ঢাকা শুধু নামেই মহানগর, দ্রুত বড় হচ্ছে, বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে
কনকনে শীত। কাঁঠালবাগানের রাস্তা ফাঁকা। দোকানপাট খোলেনি। বাইরে ঘন কুয়াশা, মৃদু বৃষ্টির ফোঁটার মতো ঝরে পড়ছে শিশির। অধিকাংশ বাসাবাড়ির মানুষ তখনো লেপ-কাঁথা-কম্বলের নিচে। প্রতিদিনের মতো বেজে ওঠে কলবেল। দরজায় গৃহকর্মী।
তিনি খণ্ডকালীন গৃহকর্মী। রাজধানীর কাঁঠালবাগানের কালভার্ট এলাকার বস্তিতে থাকেন। ৩৫ বছর আগে জামালপুর থেকে বস্তিতে এসে উঠেছিলেন। সেখানেই বিয়ে হয়। তাঁর একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। তাঁদেরও বিয়ে শেষে ছেলে-মেয়ে হয়েছে। তাঁর মেয়েও একাধিক বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। তাঁরা সবাই বস্তিতে থাকেন।
কলবেলের শব্দে গৃহকর্তার ঘুম ভাঙে। চোখে-মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে দরজা খোলেন গৃহকর্তা। এই গৃহকর্তা প্রায় চার দশক আগে খুলনা জেলার একটি গ্রাম থেকে এই শহরে এসেছিলেন পড়াশোনা করার জন্য। পড়াশোনা শেষ করে তিনি আর গ্রামে ফিরে যাননি। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। বিয়ে করে এক ছেলে নিয়ে সংসার পেতেছেন ঢাকা শহরে। এই গৃহকর্মী ও গৃহকর্তা দুজনই ঢাকা শহরে জায়গা করে নিয়েছেন।
এভাবে জায়গা দিতে দিতে ঢাকা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগরে পরিণত হয়েছে। আর ২৫ বছর পর বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল মহানগর হবে ঢাকা। জাতিসংঘ বলছে, ২০৫০ সালে ঢাকার চেয়ে বড় শহর বিশ্বের আর কোনো দেশে থাকবে না।
ঢাকার এই বিশালত্ব নিয়ে আলোচনা কম হয়। জাতিসংঘ মনে করছে, দুটি মহানগরে আগামী ২৫ বছর জনসংখ্যা ৫ শতাংশ হারে বাড়বে। এর একটি ঢাকা, অন্যটি সাংহাই। ঢাকা যেভাবে বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা।
গত কয়েক দশকে ঢাকা মহানগরের আয়তন ও মানুষ যেভাবে বেড়েছে, শহরটি সেভাবে বসবাসের উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি। শহরটি অপরিকল্পিত ও অগোছালো। দুর্ভোগ পরিবহনে। আবাসনে পরিকল্পনার ছাপ নেই। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের মতো পরিষেবা নিম্নমানের। শহরে সবুজ পরিসর নেই। নেই ফুটপাত। আছে শব্দ ও বায়ুদূষণ। সমস্যার তালিকা দীর্ঘ। মহানগরজুড়ে ব্যবস্থাপনার সংকট।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত টুওয়ার্ড গ্রেট ঢাকা গ্রন্থের সহলেখক হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, রাজধানী বা দেশের প্রধান শহর হলেও ঢাকা থেকে গ্রামীণ আমেজ দূর হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে হাট বসে। ঢাকার আকার বেড়েছে, মান বাড়েনি। এই শহরের অনানুষ্ঠানিক খাতে বহু মানুষ জড়িত, শহরের মানুষের উৎপাদনশীলতা কম। তাই ঢাকা শহর বড় হওয়ার অর্থ হচ্ছে দুর্বল অর্থনৈতিক ভূগোলের বিস্তার। ঢাকা আধুনিক মেট্রোপলিটন শহর হয়ে উঠতে পারেনি।
এভাবে জায়গা দিতে দিতে ঢাকা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগরে পরিণত হয়েছে। আর ২৫ বছর পর বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল মহানগর হবে ঢাকা। জাতিসংঘ বলছে, ২০৫০ সালে ঢাকার চেয়ে বড় শহর বিশ্বের আর কোনো দেশে থাকবে না।
মানুষ বাড়ছেই
প্রায় দেড় মাস আগে (১৮ নভেম্বর, ২০২৫) জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স (ইকোসক) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগর বা মেগাসিটি ঢাকা। এই মহানগরে ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ বাস করে। বিশ্বের প্রথম বৃহত্তম মহানগর ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা। সেখানে ৪ কোটি ১৯ লাখ মানুষের বসবাস। টোকিও, নয়াদিল্লি, সাংহাই, গুয়াংজু, কায়রো, ম্যানিলা, কলকাতা ও সিউলের মতো বিশ্বের বড় সব মহানগরকে পেছনে ফেলে ঢাকা তালিকার দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে।
ইকোসক ২০০০, ২০২৫ ও ২০৫০ সালের শীর্ষ ১০টি মেগাসিটি বা মহানগরের তালিকা ও তাদের জনসংখ্যা প্রকাশ করেছে। ২০০০ সালে ঢাকা মহানগরের জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ। তখন ঢাকা ছিল বিশ্বের নবম বৃহত্তম মহানগর। ২৫ বছরে মানুষ বেড়েছে ১ কোটি ৯২ লাখ। অর্থাৎ প্রতিবছরে ৭ লাখ ৬৮ হাজার মানুষ বেড়েছে। এর অর্থ প্রতিদিন ঢাকা শহরে গড়ে ২ হাজার ১০৪ জন মানুষ বাড়ছে। এর মধ্যে কিছু মানুষ জন্ম নিচ্ছে, কিছু মানুষ কাঁঠালবাগান এলাকার ওই গৃহকর্মী বা তাঁর গৃহকর্তার মতো দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে ঢুকছে।
ঢাকার জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার এই প্রবণতা আরও ২৫ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে অব্যাহত থাকবে বলে জাতিসংঘ মনে করছে। ২০৫০ সালে ঢাকা হবে বিশ্বের এক নম্বর বৃহত্তম মহানগর। তখন ঢাকার জনসংখ্যা বেড়ে হবে ৫ কোটি ২১ লাখ। দ্বিতীয় স্থানে নেমে যাবে জাকার্তা। জনসংখ্যা বেড়ে হবে ৫ কোটি ১৮ লাখ।
গত কয়েক দশকে ঢাকা মহানগরের আয়তন ও মানুষ যেভাবে বেড়েছে, শহরটি সেভাবে বসবাসের উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি। শহরটি অপরিকল্পিত ও অগোছালো। দুর্ভোগ পরিবহনে। আবাসনে পরিকল্পনার ছাপ নেই। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের মতো পরিষেবা নিম্নমানের। শহরে সবুজ পরিসর নেই। নেই ফুটপাত। আছে শব্দ ও বায়ুদূষণ। সমস্যার তালিকা দীর্ঘ। মহানগরজুড়ে ব্যবস্থাপনার সংকট।
ঢাকা এখন কত বড়
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ঢাকা মহানগরের সীমানা বা পরিধির স্পষ্ট বর্ণনা নেই। তবে ২০১৬ সালে জাতিসংঘের জনসংখ্যাবিষয়ক সংস্থা ইউএনএফপিএ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে অভিবাসন ও নগরায়ণ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে ঢাকা মেগাসিটির আওতায় থাকা এলাকাগুলোর উল্লেখ আছে। তাতে বলা হয়েছিল, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ছাড়াও ছয়টি পৌরসভা কদমরসুল, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ, সাভার ও টঙ্গী এই মেগাসিটির অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া আরও ৬৮টি ইউনিয়ন এই মেগাসিটির মধ্যে ছিল, যেগুলো ঢাকা সিটি করপোরেশন এবং ওই ছয় পৌরসভার আশপাশে অবস্থিত। তবে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ আগেই সিটি করপোরেশন হয়েছিল।
ওপরের ওই এলাকাগুলো এখন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন। ইউএনএফপিএর ঢাকা কার্যালয় ও জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজউক আওতাধীন জায়গা হচ্ছে ঢাকা মহানগর বা ঢাকা মেগাসিটি। এটাকেই ঢাকা স্ট্রাকচারাল প্ল্যানে (২০১৬-২০৩৫) ঢাকা মেট্রোপলিটন অঞ্চল বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
নগরবিশেষজ্ঞ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজাউল রনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইকোসকের প্রতিবেদনে ঢাকার ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া নেই। তবে আগের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচির সূত্র থেকে আমরা বলতে পারি, রাজউকের আওতাভুক্ত ঢাকা মেট্রোপলিটন অঞ্চলই ঢাকা মহানগর।’ এটাকে কেউ কেউ বৃহত্তর ঢাকা বলেও বর্ণনা করেন।
রাজউকের ওয়েবসাইট বলছে, রাজউকের আওতাভুক্ত এলাকার আয়তন ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার। এটি বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের (দেশের আয়তন ১,৪৮,৪৬০ বর্গকিলোমিটার) এক শ ভাগের এক ভাগ। এই ১ শতাংশে দেশের ২০ শতাংশ মানুষ বাস করে (দেশের মানুষ ১৮ কোটির হিসাবে)।
টোকিও, নয়াদিল্লি, সাংহাই, গুয়াংজু, কায়রো, ম্যানিলা, কলকাতা ও সিউলের মতো বিশ্বের বড় সব মহানগরকে পেছনে ফেলে ঢাকা তালিকার দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে।
বর্তমানে ঢাকা মহানগরের (মেট্রোপলিটন অঞ্চল) মধ্যে আছে চারটি সিটি করপোরেশন: ঢাকা উত্তর সিটি, ঢাকা দক্ষিণ সিটি, গাজীপুর সিটি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। এ ছাড়া আছে পূর্ব দিকে তারাব, ভুলতা, পূর্বাচল ও কালীগঞ্জ, উত্তর দিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সন্নিহিত এলাকা, দক্ষিণ দিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ছাড়া বাকি সব এলাকা, পশ্চিম দিকে সাভার, ধামসোনা ও আশপাশের সব এলাকা এবং দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে কেরানীগঞ্জ। তবে ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ ও ধামরাই মহানগরের বাইরে।
২৭টি সংসদীয় আসন ঢাকা মহানগরের মধ্যে পড়েছে। ঢাকা-১ থেকে ঢাকা-১৯ অর্থাৎ ঢাকা মহানগরের অধীনে (ঢাকা-১ আসনের নবাবগঞ্জ এর বাইরে)। নারায়ণগঞ্জ ১, ২, ৩ ও ৪ পুরোটাই মহানগরের অধীনে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ-৫ সংসদীয় আসনের বড় অংশও এর মধ্যে পড়ে। গাজীপুর ১ ও ২ সংসদীয় আসনের পুরোটা এবং গাজীপুর ৫ আসনের আংশিক ঢাকা মহানগরের আওতায়। ঢাকা মহানগরের এই রাজনৈতিক গুরুত্বের দিকটি বিশেষ আলোচনায় আসে না। অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঢাকা মহানগরকে সুন্দর করার দায়িত্ব যে এই ২৭ জন সংসদ সদস্যেরও রয়েছে, সেই কথা কাউকে বলতে শোনা যায় না।
দ্যাশে অভাব ছিল’। এখন অভাব গেছে? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। মলিন মুখ আরও মলিন হয়, ঢাকা শহরের মতো।ঢাকায় আসা এক গৃহকর্মী
ঢাকা মহানগরের আওতায় ভোটার মোট ১ কোটি ১৬ লাখ ৬৯ হাজার ৭৪ জন। ঢাকা মহানগরের জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ ভোটার। জাতীয়ভাবে মোট জনসংখ্যার ৭৩ শতাংশ ভোটার। সারা দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা মহানগরে ভোটার কম। এর একটি কারণ অভ্যন্তরীণ অভিবাসন। অন্য জেলা থেকে মানুষ ঢাকায় এসেছেন। বস্তির বাসিন্দাদের অনেকই ঢাকার ভোটার নন। কাঁঠালবাগানের ওই গৃহকর্মী, তাঁর স্বামী, মেয়ে ও ছেলে কেউই ওই এলাকার ভোটার নন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি জামালপুর গিয়ে ভোট দেবেন বলে প্রথম আলোকে বলেছেন।
রাজউকের ওয়েবসাইট বলছে, রাজউকের আওতাভুক্ত এলাকার আয়তন ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার। এটি বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের (দেশের আয়তন ১,৪৮,৪৬০ বর্গকিলোমিটার) এক শ ভাগের এক ভাগ। এই ১ শতাংশে দেশের ২০ শতাংশ মানুষ বাস করে (দেশের মানুষ ১৮ কোটির হিসাবে)।
বস্তি আর বস্তি
ঢাকা এখন বস্তির শহর হয়ে উঠেছে। শহরের প্রায় সব এলাকায় বস্তি চোখে পড়ে। উচ্ছেদ অভিযান আর আগুনের কারণে প্রায়ই বস্তি খবরের শিরোনাম হয়।
শহরে বস্তির সংখ্যা কত এবং বস্তিতে কত মানুষ বাস করে, তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ২০২২ সালের আরবান এরিয়া প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকায় বস্তির সংখ্যা ৪ হাজার ৭৬১। তবে পুরো ঢাকা মহানগরের এলাকা বিবেচনায় নিলে বস্তির সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষকেরা ইউনিসেফের উদ্ধৃতি দিয়ে বলছেন, ঢাকা শহরে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বস্তিতে বাস করে। বড় বস্তিগুলো খাসজমিতে গড়ে উঠেছে। তবে ৮০ শতাংশ বস্তি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে। বস্তির মানুষ অধিকাংশ ভাড়া বাসায় থাকেন। বস্তিতে ১০০ বর্গফুটের ভাড়া ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। বস্তির পরিবারগুলোর ২০ থেকে ৪০ শতাংশ অর্থ চলে যায় ঘর ভাড়ায়।
ঢাকা মহানগর ঘন বসতিপূর্ণ এলাকা। এখানে গড়ে এক বর্গকিলোমিটার জায়গায় ২৩ হাজার ৯৫৩ জন বাস করে। বস্তি আরও ঘন বসতিপূর্ণ। ২০১৬ সালে ইউএনএফপিএর ‘বাংলাদেশে নগরায়ণ ও অভিবাসন’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের কোনো কোনো বস্তি ‘ব্যতিক্রমীভাবে অতি ঘনবসতিপূর্ণ’। সেসব বস্তিতে প্রতি বর্গকিলোমিটার জায়গায় ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ বাস করে।
নগরায়ণ জনমিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এখানে মানুষ কীভাবে বাস করে, কী কাজ কীভাবে করে, মানুষ কীভাবে সম্পর্কে জড়ায়, কীভাবে নতুন নতুন কমিউনিটি গড়ে ওঠে, তা নিয়ে আলোচনা কম হয়। এখানে বাল্যবিবাহ বেশি, শিশু অপুষ্টি বেশি। শিক্ষার হার কম। অপরাধ বেশি। স্বাস্থ্যসেবা কম।
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক সাবিনা ফয়েজ রশীদ ২০ বছরের বেশি সময় ধরে বস্তি নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেন মানুষ এভাবে বসবাস করবে? কারও এমনভাবে বাস করা ঠিক না। আমরা যখন বস্তি নিয়ে কথা বলি বা লিখি, তখন আমরা এসব মেনে নিই। কিন্তু এটি নৈতিকভাবে ঠিক না। এটা বড় ধরনের ব্যর্থতা।’
অনুজ্জ্বল ভাবমূর্তি
নগরবিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক মেট্রোপলিটন শহরগুলোর বাসযোগ্যতার কতগুলো মাপকাঠি আছে। এর মধ্যে আছে: সেবা ও সুযোগ-সুবিধার প্রাপ্যতা, বসবাস ও চলাচলের আর্থিক সামর্থ্য, অর্থবহ জীবিকার সুযোগ, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন জীবন, পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সামাজিকভাবে ন্যায্য, নগরবাসীর মধ্যে কমিউনিটির চেতনা, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা, আকর্ষণীয় ও পর্যাপ্ত জনপরিসর, হাঁটার যোগ্য, স্বাস্থ্যকর প্রাকৃতিক পরিবেশ, আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং জন অংশগ্রহণের সুযোগ।
কেন মানুষ এভাবে বসবাস করবে? কারও এমনভাবে বাস করা ঠিক না। আমরা যখন বস্তি নিয়ে কথা বলি বা লিখি, তখন আমরা এসব মেনে নিই। কিন্তু এটি নৈতিকভাবে ঠিক না। এটা বড় ধরনের ব্যর্থতাব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক সাবিনা ফয়েজ রশীদ
এসব মাপকাঠির বিচারে ঢাকা মহানগরের অবস্থান তলানির দিকে। গত বছরের জুলাই মাসে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্টের গবেষণা শাখা ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামোর মতো সূচক নিয়ে বিশ্বের ১৭৩টি শহরের ওপর একটি জরিপ ফলাফল প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ১৭১ নম্বরে। এ ছাড়া প্রায় প্রতিদিন সবচেয়ে বায়ুদূষণের শীর্ষ শহরের যে তথ্য পাওয়া যায়, তাতেও দেখা যায় ঢাকা মহানগরের অবস্থান তালিকার শীর্ষ পর্যায়ে।
ঢাকা মহানগর বলতেই চোখের সামনে দানব আকৃতির একটি ঘিঞ্জি শহরের চেহারা ভেসে ওঠে। যানজটের কারণে এই শহর মন্থর, শহরের মানুষের গতি কম। বর্তমান ঢাকার যানজট নিরসনে মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা পূর্বাচল ৩০০ ফুটের মতো প্রকল্প চালু হয়েছে। বিশাল এই জনসংখ্যার চাপে আধুনিক এই প্রকল্পগুলো কতটা কার্যকর হচ্ছে বা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এ ধরনের সমস্যাগুলো মোকাবিলায় দৃশ্যমান কোনো বড় কাজ নেই। অল্প বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হয়, রাজপথ তলিয়ে যায়। বন্যার ভয়ে থাকে মহানগরের মানুষ। এর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো না। ব্যবস্থাপনা মানসম্পন্ন না হওয়ায় নগরময় বর্জ্য ছড়িয়ে থাকে। বছরজুড়ে নির্মাণকাজ চলে, শহরে ধুলা আর ধুলা। শহরটা অনুজ্জ্বল, মলিন। এর সঙ্গে আছে দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, স্বাস্থ্যসেবার সংকট এবং দুর্বল প্রশাসন।
তারপরও মানুষ ঢাকাতেই আসছে, ঢাকাতেই থাকতে চাইছে। এখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, নির্মাণ, পরিবহন এবং এমনকি অনানুষ্ঠানিক খাতও কেন্দ্রীভূত। বিশ্বব্যাংকের টুওয়ার্ড গ্রেট ঢাকা শিরোনামের প্রকাশনায় বলা হয়েছে, ঢাকা হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তিকেন্দ্র। জিডিপিতে ঢাকার অবদান ২০ শতাংশ, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের ৪৪ শতাংশ ঢাকাতেই, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশ ঢাকা মহানগর এলাকায়।
এই টানেই জামালপুর থেকে ৩৫ বছর আগে ঢাকায় এসেছিলেন ওই গৃহকর্মী। ঈদের সময় বছরে একবার জামালপুরে গ্রামের বাড়িতে যান ফেলে আসা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে। ঢাকা কেন এসেছিলেন—প্রথম আলোর এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘দ্যাশে অভাব ছিল’। এখন অভাব গেছে? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। মলিন মুখ আরও মলিন হয়, ঢাকা শহরের মতো।