নকশা, ভূমি, ছাড়পত্র সেবা বন্ধ থাকায় আবাসন ব্যবসায় ক্ষতি
রাজউকের ভবন নির্মাণ-সংক্রান্ত নকশা অনুমোদন ও ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র দেওয়ার কার্যক্রম তিন মাস বন্ধ থাকায় ঢাকার আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আটকে গেছে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যেসব নির্মাণ ও ভূমি ব্যবহার-সংক্রান্ত আবেদন অনলাইনে গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করে, সেগুলো ইলেকট্রনিক কনস্ট্রাকশন পারমিটিং সিস্টেম (ইসিপিএস) নামে একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিবছর পাঁচ কোটি টাকার মতো খরচ করতে হয়। গত ১৯ মে এ সিস্টেমে নিরাপত্তাত্রুটি দেখা দিলে অনলাইন কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে প্রায় সাড়ে চার হাজার নকশা অনুমোদনের আবেদন এবং পাঁচ শতাধিক ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র আবেদন জমা হয়ে আছে। ক্ষতি কমাতে ২১ আগস্ট থেকে অনলাইনে আংশিকভাবে কার্যক্রম শুরুর কথা বলা হলেও রাজউকের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু করা এই সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণে নেই প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা।
রাজউক সূত্র জানায়, অনলাইনে আবেদন করার পর সব কাগজ ঠিক থাকলে সাধারণত ৪৫ দিনের মধ্যে ভবন নির্মাণের অনুমোদন পাওয়া যায়। তবে কোনো ত্রুটি থাকলে আরও ৩০ দিন সময় লাগতে পারে। এসব আবেদনপ্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় আবাসন খাত অচলাবস্থার মুখোমুখি হয়।
ইসিপিএস সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে সেবা বন্ধ থাকার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে রাজউকের চেয়ারমান মো. রিয়াজুল ইসলাম ২০ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, আগের চেয়ে বেশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র দেওয়ার কাজটি তাঁরা শুরু করেছেন।
তবে রাজউকেরই একাধিক কর্মকর্তা ও প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, এ ধরনের একটি সংবেদনশীল ও জটিল সিস্টেম পরিচালনায় ডেটাবেজ, সার্ভার নিরাপত্তা ও সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণের দক্ষ জনবল থাকা আবশ্যক। কিন্তু রাজউকে সেই সক্ষমতা নেই। এই ঘাটতির কারণে ভবিষ্যতে আরও বড় নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়তে পারে সেবাটি।
একটি শীর্ষ আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ২২ আগস্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় আমাদের আটটি প্রকল্প আটকে আছে। প্রকল্পগুলোর আর্থিক মূল্য ৬০০ কোটি টাকার বেশি। এতে শুধু বেসরকারি খাতই নয়, সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে।’
আরেকজন ডেভেলপার বলেন, একেকটি প্রকল্পে গড়ে ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। সে হিসাবে রাজউকে আটকে থাকা হাজার হাজার আবেদন মানেই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি। তিনি বলেন, সেবা বন্ধ থাকার সময় নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা কমে যায়, শ্রমিকেরা কাজ হারান এবং ডেভেলপারদের ব্যাংকঋণ ও প্রকল্প পরিকল্পনায় বিপর্যয় নামে।
এই অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়েই গত ১৯ মে একটি চক্র মাত্র ১৭ মিনিটে একটি ১৫ তলা ভবনের নকশা অনুমোদন করিয়ে নেয়। ভবনটি ছিল মিরপুরের বাউনিয়া বাঁধে জলাভূমি ও উচ্চতা সীমিত এলাকায়, যেটি এর আগে অনুমোদন পায়নি।
রাজউক সূত্র জানায়, অনলাইনে আবেদন করার পর সব কাগজ ঠিক থাকলে সাধারণত ৪৫ দিনের মধ্যে ভবন নির্মাণের অনুমোদন পাওয়া যায়। তবে কোনো ত্রুটি থাকলে আরও ৩০ দিন সময় লাগতে পারে। এসব আবেদনপ্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় আবাসন খাত অচলাবস্থার মুখোমুখি হয়।
এদিকে রাজউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত মোট কতটি ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তার হিসাব দিতে পারেননি রাজউকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা। তবে ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ৫৬ হাজার ৭২৯টি আবেদন জমা পড়ে এবং ৪২ হাজার ৭টি ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ শাখা। প্রতি মাসে নকশা অনুমোদনের আবেদন ও ভূমি ব্যবহারের জন্য ছাড়পত্র নিয়ে প্রায় এক হাজার আবেদন জমা পড়ে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
রাজউকের সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ‘দোহাটেক’ নামে প্রতিষ্ঠানটির চুক্তি ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়। তাদের কাজ ছিল সফটওয়্যারটি রক্ষণাবেক্ষণ ও সচল রাখা। তাদের সঙ্গে চুক্তি শেষ হওয়ার পর আর নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। রাজউকের নিজস্ব আইটি টিমও নেই, যারা সার্ভার ও সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে। এই অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়েই গত ১৯ মে একটি চক্র মাত্র ১৭ মিনিটে একটি ১৫ তলা ভবনের নকশা অনুমোদন করিয়ে নেয়। ভবনটি ছিল মিরপুরের বাউনিয়া বাঁধে জলাভূমি ও উচ্চতা সীমিত এলাকায়, যেটি এর আগে অনুমোদন পায়নি।
রাজউকের একটি সূত্রে জানা গেছে, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তির মেয়াদ প্রায় এক বছর আগে শেষ হলেও অনেকটা চুপচাপ ছিল রাজউক। এখন আবাসন ব্যবসায়ীসহ সেবাপ্রার্থীদের চাপের মুখে শিগগিরই নতুন প্রতিষ্ঠান দরপত্রের মাধ্যমে ঠিক করার কাজ শুরু হয়েছে।
রাজউক পরে দাবি করে, তাদের সার্ভার ‘হ্যাকড’ (নিয়ন্ত্রণ হারানো) হয়েছে। তবে ১৫ তলা ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য আবেদনকারী স্বাভাবিকভাবেই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ফি পরিশোধ করে আবেদন করেন। হ্যাকড হয়ে থাকলে এটা সম্ভব হতো না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আসলে সার্ভার হ্যাকড হয়নি; বরং রাজউকের কোনো কর্মকর্তার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে নকশা অনুমোদন করানো হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মতিঝিল এলাকায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে একইভাবে আরও তিনটি ভবনের নকশা অনুমোদনের চেষ্টা হলে রাজউক সফটওয়্যারের মাধ্যমে আবেদন জমা ও প্রদান কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
যদিও এর আগে ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বরও রাজউকের সার্ভার থেকে ৩০ হাজার নথি গায়েব হয়ে যায়, যার মধ্যে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের আবেদন ছিল।
সার্ভারের বিষয়ে জানতে রাজউকের সিস্টেম অ্যানালিস্ট কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শুধু বলেন, ‘নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সিস্টেম চালু হয়েছে।’ তবে কীভাবে সেটি চলছে, রক্ষণাবেক্ষণ কারা করছে, নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত—এসব প্রশ্নের উত্তর তিনি দেননি।
রাজউকের একটি সূত্রে জানা গেছে, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তির মেয়াদ প্রায় এক বছর আগে শেষ হলেও অনেকটা চুপচাপ ছিল রাজউক। এখন আবাসন ব্যবসায়ীসহ সেবাপ্রার্থীদের চাপের মুখে শিগগিরই নতুন প্রতিষ্ঠান দরপত্রের মাধ্যমে ঠিক করার কাজ শুরু হয়েছে।
রাজউকের কারিগরি দুর্বলতার কারণে বেসরকারি আবাসন ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের সংকটে পড়েছিলেন। সাধারণ ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। এতে একদিকে যেমন নাগরিক ভোগান্তি হয়েছে, অন্যদিকে সরকারও বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া
রাজউকের আওতাধীন এলাকায় ভবন নির্মাণের আগে জমির ব্যবহার ছাড়পত্র ও নির্মাণ অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। আগে এ কাজ সনাতন পদ্ধতিতে (ম্যানুয়ালি) পরিচালিত হতো। ২০১৬ সালে রাজউক সীমিত আকারে অনলাইনে জমির ব্যবহার ছাড়পত্র প্রদান শুরু করে। ২০১৮ সালের মধ্যে এটি সব অঞ্চলে (জোন) বিস্তৃত হয়। ২০১৯ সালের মে মাসে রাজউক জমির ছাড়পত্র ও নির্মাণ অনুমোদন—উভয় সেবা অনলাইনে দেওয়া শুরু করে। এই সেবাগুলো পেতে নাগরিকদের একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে আবেদন করতে হয়। প্রয়োজনীয় নথিপত্র আপলোড করার পর যাচাই ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এরপর ব্যবহারকারীরা ডাউনলোড করে কাজ শুরু করতে পারেন।
আবাসন প্রতিষ্ঠান বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেডের (বিটিআই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এফ আর খান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের আবাসন খাত ও ভবন নির্মাণশিল্পে রাজউকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির কর্মদক্ষতায় অনেক ঘাটতি রয়েছে। ইসিপিএস সিস্টেমে নকশা জমা দিতে না পারার কারণে তাঁদের সব সেবা বন্ধ ছিল।
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, রাজউকের কারিগরি দুর্বলতার কারণে বেসরকারি আবাসন ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের সংকটে পড়েছিলেন। সাধারণ ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। এতে একদিকে যেমন নাগরিক ভোগান্তি হয়েছে, অন্যদিকে সরকারও বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বিপুল ব্যয়ে তৈরি করা এমন সফটওয়ার এক দিনের জন্য হলেও তদারকির বাইরে রাখা রাজউকের উচিত হয়নি। অথচ তারা এক বছর ধরে সংবেদনশীল সফটওয়্যারটি পরিচালনার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান ঠিক করেনি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন
রাজউক সূত্রে জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের ঋণে নেওয়া রাজউকের আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় ২০২৩ সালে অনলাইনে বাড়ির নকশা ও ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র অনুমোদনের জন্য ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ইলেকট্রনিক কনস্ট্রাকশন পারমিটিং সিস্টেম (ইসিপিএস) চালু করেছিল রাজউক। ইসিপিএস চালু করার মূল উদ্দেশ্য ছিল নকশা অনুমোদনে দুর্নীতি ও ভোগান্তি বন্ধের পাশাপাশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। যুক্তরাষ্ট্রের আরটিআই নামে একটি প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাটি তৈরি করে দেয়। এটি রক্ষণাবেক্ষণে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজউকের যে চুক্তি ছিল, তার মেয়াদ গত বছরের জুনে শেষ হয়। এর পর থেকে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর চুক্তি করেনি রাজউক।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিপুল ব্যয়ে তৈরি করা এমন সফটওয়ার এক দিনের জন্য হলেও তদারকির বাইরে রাখা রাজউকের উচিত হয়নি। অথচ তারা এক বছর ধরে সংবেদনশীল সফটওয়্যারটি পরিচালনার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান ঠিক করেনি। নাগরিক সেবার পাশাপাশি সরকার যেহেতু এর মাধ্যমে রাজস্বও আদায় করে, তাই এই সফটওয়্যারের রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রত্যেককে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।