রণেশ দাশগুপ্ত ছিলেন একজন ঋষিতুল্য মানুষ। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সত্য সুন্দরের পক্ষে লড়াই করেছেন। আজন্ম মানুষের শোষণমুক্তির আদর্শকে ধারণ করে, মানবসভ্যতার অগ্রগতির কল্যাণে যে একটি জীবন অতিবাহিত করা যায়, তার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। আর তাঁর এই আদর্শের যোগ্যতম উত্তরাধিকার বহন করে সারা জীবন কাজ করে গেছেন অধ্যাপক বদিউর রহমান। বৃহস্পতিবার ছিল তাঁদের জন্মদিন। আলোচনা, স্মৃতিচারণা, গান, কবিতা আবৃত্তি দিয়ে সাজানো অনুষ্ঠানে এই দুই গুণী মানুষের জন্মদিন উদ্যাপন করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।
পুরানা পল্টনের মণি সিংহ-ফরহাদ ট্রাস্ট কার্যালয়ে এই ‘জন্মবার্ষিকীর আয়োজন’ করা হয়েছিল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়। সভাপতিত্ব করেন উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম। রণেশ দাশগুপ্ত ও অধ্যাপক বদিউর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর উদীচীর সংগীত বিভাগের শিল্পীরা পরিবেশন করেন সূচনা সংগীত ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো’।
রণেশ দাশগুপ্তের ১১৪তম জন্মদিন ছিল বৃহস্পতিবার। মুন্সিগঞ্জে তাঁর জন্ম ১৯১২ সালের ১৫ জানুয়ারি। পরলোক গমন করেন ১৯৯৭ সালের ৪ নভেম্বর। উদীচীর কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শেখ আনিসুর রহমান তাঁর জীবনী পাঠ করেন। তিনি বলেন, বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রণেশ দাশগুপ্ত-এর জীবনকে বলা যায় সংগ্রাম বা বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি। তিনি যে জীবন বেছে নিয়েছিলেন, সে জীবন কেবলই ত্যাগের। মহান আদর্শের পেছনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এক চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তিনি।
বদিউর রহমানের জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৫ জানুয়ারি বরিশালে। গত বছরের ১৭ জুলাই তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর জীবনী পাঠ করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কংকন নাগ। তিনি বলেন, বদিউর রহমান ছিলেন একজন বহুমাত্রিক প্রতিভাবান মানুষ। একাধারে শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সম্পাদক ও সাংবাদিক। শৈশবেই মানবমুক্তির সংগ্রামের দীক্ষিত হওয়ার পর থেকে আমৃত্যু সেই আদর্শ ও লক্ষ্যে ছিলেন অবিচল। শত বাধাতেও তিনি সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই থেকে পিছপা হননি। মৃত্যুর আগেও তিনি উদীচীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
পরে আলোচনা পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক বলেন, রণেশ দাশগুপ্ত তাঁর লেখায় বরাবরই সবাইকে যেমন সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, তেমনি সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনের সব সাধ-আহ্লাদকে বিসর্জন দিয়ে তিনি সমাজতান্ত্রিক আদর্শের লক্ষ্যে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। ভোগ নয়, ত্যাগের আদর্শকে ধারণ করেছিলেন তিনি। তাঁকে বুঝতে হলে তাঁর সময়কে বুঝতে হবে। তিনি বলেন, এখন সময় ও বাস্তবতা বদলে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসেছে। সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হলে সমকালীন বাস্তবতা ও তরুণ প্রজন্মের মনোভাব, তাদের জীবনধারাকে অনুধাবন করতে হবে। সেই আলোকেই নতুন কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে।
কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন উদীচীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম, সহসভাপতি শিবাণী ভট্টাচার্য, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আজমীর তারেক চৌধুরী, কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য বিমল মজুমদার, বদিউর রহমানের কন্যা সুপা সাদিয়া প্রমুখ।
আলোচকেরা বলেন, ১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর রণেশ দাশগুপ্ত শিল্পী-সংগ্রামী সত্যেন সেনসহ বেশ কয়েকজন প্রগতিশীল মুক্ত চিন্তার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন। যেকোনো ধরনের অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে সব সময়ই সোচ্চার থাকার শিক্ষা দিয়েছেন রণেশ দাশগুপ্ত। আর রণেশ দাশগুপ্তের দেখানো পথেই উদীচী সংগঠনকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আজীবন অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন বদিউর রহমান।
অনুষ্ঠানে আলোচনার পর সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন উদীচীর সংগীত বিভাগের শিল্পীরা। ‘হে মহামানব একবার এসো ফিরে’, ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’, ‘আমরা পুবে-পশ্চিমে’সহ বেশ কয়েকটি গান গেয়ে শোনান। আবৃত্তি বিভাগের বাচিকশিল্পীরা পরিবেশন করেন বৃন্দ আবৃত্তি ‘রানার চলেছে’। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শিখা সেনগুপ্তা।