রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে আজও দীর্ঘ সারি
সরকারিভাবে জ্বালানি তেল বিক্রি সীমিত করার পর নিজের মোটরসাইকেল আর বাসা থেকে বের করেননি সফটওয়্যার প্রকৌশলী কাজী মোসাব্বির হোসেন। তেল নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সারিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় থাকার ভোগান্তি এড়াতেই তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। গত কয়েক দিনে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের কর্মস্থলে তিনি গেছেন কখনো রিকশায়, কখনো বাসে চড়ে আবার কিছুটা হেঁটে। মাঝে এক দিন বাইসাইকেল চালিয়ে কর্মস্থলে গেছেন।
তবে অনভ্যস্ততার কারণে পবিত্র রমজান মাসে নিয়মিত এভাবে কাজে যাওয়া-আসা করতে মোসাব্বিরের জন্য কষ্টকর হচ্ছিল। তাই আজ বুধবার বাধ্য হয়েই তিনি মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছেন। আর মোটরসাইকেলে জ্বালানি ভরার জন্য তাঁকে অপেক্ষায় থাকতে হয় এক ঘণ্টার মতো।
সকাল ১০টার দিকে মোসাব্বিরের সঙ্গে কথা হয় বিজয় সরণিসংলগ্ন ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সামনে। তিনি তখন একদম পাম্পের ভেতরে ঢোকার জায়গায় ছিলেন। তাঁর আগে প্রায় ১০ থেকে ১২টি মোটরসাইকেলের সারি ছিল।
মোসাব্বির প্রথম আলোকে বলেন, সময় ব্যয় করে এত কষ্ট করে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নেওয়া এড়াতেই মোটরসাইকেল বের না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অভ্যাস হয়ে গেছে মোটরসাইকেলে যাতায়াতের। তাই অন্যভাবে যেতে কষ্ট হচ্ছিল। বেশি ভোগান্তিও মনে হচ্ছিল। তাই আজ আবার মোটরসাইকেল বের করেছেন।
আজ সকালে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি নিতে যাওয়া যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। সকাল ১০টার দিকে ব্যক্তিগত যানবাহনের সারি দেড় কিলোমিটার দূরের ঢাকা সেনানিবাসের জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত বিস্তৃত দেখা গেছে। আর মোটরসাইকেলের সারি ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রধান ফটক পর্যন্ত।
ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের শিফট ইনচার্জ মো. জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের এখানে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা সীমিত পরিমাণে জ্বালানি তেল দিচ্ছেন। আজ থেকে মোটরসাইকেলে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারের চালকদের জন্য ৫ লিটার করে তেল দেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল চালকেরা পাচ্ছেন তিন লিটার তেল। এ ছাড়া যানবাহনের ধরনভেদে প্রাইভেট কার ও অন্যান্য যানবাহনের জন্য ১০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শাহবাগ এলাকার মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার পাম্পে গিয়েও মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। এই পাম্পে অকটেন ও পেট্রল বিক্রি করতে দেখা যায়। পাম্পে তেল নিতে যাওয়া প্রাইভেট কারের সারি শাহবাগ মোড় ছাড়িয়ে কাঁটাবন মোড়ে গিয়ে ঠেকেছে।
প্রায় দেড় ঘণ্টা সারিতে অপেক্ষার পর ব্যক্তিগত গাড়ির চালক আবুল কালাম পাম্পে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন বলে জানালেন। তিনি সকাল ৯টার দিকে কাঁটাবন মোড়ে গিয়ে লাইনের একেবারে শেষে দাঁড়িয়েছিলেন। সকাল সাড়ে ১০টায় তাঁর গাড়িটি ছিল পাম্পে প্রবেশের তিনটি গাড়ির পেছনে।
সংকট শুরুর পর আবুল কালাম বলেন, ‘ঢাকায় আজকে প্রথম তেল নিচ্ছি। কয়েক দিন মালিকের পরিবার নিয়ে মাগুরায় গিয়েছিলাম। তখন ঢাকার বাইরের বিভিন্ন পাম্প থেকে তেল নিয়েছিলাম। ঢাকার বাইরে এত লম্বা লাইন দেখিনি।’
এই পাম্পে কথা হয় রাইড শেয়ারের মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ সাহেবের সঙ্গে। তাঁর বাসা আগারগাঁওয়ে। তিনি লাইনে প্রায় ৫০ মিনিট দাঁড়িয়েছেন বলে জানালেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাঁর মোটরসাইকেল পাম্পে প্রবেশের আরও প্রায় ৭টি মোটরসাইকেলের পেছনে ছিল।
মোহাম্মদ সাহেব বলেন, ‘দুই লিটার তেল দিয়ে ঢাকায় মাত্র চার থেকে পাঁচটি ট্রিপ দেওয়া যায়। খরচ বাদে এসব ট্রিপ থেকে আয় থাকে সর্বোচ্চ ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। এরপর যদি আবার তেলের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়, তখন তো দেড় থেকে দুই ঘণ্টা চলে যায়। তাহলে আয়রোজগার কেমনে করমু?’
বেলা ১১টার দিকে তেজগাঁও শিল্প এলাকার সিটি ফিলিং স্টেশন পাম্পে ডিজেল ও অকটেন বিক্রি বন্ধ দেখা যায়। সেখানে শুধু সিএনজির গ্যাস বিক্রি হচ্ছিল।
এই ফিলিং স্টেশনের প্রকৌশলী মোজাহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক তাঁদের প্রায় ২২ হাজার লিটার অকটেন ও প্রায় ১৮ হাজার লিটার ডিজেল লাগে। গতকাল পেয়েছিলেন ১৩ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন এবং ৯ হাজার লিটার ডিজেল। গতকাল দিবাগত রাত তিনটার দিকে প্রথমে ডিজেল ও পরে অকটেন ফুরিয়ে যায়। তাই এখন বিক্রি বন্ধ।
ডিপোতে গাড়ি পাঠানো হয়েছে জানিয়ে মোজাহিদুল বলেন, আজ ডিজেল ১৩ হাজার লিটার দেবে বলে জানতে পেরেছেন। অকটেন কত পাবেন, তা এখনো জানা যায়নি। তেল নিয়ে ডিপো থেকে গাড়ি এলেই বিক্রি শুরু করবেন।