‘সব মিলাইয়া বুইঝা শুইনা চলতে হয়’

ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে পায়ে টানা রিকশাচালকদের আয় কমেছে। এ ধরনের রিকশা যাঁরা মেরামত করেন, তাঁদের আয়ও কমেছে।

ফুলবাড়িয়া থেকে কার্জন হল এলাকায় ভাড়া নিয়ে এসে বিশ্রাম করছেন জুলহাস মিয়া। গতকাল দুপুরেছবি: প্রথম আলো

জুলহাস মিয়ার বয়স ৭০। সংসারের খরচ জোগাতে এই বয়সেও পায়ে টানা রিকশা চালাতে হয় তাঁকে। আধা বেলার বেশি অবশ্য চালাতে পারেন না। তাঁর ভাষায়, ‘শইল্যে পারে না।’

গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর ফুলবাড়িয়া এলাকায় কথা হয় জুলহাস মিয়ার সঙ্গে। একসময় সবজি বিক্রি করতেন। কিন্তু লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলাতে না পারায় ২০ বছর ধরে রিকশা চালাচ্ছেন।

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে দুই কক্ষের একটি বাসায় থাকেন জুলহাস। তাঁর পরিবারের সদস্য পাঁচজন। স্ত্রী, একমাত্র ছেলে, ছেলের স্ত্রী ও নাতি। ছেলের একার আয়ে সংসার চলে না। তাই ‘পেটের টানে’ তাঁকেও প্রতিদিন রাস্তায় নামতে হয়। আধা বেলা রিকশা চালিয়ে ৪০০ টাকার বেশি আয় হয় না। রিকশার মালিককে দিতে হয় ৬০ টাকা।

জুলহাস বলেন, ‘অটো (ব্যাটারিচালিত রিকশা) যখন আছিল না, তখন হাজার টেকাও ইনকাম (দিনে) হইত। অটো বাইর হইয়া টেকা কইমা গেছে। প্যাসেঞ্জারে উঠবার চায় না।’ স্বল্প আয়ে সংসার চলে না জানিয়ে জুলহাস বলেন, ‘কুনোরকম ডাইল–ভাত খাইয়া বাঁচি। ঈদে কয়জন মাংস দিছিল দেইখা একটু খাইবার পারছি।’

জুলহাস বলেন, ‘চাইর শ টেকা ইনকাম, ঘর ভাড়া দিতে হয়। অসুখ-বিসুখ রইছে। সব মিলাইয়া বুইঝা শুইনা চলতে হয়।’

‘কাম-কাইজ কম’

জুলহাস পায়ে টানা যে রিকশা চালান, সে ধরনের বাহন মেরামতের কাজ করেন শওকত মাতবর। বয়স পঞ্চাশের ঘরে। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল এলাকায় যখন তাঁর সঙ্গে কথা হয়, তখন ফুটপাতে বসে বিশ্রাম করছিলেন তিনি। পাশেই ছিল রিকশা মেরামত করার ছোটখাটো বিভিন্ন যন্ত্র।

কথায় কথায় শওকত মাতবর জানালেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে রিকশা-ভ্যান মেরামতের কাজ করেন। তবে একসময় বিয়াবাড়ি সাজানোর কাজও করেছেন। রিকশাও চালিয়েছেন।

শওকতের দুই ছেলে। পরিবার নিয়ে ছেলেরা আলাদা থাকেন। তিনি স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর আনন্দবাজার এলাকায় এক কক্ষের একটি ঘরে থাকেন। ভাড়া মাসে পাঁচ হাজার টাকা।

রিকশা মেরামতের কাজ করে আয় কেমন হয় জানতে চাইলে শওকত মাতবর বললেন, ‘দিনে চার-পাঁচ শ টেকার বেশি হয় না। সব দিন এক রকম যায় না। আইজকা কিছু হইলে কাইল আবার হয় না।’

কথা বলতে বলতেই একটি রিকশা এসে থামল শওকতের সামনে। বেশ কিছুক্ষণ রিকশার সামনের চাকায় কাজ করে সেটি মেরামত করে পেলেন ১০ টাকা। পরে বললেন, ‘ব্যবসার অবস্থা বেশি ভালা না। কাম-কাইজ কম।’

সংসার কীভাবে চলছে জানতে চাইলে শওকত মাতবর বলেন, ‘খাইয়্যা, লইয়া কোনোরকম চলে। কখনো ডাইল, আলুভর্তা। কখনো শাক-মাছ। গোশত এক্কেরেই কম।’

রিকশা মেরামতের কাজ করেন শওকত মাতবর। গতকাল দুপুরে দোয়েল চত্বর এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

‘হিমশিম খাইয়া যাই’  

হাইকোর্ট মাজার গেটের উল্টো দিকের ফুটপাতে ক্ষৌরকর্ম (চুল-দাড়ি কাটা) করেন স্বপন ঋষি। ৩০ বছর ধরে করছেন এই কাজ। আগে হাইকোর্টের মাজারের দিকের ফুটপাতে বসতেন।

ছোট্ট একটি আয়না, চিরুনি, কাঁচি আর ক্ষুর—এই হলো স্বপনের সম্বল। মূলত স্বল্প আয়ের মানুষেরাই তাঁর কাছে চুল কাটাতে আসেন।

স্বপনের পরিবারে দুই ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রী রয়েছেন। যে আয় হয়, তাতে পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকা সম্ভব নয়। পরিবার থাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তিনি মগবাজারে একটি মেসে থাকেন। 

চুল কাটাতে ৫০ টাকা এবং দাড়ি কাটাতে ৩০ টাকা করে নেন স্বপন। বললেন, ‘কোনো দিন ছয়-সাত শ হয়। খায়া দায়া হয়তো চাইর-পাঁচ শ থাকে। সবকিছুর দাম খালি বাড়েই। প্রয়োজন বুঝে অনেক খরচা কমানো লাগে। হিমশিম খাইয়া যাই।’