দেয়ালে সবুজ মোড়কের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছিল কালো রঙের একটা রেকর্ড। গওহর জানের হিন্দুস্তানি ঠুমরির এই রেকর্ড প্লেটের বয়স ১১৮ বছর। এই রেকর্ডের সংগ্রাহক সাংবাদিক হারুন আল রশীদ বললেন, ১৯০৫ সালের এই প্লেটে রেকর্ড হয়েছে একদিকে। পাশের দেয়ালে তখন ঝুলছে ‘ঢাকা রেকর্ড’–এর একসময়ের জনপ্রিয় গ্রাম্য পালা ‘গুনাই বিবি’ রেকর্ড প্লেট। রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার ভবনের আর্ট গ্যালারির ভেতরে তখন গ্রামোফোনে বেজে চলেছে শিল্পী আবদুল জব্বারের কণ্ঠে ‘সালাম সালাম হাজার সালাম সকল শহীদ স্মরণে’ গান। আর প্রদর্শনীর এক কোনায় লুৎফর রহমানের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে শ্রোতাদের টানছে ‘দ্য রেইন’ চলচ্চিত্রে রুনা লায়লার গাওয়া সেই জনপ্রিয় গান ‘চঞ্চল হাওয়ারে ধীরে ধীরে চলরে’। পুরো পরিবেশ তখন সংগীতময়।
বাংলাদেশে যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে পুরোনো গানের রেকর্ড সংগ্রহ করেন, তাঁরা নিজেদের মূল্যবান সংগ্রহ নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন ‘রেকর্ড স্টোর ডে’ আয়োজনে। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আজ শনিবার পালন করা হলো রেকর্ড স্টোর ডে।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে ১৬ বছর আগে রেকর্ড স্টোর ডে নামে অভিনব এক দিবসের যাত্রা শুরু হয়। পরে এটা স্বীকৃতি পেয়েছে সারা বিশ্বে। এর মাধ্যমেই মূলত ভাইনাল রেকর্ডের প্রচার ও প্রসার আবার বাড়তে শুরু করে। ধীরে ধীরে অ্যানালগ অডিও তথা রেকর্ডের ঐতিহ্যও দিবসটি পালনের মধ্য দিয়ে ফিরতে শুরু করেছে।
সাধারণত প্রতিবছর এপ্রিলের তৃতীয় শনিবার দিবসটি পালিত হয়। সেই হিসাবে এবার দিবসটি ছিল ২২ এপ্রিল। তবে সেদিন পবিত্র ঈদুল ফিতর থাকায় দিবসটি পালিত হয়নি। পালিত হলো আজ।
মূলত অ্যানালগ অডিও, তথ্য রেকর্ডের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার প্রয়াস নিয়েই আজকের আয়োজন। আয়োজকেরা বললেন, পুরোনো গান খুঁজতে গেলে রেকর্ডের কাছেই যেতে হয়। শনিবার সকালে ডেইলি স্টার ভবনের আর্ট গ্যালারিতে দিবসটির উদ্বোধন করেন শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী, শিল্পী ফরিদা পারভীন ও প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান।
ফরিদা পারভীন বলেন, সংগীত অভিমানী। সংগীতের গুণ ঐশ্বরিক। তাকে যত্ন না করলে সে শিল্পীর কাছে থাকে না। প্রযুক্তির উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু সমাজটা হয়ে যাচ্ছে প্রেমহীন। শুদ্ধ সংগীতচর্চা ও তা সংরক্ষণ নিয়ে তৈরি হোক সাগরের ঢেউয়ের মতো উন্মাদনা।
ফরিদা পারভীন কথা প্রসঙ্গে আক্ষেপ করে বলেন, ১৯৭৬, ১৯৭৭ সালে আইসিআই কোম্পানি থেকে বের হওয়া তাঁর লালনগীতির গানের রেকর্ড হারিয়ে গেছে।
শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, সংগীতের অবিমিশ্র আনন্দ গ্রহণ করতে হলে শ্রোতাকে গ্রামোফোন, ভাইনাল রেকর্ডের কাছে ফিরে যেতেই হয়। এসব মাধ্যমে শিল্পীর কণ্ঠের কাজের যে বিস্তারিত পাওয়া যায়, তা অনুপস্থিত বর্তমান ইন্টারনেট ব্যবহার করে ইউটিউবে শোনা গানে। সংগীত এখন অনেকটা পরজীবী—আক্ষেপ করে তিনি বলেন, নৃত্য, গীত আর বাদ্য নিয়েই সংগীতের বিনোদন সব সময়ের। কিন্তু এখন গান হয়ে গিয়েছে শুধু নৃত্যনির্ভর। সেই নৃত্যও সংগীতের সঙ্গে বেমানান আর আদিরসনির্ভর। মানুষের বিনোদন থেকে বীর রস, করুণা রস, স্নেহ রস এসব যেন বিদায় নেওয়ার দ্বারপ্রান্তে। তাই যাঁরা সংগীতের জন্য গ্রামোফোন বা এলপি রেকর্ডের কাছে ফিরতে হবে শুনলে সংশয় প্রকাশ করেন, তাঁরা আসলে না বুঝেই তা করেন।
দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম স্মৃতিচারণা করে বলেন, ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল সময়ের ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় শিল্পীরা ট্রাকে চড়ে গণসংগীত গাইতেন। ছাত্র আন্দোলনের অংশ হিসেবে এসব গণসংগীত গাওয়া হতো। সমাজচেতনা বোধকে জাগ্রত করত সেসব গান।
বাংলাদেশে সংগীত রেকর্ডের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, গান মানুষকে মানুষ করে, গান মানুষকে সুন্দর করে।
রেকর্ড স্টোর ডের আয়োজনের প্রধান আলোচক ছিলেন মতিউর রহমান। আজ তাঁর কথায় উঠে আসে সদ্য প্রয়াত মার্কিন গায়ক, অভিনেতা, মানবাধিকারকর্মী হ্যারি বেলাফন্টের প্রথম চলচ্চিত্র ‘আইল্যান্ড ইন দ্য সান’–এর কথা। ছবিটি ১৯৫৭ সালে ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে প্রদর্শিত হওয়ার স্মৃতিচারণা করেন তিনি। এ সময় সেই চলচ্চিত্রে থাকা একটি গানের কথা বলেন মতিউর রহমান। তিনি বলেন, অনেকের বাড়িতে একসময় মারফি রেডিও ছিল। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে জনপ্রিয় ছিল কলকাতা রেডিওর অনুরোধের আসর।
১৯৬১ সালে দেশজুড়ে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে হওয়া গানের অনুষ্ঠান নিয়ে মতিউর রহমান বলেন, ১৯৬২ সালে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলনে বড় ভূমিকা রেখেছিল গণসংগীত। বাংলাদেশের গানের প্রসঙ্গে উঠে আসে ‘বাংলাদেশ কনসার্ট’–এর কথা। ১৯৭১ সালে পণ্ডিত রবিশঙ্করের উদ্যোগে জর্জ হ্যারিসনের বিশেষ চেষ্টায় ১ আগস্ট মেডিসন স্কয়ারে বাংলাদেশের সমর্থনে কনসার্ট হয়, যা সংগীত ইতিহাসের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
২০১১ সালে রবিশঙ্করের সঙ্গে দিল্লিতে আলাপের সময় তিনি সেই কনসার্ট ফর বাংলাদেশের স্মৃতিচারণা করেন মতিউর রহমানের সঙ্গে। সেই সময়ের স্মৃতি নতুন করে সামনে আসে তখন করা রেকর্ড শুনলে। ১৯৭৪ সালে রবিশঙ্কর নিজের লেখা, সুরে বাংলাদেশের জন্য গেয়েছিলেন। ‘জয় বাংলা’ আর ‘হায় ভগবান, হায় আল্লাহ’ দুটি গান। এই রেকর্ড শিল্পী হারিয়ে ফেলেছিলেন, তবে সেটি বাংলাদেশে আছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
একসময় পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে মূল্যবান রেকর্ডের সংগ্রহ এবং তখনকার হিন্দুস্তান রেকর্ডের প্রতি শ্রোতাদের আগ্রহের কথা বলেন মতিউর রহমান। গীতালি, গানের ডালি, রেইনবো, সুর কল্লোল, সুরের ভবনের মতো অনেক প্রতিষ্ঠানের গানের সিডি তৈরির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এ দোকানগুলো এখন আর নেই কিন্তু কলকাতার ধর্মতলার বড় রেকর্ড সংগ্রহের দোকানটি এখনো আছে। ভারতবর্ষের সংগীতের সঙ্গে স্প্যানিশ বা অন্যান্য দেশের সংগীতের মিল থাকার প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
রেকর্ড স্টোর ডে উদ্যাপন কমিটির আহ্বায়ক জিয়া আহমেদ আর সদস্যসচিব পরিতোষ কুমার দেব।
আজকের আলোচনায় সংগীতের ধারা বদলের প্রসঙ্গ উঠে আসে জিয়া আহমেদের বক্তব্যে। তিনি বলেন, পুরোনো গান খুঁজতে গেলে বোঝা যায় কাজটি কতখানি দুঃসাধ্য। তাই যতটা সম্ভব ঐতিহ্যকে প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করার চেষ্টাই আয়োজনের উদ্দেশ্য।
রেকর্ড স্টোর ডে উৎসর্গ করা হয়েছে উপমহাদেশের প্রখ্যাত নজরুলসংগীতশিল্পী ফিরোজা বেগমকে।
রেকর্ড স্টোর ডের আয়োজনে নিজেদের সংগ্রহ নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন কয়েকজন বিদেশি সংগ্রহকারী। তাঁদের একজন শ্রীলঙ্কার অ্যানজেলস লিনেগে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বসবাসকারী এই গানের সংগ্রাহক বললেন, তাঁর পছন্দ জগজিৎ সিংয়ের গজল।
আজকের আয়োজনে দর্শক ও সংগ্রাহকেরা ঘুরেফিরে দেখেছেন কানন দেবী, আঙ্গুর বালা, পঙ্কজ মল্লিক, কে এল সায়গল, মেহেদি হাসান, গোলাম আলী, মান্না দে, রুনা লায়লার গানের পুরানো রেকর্ড। আর্ট গ্যালারির ভেতরের টেবিলে ছিল ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ রেকর্ডের পাশে ‘বিক্ষুব্ধ বাংলা’, ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’–এর মূল রেকর্ড প্লেট।