঁকান ১ হাজার ৪০০ টাকা। ৬০০ টাকা দাম বললে দোকানি রাজি হননি। তিনি চান ৮০০ টাকা। পরিবারটি এই দামে না কিনে পাশের দোকানে চলে যায়।

দোকানের স্বত্বাধিকারী কাওছার আহাম্মেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত এখন মার্কেট খোলা থাকছে। এই মার্কেটে নিম্ন আয়ের মানুষেরাই কেনাকাটা করতে আসেন। তাঁর দোকানে দেড় শ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত দামের পোশাক আছে।

ঘুরতে ঘুরতে ‘মায়ের আঁচল শাড়ি বিতান’ নামে একটি দোকানে দেখা হয় পারভীন নামে এক ক্রেতার সঙ্গে। তিনি জানান, এই দোকান থেকে তিনি আগের দিন বড় মেয়ের জন্য একটি বোরকা কিনেছিলেন, আর আরেক দোকান থেকে জুতা কিনেছিলেন। দুটিই মেয়ের মাপের তুলনায় ছোট হয়ে যাওয়ায় আজ এসেছেন পাল্টে নিতে। জুতা পাল্টানো হয়ে গেছে, এখন বোরকা পাল্টাতে এসেছেন। তিনি পরিবার নিয়ে টঙ্গী থাকেন। কারওয়ান বাজারে একসময় তাঁর স্বামী বাবুল খানের কাঁচামাল ও ফলের আড়ত ছিল। এক যুগ আগে ব্যবসায় ক্ষতির মুখে পড়ে তাঁর স্বামীর মানসিক রোগ দেখা দেয়। তাঁর দুই ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। গত মাসে বড় মেয়ের স্বামী হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। সদ্য বিধবা মেয়েটি ১৩ বছরের মেয়ে নিয়ে এখন তাঁর বাসায় থাকেন।

শখ আর বাজেট মেলানোর চেষ্টা চলছে। গতকাল রোববার কারওয়ান বাজারে
ছবি: নাজনীন আখতার

পারভীন জানান, তাঁর বড় ছেলে টঙ্গীতে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। মেজ মেয়ে তিন মাস হলো বাসায় কাপড় সেলাই করে টুকটাক আয় করছেন। ছোট মেয়ে কলেজে পড়ে। আর সবার ছোট ছেলে মাদ্রাসায় পড়ত। ১৫ বছর বয়সী কিশোর ছেলেকে কয়েক মাস আগে বাসার কাছে একটি হোটেলে কাজে দিয়েছিলেন। হোটেলের গরম তরকারির হাঁড়ি ওপরে তুলতে গিয়ে তাঁর ছেলে পুরো দগ্ধ হয়ে গেছে। দেড় মাস রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি ছিল। এখন বাসায় আছে। টঙ্গীর একটি ক্লিনিকে প্রতিদিন ড্রেসিং করাতে হয়।

পারভীনের ছেলের চিকিৎসার জন্য হোটেলমালিক, তাঁর নিজের ভাই-বোনসহ স্বজনেরা সাহায্য করেছিলেন। টানাটানির মধ্যেও সদ্য বিধবা মেয়ের জন্য বোরকা ও জুতা কিনেছেন। বাড়িতে আর কারও জন্য ঈদের কোনো কেনাকাটা করছেন না। এমনকি কিশোরী নাতনির জন্যও না। তিনি বললেন, ‘মেয়ের জন্য কিনাই আমার জন্য অনেক বেশি হয়ে গেছে।’ কথা বলার সময় ঝরঝর করে তাঁর চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। ধরা গলায় বললেন, ‘অবস্থা যখন ভালো ছিল, তখন স্বামী ঈদে অনেক পিন্দাইছে (পোশাক কিনে দিয়েছেন)। ছেলে–মেয়েরেও অনেক পিন্দাইছি, এখন আর সম্ভব হয় না।’

বিধবা মেয়ের জন্য কেনার যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, ঈদের সময় মেয়ে ও নাতনিকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাবেন। মেয়ের বোরকা পুরোনো, নষ্ট হয়ে গেছে। এ জন্য একটি নতুন বোরকা কিনে দিয়েছেন।

কারওয়ান বাজার থেকে বের হতে হতে এমন অনেক নারী-পুরুষকে দেখা গেল ঘুরে ঘুরে দরদাম করে কিনছেন। হয়তো বাজেটের সঙ্গে যুদ্ধ চলছে তাঁদেরও। ঈদের কেনাকাটায় ছাড় দেওয়ার ভিন্ন ভিন্ন গল্প হয়তো তাঁদেরও রয়েছে। হয়তো তাঁরাও অগ্রাধিকার ঠিক করছেন, পরিবারের কোন সদস্যকে কিনে দেবেন। হয়তো ভাবছেন, ঈদে অন্তত পরিবারের কারও না কারও পরনে নতুন পোশাক বা জুতা থাকুক, এক-দুজনকে কিনে দিতে পারার আনন্দ ভাগ করে নেবেন সবাই।