জার্সি কেনাবেচা: অনলাইনে নীল-সাদার ঢেউ, তরঙ্গ তুলছে হলুদও

ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে সমর্থকদের উত্তেজনা বাড়ছে। অনেকেই খুঁজছেন নিজের পছন্দের দলের জার্সি। ঢাকার গুলিস্তানে সেই জার্সির পসরা নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। এখন অনলাইনেও জার্সি বিক্রি হচ্ছেছবি: দীপু মালাকার

রাত ১২টা, ঢাকার মিরপুরের বাসায় বসে মুঠোফোনের পর্দায় স্ক্রল করছেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তানভীর হোসেন। আর্জেন্টিনার নতুন জার্সিটি কোথায় কম দামে পাওয়া যাবে, সেটা খুঁজছেন। পছন্দের দলের একটি জার্সি তিনবার কার্টে যোগ করলেন, দুবার সরিয়েও নিলেন। শেষে একটি ফেসবুক পেজে বার্তা পাঠালেন—‘ভাই, এক্সট্রা লার্জ আছে?’ জবাব এল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে—‘আছে ভাই, কাল সকালেই পাঠিয়ে দেব।’

এই দৃশ্য এখন ঢাকার অসংখ্য ঘরে ঘরে। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হওয়ার আগে বাংলাদেশের অনলাইন জার্সির বাজার জমে উঠেছে। দোকানের পাশাপাশি ফেসবুক পেজ, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম আর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপজুড়ে চলছে জার্সি কেনাবেচা।

আর্জেন্টিনার জার্সি বেশি বিক্রি হচ্ছে। অনলাইনে আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি
আহমেদ রিফাত, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার, ফ্যাব্রিলাইফ

বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে আর্জেন্টিনার জার্সি। তারপরেই রয়েছে ব্রাজিলের জার্সির চাহিদা। বিক্রি হচ্ছে পর্তুগাল, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইংল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশের জার্সিও।

জার্সি শপ বিডি নামের একটি অনলাইন দোকানের মালিক আজহারুল ইসলাম। রাজধানীর গুলিস্তান ও মোহাম্মদপুরে তাঁর দোকান রয়েছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বকাপ সামনে রেখে জার্সির চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। প্রতিদিন ৩০০–৩৫০টির বেশি জার্সি বিক্রি হচ্ছে।

চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় শেষ মুহূর্তে অনলাইনে অনেক অর্ডার নিতে পারছেন না বলেও জানান তিনি।

‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অব আর্থ’ এবার যৌথভাবে আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। আর এক দিন পর বৃহস্পতিবার রাতে মেক্সিকোয় তার পর্দা উঠবে। তাই জার্সি কেনার হিড়িক এখনই বেশি।

ঢাকার গুলিস্তানের একটি দোকানে একজন খুঁজে নিচ্ছেন ব্রাজিলের জার্সি। অফলাইনের মতো অনলাইনেও আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সির চাহিদা বেশি
ছবি: দীপু মালাকার

প্রাচুর্য নামের একটি অনলাইন দোকানের মালিক মাহফুজ চৌধুরী। তা রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে পরিচালনা করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির মূল দোকান রংপুর শহরে। মাহফুজ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সিই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে; এরপর আছে পর্তুগাল, ইংল্যান্ড—তবে তুলনামূলকভাবে কম। তিনি জানান, তাঁর বিক্রি হওয়া জার্সির ৭০–৮০ শতাংশই আর্জেন্টিনার।

দারাজ, জার্জি, জার্সি ক্লাব বিডি, জার্সি ফ্রিক বিডি, ফ্যাব্রিলাইফসহ ডজনখানেক প্ল্যাটফর্মে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন, ফ্রান্স ও পর্তুগালের জার্সির চাহিদা বেশি বলে বিক্রেতারা জানিয়েছেন।

বৈশ্বিক বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল গ্রোথ ইনসাইটস’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপে জার্সির বাজারের আকার ৮৩৯ কোটি মার্কিন ডলারের হতে পারে। আর বাংলাদেশে এই শিল্পসংশ্লিষ্টরা অনুমান করে বলছেন, দেশে প্রতিটি বিশ্বকাপে অনলাইন ও অফলাইন মিলিয়ে ৫০ থেকে ৮০ লাখ জার্সি বিক্রি হয়। গড় বিক্রয়মূল্য ধরলে দেশীয় বাজারের আকার দাঁড়ায় ৪০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার আশপাশে।

বৈশ্বিক বাজারের হিসাবে, ২০২৬ বিশ্বকাপে সারা বিশ্বে জার্সির বাজার কয়েক শ কোটি মার্কিন ডলার হলেও বাংলাদেশের বাজার সেই তুলনায় ছোট। অবশ্য তুলনায় ছোট হলেও নেহাত কম নয়।

বৈশ্বিক বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল গ্রোথ ইনসাইটস’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপে জার্সির বাজারের আকার ৮৩৯ কোটি মার্কিন ডলারের হতে পারে। আর বাংলাদেশে এই শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনুমান করে বলছেন, দেশে প্রতিটি বিশ্বকাপে অনলাইন ও অফলাইন মিলিয়ে ৫০ থেকে ৮০ লাখ জার্সি বিক্রি হয়। গড় বিক্রয়মূল্য ধরলে দেশীয় বাজারের আকার দাঁড়ায় ৪০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার আশপাশে।

আমরা এবার উৎপাদন কমিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মানুষ কম খরচ করবে। কিন্তু বিক্রি বেশ ভালোই হচ্ছে
ইকবাল হোসেন, ব্যবসায়ী

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপ উপলক্ষে ফুটবল ও ফিফার লোগোসংবলিত জার্সি, টি-শার্ট ও হুডি মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২৩ লাখ ৬৫ হাজার পোশাক, যার রপ্তানিমূল্য প্রায় ৩৭ লাখ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশ রপ্তানি করছে সাধারণ ফ্যান জার্সি, অফিশিয়াল কিট নয়।

দাম ও মান

বাজারে মূলত তিন ধরনের জার্সি পাওয়া যাচ্ছে। দেশীয় কারখানায় তৈরি সাধারণ মানের জার্সি ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়। মাঝারি মানের ‘থাই প্রিমিয়াম’ জার্সির দাম ৮৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। আর প্লেয়ার এডিশন বা অথেনটিক মানের জার্সির দাম পড়ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা।

৩৫ বছর ধরে জার্সির ব্যবসায় যুক্ত ব্যবসায়ী ইকবাল হোসেন বলেন, কাপড়, শ্রম ও আনুষঙ্গিক সামগ্রীর দাম বাড়ায় আগের বিশ্বকাপের তুলনায় এবার প্রতিটি জার্সির দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি।

ঢাকার গুলিস্তানের একটি দোকানে আর্জেন্টিনার জার্সি খুঁজে নিচ্ছেন একজন। অফলাইনের মতো অনলাইনেও আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সির চাহিদা বেশি
ছবি: দীপু মালাকার

ফ্যাব্রিলাইফ ব্র্যান্ডের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার আহমেদ রিফাত প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ইমপোর্টেড ও নিজেদের ব্র্যান্ডের উৎপাদিত জার্সি বিক্রি করছি। আর্জেন্টিনার জার্সি বেশি বিক্রি হচ্ছে। অনলাইনে আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।’

ফ্যাব্রিলাইফ ব্র্যান্ডের জার্সি বিক্রি হচ্ছে ৬৯০ টাকায়। তারা আমদানি করা জার্সি বিক্রি করছে ১ হাজার ২৯০ টাকায়। জার্সি ক্লাব বিডির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ‘থাই প্রিমিয়াম’ জার্সি ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করছে, যেগুলো ১০০ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য পলিয়েস্টারে তৈরি এবং ঘামপ্রতিরোধী প্রযুক্তিযুক্ত।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে বেশির ভাগ জার্সি আসলে বিভিন্ন মানের অনুকরণ পণ্য—এডিডাস বা নাইকির লাইসেন্সপ্রাপ্ত অফিশিয়াল জার্সি নয়। এটি ক্রেতাদের অনেকেই জানেন, জেনেশুনেই কিনছেন।

উৎপাদন ও সরবরাহ

বাংলাদেশে বেশির ভাগ জার্সির কাপড় ও সুতা আমদানি হয় চীন থেকে, আর উৎপাদন ও সেলাইয়ের কাজ হয় দেশে, মূলত নারায়ণগঞ্জে।

রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের পাশে গড়ে ওঠা ছোট কারখানাগুলো বিশ্বকাপের মৌসুমে হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ‘থাই প্রিমিয়াম’ হিসেবে যা বিক্রি হয়, তার উল্লেখযোগ্য অংশ থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামের কারখানায় তৈরি—চীনের মাধ্যমে আমদানি হয়।

ঢাকার পুরানা পল্টনের বিজয় নগরের একটি বহুতল ভবন সাজানো হয়েছে ব্রাজিলের পতাকায়। সেই ছবি যিনি তুলছেন, তাঁর গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি
ছবি: দীপু মালাকার

ব্যবসায়ী ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমরা এবার উৎপাদন কমিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মানুষ কম খরচ করবে। কিন্তু বিক্রি বেশ ভালোই হচ্ছে। একই সঙ্গে উৎপাদন কম হওয়ায় পাইকারি দামে প্রতি জার্সিতে ১০০ থেকে ১২০ টাকা বেড়ে গেছে।’

জার্সি শপ বিডির মালিক আজহারুল ইসলাম বলেন, এবার টুর্নামেন্ট শুরুর অনেক আগে থেকেই বিক্রি শুরু হয়েছে। কারণ, অফিশিয়াল দলের জার্সির নকশা টুর্নামেন্টের প্রায় ছয় মাস আগেই প্রকাশ পেয়েছে।

ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনাসহ সব বিভাগীয় শহরে অনলাইন অর্ডার আসছে। ফেসবুকে শতাধিক ছোট পেজ এই ব্যবসায় সক্রিয়। এ ছাড়া দারাজের মতো বড় মার্কেটপ্লেসে বিশ্বকাপ জার্সির জন্য আলাদা বিভাগ খুলেছে।

কয়েক দিন আগে একটি পেজে জার্সির জন্য ছয় শ টাকা অগ্রিম দিয়েছিলাম। জার্সি আসেনি, পেজও উধাও হয়ে গেছে
আরমান হোসেন, ক্রেতা, লক্ষ্মীপুর

ডেলিভারি ও ভোগান্তি

অনলাইনে জার্সি কিনলে ঢাকার মধ্যে সাধারণত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় তা হাতে পাওয়া যায়। ঢাকার বাইরে জেলা শহরে পৌঁছতে তিন থেকে পাঁচ দিন লাগে।

তবে চাহিদার চাপে কিছু প্রতিষ্ঠান সময়মতো সরবরাহ করতে পারছে না বলে ক্রেতাদের অভিযোগ রয়েছে। কিছু অনলাইন প্রতিষ্ঠান ক্রেতাদের ফোনকল ধরতেও হিমশিম খাচ্ছে।

সাইজ ভুল আসা, রঙে পার্থক্য এবং ছবিতে যা দেখানো হয় বাস্তবে তার মান কম— এই তিন অভিযোগ সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে।

আবার অর্ডার করে পাননি, এমন উদাহরণও রয়েছে। লক্ষ্মীপুরের আরমান হোসেন তাঁদের একজন। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন আগে একটি পেজে জার্সির জন্য ছয় শ টাকা অগ্রিম দিয়েছিলাম। জার্সি আসেনি, পেজও উধাও হয়ে গেছে।’