কোটি টাকা ব্যয়ে প্রস্তুত জাতীয় ঈদগাহ
সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় পর ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করবেন। দীর্ঘ সময় পর দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি এই আয়োজনে যোগ করেছে এক ভিন্ন মাত্রা।
এই বিশেষ মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং লাখো মুসল্লির স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধানে ২৮ দিন ধরে চলে এ বিশাল কর্মযজ্ঞ।
এবার এই ঐতিহাসিক জামাতে ইমামতি করবেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, কূটনীতিক এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই জামাতে অংশ নেবেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রকৌশল বিভাগের তথ্য বলছে, এবার এই মাঠ সাজাতে সংস্থাটির আনুমানিক ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ টাকা। পি আর এন্টারপ্রাইজ নামক একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মাঠ প্রস্তুতের কাজ দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, তিন লাখ বর্গমিটারের এই বিশাল ঈদগাহ মাঠ তৈরি করা একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ।
মাঠ প্রস্তুতে সময় লেগেছে ২৮ দিন
পি আর এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি রাশেদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মাঠ প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়েছিল রমজানের প্রথম দিন থেকে। টানা ২৮ দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে শতাধিক কর্মী দৈনিক কাজ করে মাঠটিকে নামাজের জন্য উপযোগী করে তুলেছেন। মাঠের প্যান্ডেল তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে ৪৩ হাজারের বেশি বাঁশ। এই বিশাল কাঠামোকে মজবুতভাবে ধরে রাখতে ব্যবহার করা হয়েছে ১৫ টনের বেশি রশি। এ ছাড়া বৃষ্টি থেকে মুসল্লিদের রক্ষা করতে প্যান্ডেলের ওপর প্রায় ১ হাজার ৯০০টি উন্নত মানের ত্রিপল টানানো হয়েছে। রাতের বেলা বা অন্ধকার কাটাতে মাঠে লাগানো হয়েছে প্রায় ৯০০টি টিউবলাইট।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রকৌশল বিভাগ ও মাঠ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, এবারের জাতীয় ঈদগাহে ধারণক্ষমতার দিক থেকে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ঈদগাহের প্যান্ডেলের মূল ক্ষেত্রফল প্রায় ২৫ হাজার ৪০০ বর্গমিটার। প্যান্ডেলের ভেতরে আবহাওয়া ও পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে কাতারগুলো সাজানো হয়েছে। পুরো মাঠে সর্বমোট ১২১টি কাতার করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬৫টি বড় আকারের এবং ৫০টি ছোট আকারের কাতার রয়েছে।
সব মিলিয়ে মূল প্যান্ডেলের ভেতরে একসঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। তবে ঈদগাহের ভেতরে জায়গা ভরে গেলে প্রতিবারের মতো এবারও আশপাশের খালি জায়গা, সড়ক ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের এলাকায় মুসল্লিরা জমায়েত হবেন। সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, আশপাশের সড়ক ও খোলা জায়গা মিলিয়ে এবার প্রায় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ মুসল্লি একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করতে পারবেন।
এবারও অতি গুরুত্বপূর্ণ বা ভিআইপি ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ মিলিয়ে প্রায় ৩৩০ জনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে, যার মধ্যে ২৫০ জন পুরুষ এবং ৮০ জন নারী ভিআইপি। সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যে প্রায় ৩১ হাজার পুরুষ এবং ৩ হাজার ৫০০ নারীর জন্য আলাদা নামাজের জায়গা ও পর্দা নিশ্চিত করা হয়েছে।
তীব্র গরম ও গুমোট আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে এবার মাঠে ফ্যানের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি রাশেদুল হক জানিয়েছেন, মুসল্লিদের স্বাচ্ছন্দ্য দিতে এবার ১ হাজার ১০০-এর বেশি ফ্যান লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে সিলিং ফ্যানের সংখ্যাই প্রায় ৯০০টি, বাকিগুলো স্ট্যান্ড ফ্যান। ভিআইপি এলাকায় পর্যাপ্ত শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানিয়েছেন, জাতীয় ঈদগাহে এবার মুসল্লিদের জন্য আরামদায়ক কার্পেট বিছানো হয়েছে। তাই কাউকে কষ্ট করে বাসা থেকে জায়নামাজ বহন করতে হবে না। নামাজের পবিত্রতা রক্ষায় অজুর ব্যবস্থাতেও দেওয়া হয়েছে বিশেষ নজর। প্যান্ডেলের ভেতরে প্রায় ১৪০ জন মুসল্লির একসঙ্গে অজু করার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে ১১৩ জন পুরুষ এবং ২৭ জন নারী আলাদাভাবে অজু করতে পারবেন। এ ছাড়া পুরো এলাকায় পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা বলয়
জাতীয় ঈদগাহে আগত মুসল্লিদের তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দুটি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া জরুরি প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ শৌচাগারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নিরাপত্তার দিকটি এবার সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে। ময়দানে প্রবেশের জন্য ভিআইপি ও সাধারণ মুসল্লিদের জন্য মোট ৪টি ফটক রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ভিআইপিদের জন্য ১টি এবং সাধারণ পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা ফটক রয়েছে। নামাজ শেষে দ্রুত ও সুশৃঙ্খলভাবে বের হওয়ার জন্য রাখা হয়েছে মোট ৭টি বহিরাগমন পথ।
পুরো ঈদগাহ এলাকা পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে থাকবে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া পুরো এলাকাটি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো ধারালো সরঞ্জাম বা দাহ্য পদার্থ সঙ্গে না আনতে মুসল্লিদের প্রতি অনুরোধ জানান দক্ষিণ সিটির প্রশাসক।
বৈরী আবহাওয়ায় বিকল্প পরিকল্পনা
সম্প্রতি জাতীয় ঈদগাহ পরিদর্শন শেষে ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, কালবৈশাখী বা আকস্মিক বৃষ্টির কথা মাথায় রেখে এবার বৃষ্টি নিরোধক শামিয়ানা এবং দ্রুত পানিনিষ্কাশনের বিশেষ ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঈদুল ফিতরের দিন জাতীয় ঈদগাহে সকাল সাড়ে আটটায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। তবে আবহাওয়া যদি কোনো কারণে অনুকূলে না থাকে বা দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তবে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সকাল ৯টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ঈদের প্রধান জামাত স্থানান্তরিত হবে।’
সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পূর্ব দিকে পুরানা পল্টন মোড়, উত্তর দিকে মৎস্য ভবন মোড় এবং দক্ষিণ দিকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত মাইক লাগানো হবে, যেন দূরদূরান্তের মুসল্লিরা ইমামের কণ্ঠ শুনতে পারেন।
১৯৮৭-৮৮ সালের দিকে এই মাঠটিকে জাতীয় ঈদগাহ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সাল থেকে সিটি করপোরেশন মাঠটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছে।